গবেষণা 

৬ প্রজাতির শুঁটকিতে ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত

কুয়াকাটার শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ সবচেয়ে বেশি, এরপরেই কক্সবাজার

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৭ এএম

সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকার অন্যতম উপাদান শুঁটকিতে মিলেছে ৯ ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক। সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফের চারটি প্রধান শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র থেকে সংগৃহীত ছয় প্রজাতির মাছের ২৪টি নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) গবেষকেরা। গবেষণায় শুঁটকিতে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পাওয়া গেছে কুয়াকাটায়। এরপর রয়েছে কক্সবাজার।

চবির ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী কাজী নুসরাত জাহান ঐশী, হাবিবুর রহমান পিয়াস, নাদিয়া ইসলাম রিয়া ও সানজিদা জুথি যুক্ত ছিলেন।

গবেষণাটি গত ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী মেরিন পলিউশন বুলেটিনে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। সাময়িকীটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার থেকে প্রকাশিত হয়।

গবেষণার জন্য দেশের চারটি প্রধান শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র থেকে লোট্টা মাছ , পোয়া মাছ, ছুরি মাছ, হরিণা চিংড়ি, ফাইস্যা ও বাগদা চিংড়ির শুঁটকির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। চারটি স্থান ও ছয় প্রজাতির সমন্বয়ে মোট ২৪টি নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স (পিএইচআই) ব্যবহার করে শুঁটকির মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাত্রা মূল্যায়ন করা হয়। এতে কুয়াকাটার শুঁটকিতে সূচকের মান পাওয়া গেছে ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭। অন্যদিকে, কক্সবাজারের শুঁটকিতে এ মান ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১।

গবেষণায় শনাক্ত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) ও পলিস্টাইরিন (পিএস) সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে।

অধ্যাপক আশরাফুল আজম খান বলেন, মাছের শুঁটকিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিকও প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

গবেষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে শুঁটকি উৎপাদিত হলেও তা মানসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতীতে মাছের লার্ভার আক্রমণ ও অপচয় রোধে ব্যবসায়ীরা ডিডিটি ও নগভসের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার করতেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পরবর্তী সময় খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা শুরু হলে বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেন তিনি।

অধ্যাপক আশরাফুল আজম খান আরও জানান, জলজ পরিবেশে থাকা পৌরসভা, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্য উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে প্লাস্টিক কণায় পরিণত হচ্ছে। এসব দূষিত পরিবেশের মাছ থেকে তৈরি শুঁটকিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে।

সরকার ও ভোক্তাদের করণীয়
মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি কমাতে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকেরা। অধ্যাপক আশরাফুল আজম খানের মতে, খোলা মাঠে শুঁটকি না শুকিয়ে সোলার ড্রায়ার কিংবা ছাদযুক্ত ও নির্ধারিত এলাকায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশে শুঁটকি প্রস্তুত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া শুঁটকি উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের শিট, কৃত্রিম দড়ি ও প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে মাছের সঙ্গে যেন প্লাস্টিক কণা মিশতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় পৌরসভা ও শিল্পকারখানার প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এসব বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে জলজ পরিবেশ দূষিত করতে না পারে।

অধ্যাপক আশরাফুল আজম খান সতর্ক করে বলেন, ভোক্তাদের সচেতনতার পাশাপাশি সরকারিভাবে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা না হলে ভবিষ্যতে মানবস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত