বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। উত্তরখান থানায় তিনি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় তাহসিফের ‘বন্ধু’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) দীপকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই।
পরে তাকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তদন্তে নামে পিবিআইয়ের একটি দল। সেখানে তুরাগ নদসংলগ্ন ২৯ নম্বর সীমানা পিলার এলাকার মাঠে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
দীপের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে একটি নম্বরপ্লেটহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এই মোটরসাইকেলটি নিহত তাহসিফের কি না, তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে কাগজপত্রের পাশাপাশি অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পিবিআইর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দীপ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ উভয়েই তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় হঠাৎ কয়েকজন লোক তাদের ধাওয়া করেন।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাওয়াকারিদের মধ্যে অন্তত দুজনের পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম ছিল। ইউনিফর্মে পুলিশ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে তাহসিফ দ্রুত দৌড় দেন এবং একপর্যায়ে নদীর পানিতে ঝাঁপ দেন।
অন্যদিকে দীপ নিজে বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে আত্মগোপন করে পরে সেখান থেকে নিরাপদে সরে যান।
নিহত তাহসিফের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন সাবেক এই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। এরপর গভীর রাতে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তিনি মোবাইল ফোনে মাকে টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি দ্রুত বাসায় ফিরছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি আর ফেরেননি। পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে উত্তরায় তুরাগ নদ থেকে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
শুরুতে অজ্ঞাতনামা হিসেবে মরদেহ উদ্ধার করা হলেও তার সঙ্গে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে পরবর্তীতে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
ঘটনার আগের একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার সময় উত্তরার বাসার নিচে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাহসিফের। পরিবারের সদস্যরা ভিডিও ফুটেজ দেখে ওই ব্যক্তিকে তাহসিফের বন্ধু দীপ বলে নিশ্চিত করেন।
ফুটেজে দেখা যায়, তারা পরস্পর হাত মেলানোর পর দুটি আলাদা মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে রওনা হন। যেহেতু ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে দীপ সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাই রহস্য উদ্ঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হয়।
পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানান, জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপ দাবি করেছেন যে পোশাকধারী দুই পুলিশ সদস্যকে ধাওয়া করতে দেখে তাঁরা ভয় পেয়ে দুই দিকে দৌড়ে পালিয়েছিলেন। তবে যাদের পুলিশ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, সেই দুই ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষেই পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না কিংবা টঙ্গীর মাজার বস্তির মতো কুখ্যাত মাদক স্পটে তারা কেন গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
তাছাড়া ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি কীভাবে এল এবং মৃত্যুর সঠিক নেপথ্য কারণ কী, তা পুরোপুরি পরিষ্কার করতে পুলিশের একাধিক ইউনিট নিবিড় ছায়া তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।
নিহত তরুণ কর্মকর্তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এটি কোনোভাবেই সাধারণ আত্মহত্যা হতে পারে না। তিনি দাবি করেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত পরিচালনা করে, তবে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর আসল সত্য এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের সহজেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তাহসিফ মৃত্যু রহস্য: বন্ধু দীপকে নৌ পুলিশে হস্তান্তর
‘ধাওয়া খেয়ে তুরাগে ঝাঁপ দেন তাহসিফ’: পুলিশকে জানাল বন্ধু দীপ
তাহসিফের মোটরসাইকেল মিলল টঙ্গীতে