এলডিসি উত্তরণে সময় বাড়ল করণীয় কী!

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৩ এএম

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এসেছে। ফলে রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা, বৈদেশিক ঋণের সুদসহ আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করতে সরকার বাড়তি সময় পেল। তবে এই সময়কে কাজে লাগাতে না পারলে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতির ক্ষত ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি : ২০১০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬-৭ শতাংশ অর্জন করায় বাংলাদেশ বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতি বা ইমার্জিং ইকোনমির খেতাব পায়। কিন্তু ব্যাংক খাতে বড় জালিয়াতি, উন্নয়ন কর্মকান্ডে দুর্নীতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে অবকাঠামো নির্মাণ ও সরকারি ক্রয়ে আর্থিক লুটপাট অর্থনীতিতে ক্ষত তৈরি করায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে এখন তা ৩ শতাংশের ঘরে নেমেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন-রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও সর্বশেষ ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন হুমকিতে ফেলেছে। জ্বালানিসহ বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে সরাসরি আঘাত করেছে। ফলে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে ভাটা, কর্মসংস্থান সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি সরকারের বিরুদ্ধে সর্বসাধারণের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়।

এসব প্রেক্ষাপটে এলডিসি উত্তরণের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়াতে বাংলাদেশের আবেদন গত ফেব্রুয়ারিতে গ্রহণ করে জাতিসংঘ। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীনে একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সহায়ক সংস্থা কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) সুপারিশ করে কোনো দেশ এলডিসি তালিকা থেকে উন্নীত হবে কি না? উত্তরণ ঘটা বা উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত কাজ করে থাকে সিডিপি।

গত ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের প্রেক্ষাপটে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে এলডিসি থেকে উত্তরণের নতুন সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর। 

বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; বরং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার শেষ বড় সুযোগগুলোর একটি। কারণ এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্য জোটের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বিশেষ বাণিজ্য-সুবিধার আওতায় রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা ধাপে ধাপে হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য-সুবিধা ও অন্যান্য বিশেষ সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ পেলেও এই সময়ের মধ্যে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে না পারলে উত্তরণ-পরবর্তী চাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতা সৃষ্টি হবে না।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ : বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালে সিডিপি প্রথম সুপারিশ করে বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করতে। তিনি বলেন, ওই সময়ের মধ্যে উত্তরণের প্রস্তুতি তো দূরে থাক; বরং উল্টো পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতিতে যে অবনতি ঘটেছে তা দেড় দশকে সৃষ্ট। তিন বছরে এই অবস্থার উত্তরণ সম্ভব নয়। এর বাইরেও স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস) বাস্তবায়নে আরও ৩ বছর সময় পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামনের দিনগুলোতে করণীয় কী?

তিনি বলেন, সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতির সব আয়োজন দূর করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও শক্তিশালী করা, পুরো ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা, পিডিবি, পিজিসিবি, বিআরটিএসহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত করা এবং এনবিআরের নীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগকে পৃথকীকরণ করা দরকার।

তার মতে, বর্তমান সরকার চলতি বছরের বাজেটে রাজস্ব হার বিষয়ে কিছু ছাড় দিয়েছে বটে; তাতে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সহায়ক হবে না। কারণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের মাধ্যমে নেহায়েত কিছু সুবিধা বণ্টন করা হয়েছে। এ ছাড়া মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইনের সংস্কার যথাযথ হয়নি। এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন করদাতারা হয়রানিমুক্তভাবে সরকারকে রাজস্ব পরিশোধ করতে পারে।

তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে পাওয়া বাড়তি সময় কাজে লাগাতে হবে। আমাদের অর্থনীতির কোথায় ঘুণপোকা আক্রমণ করেছে তা আর ডায়াগনসিস করার দরকার নেই। প্রেসক্রিপশনও যথেষ্ট হয়েছে। এজন্য সময় বা অর্থ ব্যয় না করে সরকারের অ্যাকশন দরকার। বৈশ্বিক পরিস্থিতি কখন অনুকূলে আসবে সে অপেক্ষা না করে নিজেদের ঘর (রাষ্ট্র) ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। নিজস্ব রিসোর্স (সম্পদ) ও সক্ষমতা ঠিকমতো ব্যবহার করতে হবে।

উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা : এলডিসি তালিকা থেকে ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত উত্তরণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ফলে তৈরি পোশাক ও ওষুধ খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে জানায়, এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সুবিধা হারালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভারতের মতো প্রধান বাজারগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপা) এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিপা) করা জরুরি। ইতিমধ্যে জাপানের সঙ্গে ইপা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিপা আলোচনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়া, পাদুকা, হালকা প্রকৌশল ও আইসিটি খাতের বহুমুখীকরণ প্রয়োজন। তবে ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে মেধাস্বত্ব বা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (আইপিআর) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কঠোর নিয়ম ও পেটেন্ট আইন মানার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যাংক খাতের সংস্কার, উচ্চ খেলাপি ঋণ আদায় এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা এবং জ্বালানি সংকট দূর করা অপরিহার্য। অন্যদিকে, উত্তরণের পর স্বল্পসুদে আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৮ শতাংশ, যেখানে উন্নয়নশীল দেশের আদর্শ মান হলো প্রায় ১৫ শতাংশ। সরকার অবশ্য ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে এই অনুপাত ৯.৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে করের আওতা বাড়ানো ও ডিজিটালাইজেশন প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিল্পোৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে চট্টগ্রাম, মোংলা ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের আধুনিকায়ন এবং জাতীয় লজিস্টিকস নীতির বাস্তবায়ন জরুরি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার টিকিয়ে রাখতে শিল্পকারখানায় উন্নত শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ (এসটিএস) চূড়ান্ত করেছে। এর অধীনে পাঁচটি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে ১৫৭টি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং সংস্কারে ধীরগতির কারণে পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। উত্তরণকে সফল করতে হলে আগামী তিন বছরে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ ধরে এগোতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত