প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিজ দেশের অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক জমকালো ও প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন, শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্য খাতের আমূল সংস্কার নিয়ে নিজের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, জাপান সরকারের সামনে বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং দেশটির ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, ‘দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে প্রবাসীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।’
চার দিনের সরকারি সফরে স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল সোয়া ৯টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বাণিজ্যিক ফ্লাইটে সরকারপ্রধান ও তার সফরসঙ্গীরা নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কানতেই’-এ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে একটি যৌথ ঘোষণাও প্রদান করা হয়।
জাপান সফর প্রসঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশকে জাপান সরকারের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছি। তারা কীভাবে আরও বিনিয়োগ করতে পারে, সে বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলাপ হয়েছে। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত রয়েছেন। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বহুমুখী চাহিদা পূরণ হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।’
দেশের বৃহৎ যুবসমাজকে অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও অনেকে বলেন বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬-১৭ কোটি, কিন্তু আমার ধারণা তা ২০ কোটির কম হবে না। এর মধ্যে তরুণদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। কর্মসংস্থান তাদের মৌলিক অধিকার ও প্রধান প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের ইকোনমি বা অর্থনীতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এখন সরকার সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করে না; বরং ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবসাবান্ধব ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই এখন সরকারের মূল কাজ।’
উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে দেশীয় উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করছে সরকার। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের বন্ধ থাকা প্রায় ৪৬টি মিল-কারখানা পুনরায় চালু করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যে ধরনের নীতিগত ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, বর্তমান সরকার তা ইতিমধ্যে শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখবে।
রাষ্ট্র সংস্কার এবং শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বিএনপিই দেশের প্রথম রাজনৈতিক দল, যারা রাষ্ট্র গঠনে কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলে আসছে। প্রাথমিক শিক্ষা এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থা যত বেশি মজবুত করা যাবে, জাতি তত বেশি উন্নত হবে।’
‘আমাদের নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করতে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় জাপানি ভাষাসহ আরও কিছু আন্তর্জাতিক ভাষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যেখান থেকে শিশুরা নিজেদের পছন্দমতো তৃতীয় ভাষা বেছে নিতে পারবে। আগামী বছর থেকেই এই যুগান্তকারী কার্যক্রম শুরু হবে,’ বলেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের বেহাল দশা কাটিয়ে উঠতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো খুবই অপ্রতুল। এই খাতকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছে সরকার। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালেই ডায়ালাইসিস সেবা চালু করা হবে। এছাড়া অবহেলিত শিশু এবং নারীদের চিকিৎসাসেবা আরও নিশ্চিত করতে পৃথক বিশেষায়িত ওয়ার্ড স্থাপন করা হবে।’
এদিকে, টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে এখন থেকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিগ-বি’ নামে আরও বেগবান করা হবে।
এই উদ্যোগের আওতায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পায়ন এবং তথ্যযোগাযোগপ্রযুক্তির অবকাঠামো উন্নয়নে অত্যন্ত সমন্বিতভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ ও জাপান। এর মূল লক্ষ্য হলো শিল্পের মূল্য সংযোজন ও সরবরাহব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাংলাদেশকে বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলা।
এই লক্ষ্য অর্জনে মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। প্রথমত, আধুনিক ও টেকসই যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্তমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ যেকোনো ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো; তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন নতুন সুযোগ তৈরি এবং যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা এবং চতুর্থত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করা।