সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত পাঁচ প্রবাসী বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরেছে। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে তাদের মরদেহ নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে বাড়ির পরিবেশ। দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পেলেও পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ঋণের বোঝা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ।
নওগাঁ শহরের পার নওগাঁ এলাকার বাসিন্দা শাহিনের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর অপেক্ষায় শনিবার সকাল থেকেই স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় জমে। কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তার ৬০ বছর বয়সী মা নার্গিস বেগম, কখনো নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন পথের দিকে। বিকেলে ছেলের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বারবার বলতে থাকেন, আগুনে পুড়ে তার বুকের ধন চলে গেছে। এখন তিনি একা হয়ে গেলেন, কীভাবে বাঁচবেন?
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ১২ জন ছিলেন নওগাঁ জেলার বাসিন্দা। গত ২৭ আগস্ট প্রথম দফায় সাতজনের মরদেহ দেশে আনা হয়। তবে আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় শনাক্তকরণের জটিলতায় বাকি পাঁচজনের মরদেহ দীর্ঘদিন সৌদির হিমঘরে রাখা ছিল। স্বজনেরা প্রিয়জনের শেষ মুখ দেখার অপেক্ষায় মাসের পর মাস কাটিয়েছেন।
শনিবার দেশে আসা নওগাঁর পাঁচজন হলেন পার নওগাঁর মজনু রহমানের ছেলে শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের নাজমুল হুদার ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ (৩৫), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাছ প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক (৩২), মাধবপুর গ্রামের মজনুর ছেলে মাসিদুল সরদার সজিব (২৫) এবং সাধনগর গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে সাগর আলী (২৬)।
নিহত শাহিনের মামি নিলুফা ইয়াসমিন জানান, ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন শাহিন। তার বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন বাবা মারা যান। এরপর মায়ের আঁচলে থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বেড়ে ওঠেন তিনি। বিয়ের পর সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় চলতি বছরের এপ্রিলে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে যান শাহিন। দেশে রেখে যান স্ত্রী, ছয় বছরের ছেলে, আট মাস বয়সী মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে।
নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, মৃত্যুর তিন দিন আগে শাহিন প্রথমবারের মতো টাকা পাঠানোর কথা জানিয়েছিলেন। ১২ তারিখে ৩২ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল তার। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে এবং বাকি টাকা দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে বলেছিলেন। কিন্তু টাকা পাঠানোর আগেই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি।
শুধু শাহিনের পরিবার নয়, নিহত পাঁচজনের স্বজনদের মধ্যেই এখন একই দুশ্চিন্তা। ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁদের মনে। পরিবারগুলো সরকারি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ এবং ঋণ মওকুফের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাগর আলীর বাড়ি আত্রাই উপজেলার সাধনগর গ্রামে। স্বামীর মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী পারভীন আক্তার। স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি এখন তাকে সামলাতে হচ্ছে ঋণের চাপ। মাত্র ছয় মাস আগে সাড়ে ছয় লাখ টাকা ঋণ করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন তিনি। আশা ছিল, স্বামী ভালো আয় করবেন, ঋণ শোধ হবে, সন্তানদের মুখে হাসি ফুটবে এবং সংসারে সচ্ছলতা ফিরবে।
কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। পারভীন আক্তার জানান, ঋণের এক লাখ টাকাও এখনো পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। স্বামীকে বিদেশে পাঠানোর জন্য নেওয়া ঋণের টাকা ফেরত আসেনি। বরং পুরো ঋণের বোঝা এখন তাঁর কাঁধে।
ঋণের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে পরিবারের একমাত্র ভিটাবাড়িটিও মহাজনের কাছে বন্ধক রাখতে হয়েছিল। এখন ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সেই বাড়ি হারানোর আশঙ্কা করছেন তিনি। দুই সন্তানকে নিয়ে যে ঘরে বসবাস করেন, সেটিও হারাতে হতে পারে—এই ভয় প্রতিনিয়ত তাঁকে তাড়া করছে।
পারভীনের দুটি ছোট সন্তান এখনো বোঝে না, তাদের বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না। তারা শুধু দেখছে, মা কাঁদছেন, বাড়িতে মানুষের ভিড় আর বাবার ফিরে আসার কথা বারবার বলা হচ্ছে। এর মধ্যেই পাওনাদারদের তাগাদা অব্যাহত রয়েছে। স্বামীর মৃত্যুশোক সামলানোর পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের চাপ তাঁকে দিশেহারা করে তুলেছে।
পারভীনের প্রশ্ন, স্বামী নেই, ঋণ রয়েছে, ভিটাবাড়িও বন্ধক রাখা। দুটি সন্তানকে নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন, কীভাবে বাঁচবেন?
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত মিনহাজ প্রামাণিকের মরদেহ শনিবার বিকেলে আত্রাই উপজেলার মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। কফিন উঠানে নামানোর পরপরই স্বজনদের আহাজারিতে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। ছেলের কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন মা পারুল আক্তার। কখনো ছেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন, কখনো আকাশের দিকে মুখ তুলে বিলাপ করছিলেন।
সকাল থেকেই মিনহাজের বাড়িতে আশপাশের গ্রামের নারী, পুরুষ ও শিশুদের ভিড় জমে। কফিন ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কেউ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন, কেউ কফিনের গায়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাঠানো ছেলেকে এভাবে ফিরে পেতে হবে, তা কখনো ভাবেননি পারুল আক্তার।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা, পরিবহন ও দাফনের সম্পূর্ণ ব্যয় সরকারিভাবে বহন করা হয়েছে। এবার সরকারিভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি রাখা হয়নি। বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করে নিজ নিজ গ্রামে নিয়ে যাবেন এবং সেখানেই দাফন সম্পন্ন করবেন।
তিনি আরও জানান, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। শুক্রবার নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হয়েছে। প্রশাসন পরিবারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।