বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনের ধারায় গর্ব করার মতো অনেক কিছুই দেখছেন ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ও ধারাভাষ্যকার ইয়ন বিশপ। টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতি, তরুণদের উঠে আসা, পেস বোলিং আক্রমণের শক্তি বৃদ্ধি এবং ব্যাট হাতে লিটন দাসের সামর্থ্য, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তিনি।
বিশেষ করে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারা নাহিদ রানার মধ্যে বিশ্বমানের সুপারস্টার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন এই সাবেক ক্রিকেটার।
বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ধারাভাষ্য দিতে এসেছেন বিশপ। গতকাল মিরপুর টেস্টের চা বিরতির ফাঁকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়েও কথা বলেন তিনি। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলমান চক্রে নাজমুল হোসেন শান্তদের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা নিয়ে বিশপ মনে করেন, ‘আমি বলছি না যে বাংলাদেশ অবশ্যই ফাইনালে উঠবে। এখানে আমরা কেউই তা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। তবে আমার মনে হয়, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের এই চক্রে এটাই বাংলাদেশের সেরা পারফরম্যান্স। তাই আমার মতে, বাংলাদেশের গর্ব করার মতো অনেক কিছু রয়েছে। দলের পুরোনো কয়েকজন খেলোয়াড়ের জায়গায় নতুন ও তরুণ ক্রিকেটাররা উঠে আসছেন। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশের গর্বিত হওয়া উচিত। আর যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উঠতে পারেন, তাহলে সেটি হবে আরও বড় অর্জন।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে লিটন দাসের উন্নতির কথাও তুলে ধরেছেন বিশপ। ধারাভাষ্য কক্ষে কবিতার ছন্দে খেলোয়াড়দের প্রশংসা করার জন্য পরিচিত এই ক্যারিবীয় এর আগে লিটনকে বিখ্যাত শিল্পকর্ম মোনালিসার সঙ্গে তুলনা করেন। লিটনের ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য ও প্রতিভা যে তার নজর কেড়েছে, সেটি স্পষ্ট। তবে সাদা বলের ক্রিকেটের তুলনায় টেস্টে এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যানের উন্নতি বেশি চোখে পড়েছে বিশপের।
লিটনের টেস্ট ব্যাটিংয়ের প্রশংসা করে এই ধারাভাষ্যকার বলেন, ‘বছরের পর বছর টেস্ট ক্রিকেটে সে উন্নতি করেছে। সাদা বলের ক্রিকেটে, অর্থাৎ ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে, তার কাছ থেকে হয়তো আরও বেশি প্রত্যাশা করেছিলাম। তবে টেস্ট ক্রিকেটে তার উন্নতির কৃতিত্ব অবশ্যই তাকে দিতে হবে।’
লিটনের প্রতিভা নিয়ে বিশপের প্রত্যাশা অবশ্য বর্তমান পারফরম্যান্সের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত সেরা ব্যাটারদের কাতারে জায়গা করে নেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে বাংলাদেশের এই ব্যাটারের। এনিয়ে বিশপের ব্যাখ্যা, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটকে দেওয়ার মতো অনেক কিছুই লিটনের আছে। কারণ, প্রথম দিন থেকেই তার প্রতিভা ছিল স্পষ্ট। আশা করি, আগামী বছরগুলোতে আমরা তাকে এমন একজন ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখব, যাকে আমি বিশ্বমানের ব্যাটার বলব। বিশ্ব ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠিত সেরা ব্যাটারদের কাতারে সে জায়গা করে নেবে, এটাই প্রত্যাশা।’
তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে পেস বোলিং আক্রমণের উন্নতিকেই এগিয়ে রাখছেন বিশপ। একসময় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি ছিল স্পিন। বিশেষ করে ঘরের মাঠে স্পিনসহায়ক উইকেটে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার কৌশল ছিল বেশি প্রচলিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব কন্ডিশনে কার্যকর বোলিং আক্রমণ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। সেই জায়গায় বাংলাদেশের পেসারদের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো।
তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, শরীফুল ইসলাম, এবাদত হোসেন ও নাহিদ রানার মতো বোলারদের উপস্থিতি বাংলাদেশের পেস আক্রমণে বৈচিত্র্য এনেছে। গতি, সুইং, নিয়ন্ত্রিত লাইন ও লেংথের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের চাপে রাখার সক্ষমতা বাড়ছে। মিরপুর টেস্টে হাসান মাহমুদের বোলিংয়ের সময় স্লিপ কর্ডনে ফিল্ডারদের অবস্থান দেখে বাংলাদেশের এই পরিবর্তনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও পুরোনো দিনের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণের মিল খুঁজে পেয়েছেন বিশপ।
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের উন্নতি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ, ‘বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণ অসাধারণ উন্নতি করেছে। আজ আমরা হাসান মাহমুদ বোলিং করার সময় স্লিপ কর্ডনের একটি দৃশ্য ধারণ করেছি। সেখানে তিনজন স্লিপে এবং একজন গালিতে ছিলেন। এমন দৃশ্য দেখলে সাধারণত অস্ট্রেলিয়া কিংবা পুরোনো দিনের ওয়েস্ট ইন্ডিজের কথা মনে পড়ে। সেই ধরনের একটা আবহ তৈরি হয়েছিল। এখন আমরা বাংলাদেশের কাছ থেকেও এমন দৃশ্য দেখছি।’
বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিততে হলে পেস বোলিংয়ে আরও শক্তিশালী হওয়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশপ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির পেছনে সাবেক কোচ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবদানও তুলে ধরেছেন তিনি। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক কোচ ওটিস গিবসন এবং শন টেইটের সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন এই ধারাভাষ্যকার।
বিশপ বলেন, ‘আপনি যদি পশ্চিমা দেশগুলোতে গিয়ে টেস্ট ম্যাচ জিততে চান, তাহলে শুধু স্পিনার আর একজন দ্রুতগতির বোলারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বাংলাদেশের পেস বোলিং আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সঠিক পথে এগিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক কোচ ওটিস গিবসন এবং শন টেইটের মতো কয়েকজনের সহায়তাও পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে এটাই দেখায়, বাংলাদেশের বাইরের মানুষও বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কতটা ভালোবাসেন।’
বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ রানার সম্ভাবনার বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন বিশপ। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করার সামর্থ্য এই তরুণকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তবে শুধু গতিই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের সম্ভাবনাকে কতটা কাজে লাগাতে পারবেন, সেটিই হবে তার ভবিষ্যৎ সাফল্যের চাবিকাঠি।
নাহিদকে নিয়ে বিশপের ভাবনা এমন, “নাহিদের মধ্যে এমন একটি সম্ভাবনা রয়েছে, যেটিকে আমরা পশ্চিমা ক্রিকেটীয় পরিভাষায় ‘হায়ার সিলিং’ বলি। অর্থাৎ, বিশ্বমানের সুপারস্টার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তার অনেক বেশি। সে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে পারে, এমন একজন বোলার যদি আপনার দলে থাকে, তাহলে বিশ্বের প্রতিটি দলই তাকে পেতে চাইবে। এমন একজন বা দুজন বোলার পাওয়ার জন্য যেকোনো দল অনেক কিছু করতে রাজি থাকবে। সে কারণেই নাহিদের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সীমা অনেক উঁচুতে। তবে হাসান মাহমুদের কথাও বলতে হবে। আমি তাকে অসাধারণ লাইন ও লেংথের বোলার মনে করি।”