জাপানে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ ভাষা

বিকল্প অর্থায়নে দুই দেশের অর্থমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের পর জাপানের বিশাল ও সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কাজের সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জাপানি ভাষা শিক্ষা’। কেননা, আইটি, নার্সিং, কেয়ারগিভার, কৃষি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে জাপানি ভাষার প্রয়োজনীয়তা খুবই বেশি।

জাপান প্রবাসীদের অনেকেই মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই জাপান সফর কেবল দুটি দেশের সরকারের সম্পর্ককেই মজবুত করেনি, বরং জাপানে অবস্থানরত সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সফর পরবর্তী সিদ্ধান্তসমূহ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে এক বিশাল ভূমিকা পালন করবে।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক জাপান সফর দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই সফরের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল জাপানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণ, কর্মসংস্থান এবং তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। সফর পরবর্তী পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এই সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও আশাব্যঞ্জক বার্তা বয়ে এনেছে।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও ভিসা সহজীকরণ : জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সফরে জাপানের ক্রমবর্ধমান শ্রমচাহিদা বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি সংখ্যক দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তি নিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। জাপানে প্রবাসীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুনদের জন্য জাপানি ভাষা শেখা ও টেকনিক্যাল ট্রেইনি ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও। ইতিমধ্যে তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তবে জাপানি ভাষা শিক্ষার জন্য বড় বাঁধা শিক্ষকের সংকট। এক্ষেত্রে জাপান সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন সরকার প্রধান।

জাপানে ১৯৮৭ সালে এসেছিলেন মুন্সীগঞ্জের ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, আমি যখন এসেছিলাম তখন জাপানে বাংলাদেশি খুব একটা আসত না। সে সময়ও নানা জাটিলতা ছিল। ভাষা না জানার কারণে তিনি একটি ভাষা স্কুলে ভর্তি হন। এরপর তিনি জাপানি ভাষায় আস্তে আস্তে দক্ষতা অর্জন করেন।

তিনি বলেন, আজকে ধীরে ধীরে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। এখন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী জাপানে উচ্চ শিক্ষার জন্য আসেন। অনেকেই জব ভিসা নিয়ে আসেন। যা খুবই ইতিবাচক দিক। তবে জাপানি ভাষা সঠিকভাবে না জানার কারণে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। সুতরাং আমার প্রথম পরামর্শ থাকবে জাপানি ভাষা শিখে তারপর দেশটিতে আসা। তা না হলে কাজও পাবেন না আবার যে টাকা খরচ করে আসবে সেগুলোও গচ্চা যাবে। সুতরাং সরকারি বা বেসরকারি যেভাবেই হোক ভালো এজেন্সির মাধ্যমে ভাষা শিখে ও দক্ষতা অর্জন করে জাপানে আসা উচিত।

বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে নতুন সুবিধা : জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে বেশকিছু বিষয়ে জাপান সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তার মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যাতে সহজে, দ্রুত এবং সর্বনিম্ন খরচে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন, সে লক্ষে ব্যাংকিং ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এতে প্রবাসীরা ব্যাংক ভিত্তিক চ্যানেল ব্যবহার করতে আরও উৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার গঠন ও উচ্চশিক্ষা : বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গঠনের অন্যতম গন্তব্য জাপান। কেননা, জাপানে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের গবেষণার পাশাপাশি রয়েছে পার্ট-টাইম কাজের বিরাট সুযোগ। তাদের জন্য আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া, ভবিষ্যতে জাপানের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর জোড় প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

জাপানী ভাষা জানা দক্ষ ব্যক্তির জন্য কাজের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে বলে জানান জাপান প্রবাসী মেহেদী হাসান মুন্না। যিনি জাপান রেমিট ফাইন্যান্সে (জেআরএফ) আইটি সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে আমি জাপানে কাজ করছি। রেমিট্যান্স খাতে আমার কোম্পানি জেআরএফ জাপানের প্রায় এক নম্বর প্রতিষ্ঠানই বলা চলে। আমি প্রথম দিকে বাংলাদেশে থাকাকালীন জেআরএফে রিমোটলি কাজ করতাম। পরে কোম্পানি আমার কাজে খুশি হয়ে প্রমোশন দিয়ে আমাকে টোকিওতে ট্রান্সফার করে।

তিনি আরও বলেন, এখানে আসার পর দেখলাম আমাদের দেশের আইটি সেক্টর এবং জাপানের আইটি সেক্টর অনেক ডিফারেন্ট। এখানে স্কোপ অনেক বেশি। আমাদের আইটি সেক্টরে আমরা যে কাজগুলো করতাম তার তুলনায় এখানকার কাজের ধরনটাও অনেকটা আলাদা।

তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশ থেকে জাপানে আসতে চায় তাদের উদ্দেশে বলব- বাংলাদেশ থেকে আসার আগে ভালো করে জাপানী ভাষাটা শিখে আসতে হবে। অন্তত যাতে বাংলাদেশ থেকে আসার পরে কমিউনিকেশনে কোনো প্রবলেম না হয়। যেটা আমি নিজেও ফেইস করেছি। আমি এখানে আসার পূর্বে ভাষা শিখে আসিনি। ফলে আমাকে অনেক অসুবিধার সম্মুখীন হতে হইছে। আমি চাই না আমার দেশের কোনো মানুষ এখানে ভাষা না শিখে এসে কষ্ট করুক। পাশাপাশি যদি বাংলাদেশ থেকে জাপানে কেউ শিফট করতে চায় আমি বলব স্টুডেন্ট ভিসায় আসার জন্য। সেক্ষেত্রে এখানে তার ক্যারিয়ারটা ভালোভাবে ডেভেলপ করার সুযোগ আছে। অন্যথায় আমি বলব বাংলাদেশ থেকে একটা জব নিয়ে জাপানে মুভ করবে। এক্ষেত্রে অনেকগুলো কোম্পানি বাংলাদেশে কাজ করতেছে। তার মধ্যে আমাদের জাপান রেমিট ফাইনান্সের একটি শাখা জেআরএফ রিক্রুট। তারা বাংলাদেশ থেকে ইন্টারভিউ নিয়ে দক্ষ কারিগর হিসেবে জাপানে লোক আনার কাজ করছে।

মেহেদী হাসান আরও বলেন, জাপানে এক কোম্পানি থেকে আরেক কোম্পানিতে শিফট করতে হলে ন্যূনতম এন-২ লেভেলে জাপানিজ ভাষা শিখার প্রয়োজন পড়ে। তো সেটা বাংলাদেশিদের জন্য অনেকটাই কঠিন। এক্ষেত্রে ভাষা শিখা এবং নিজের স্কিল ডেভেলপমেন্ট করার বিষয়ে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়ার জন্য অনুরোধ রাখব সবাইকে।

দুই দেশের অর্থমন্ত্রীর বৈঠক : বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে জাপানের অর্থমন্ত্রী সাতসুকি  কাতায়ামা এবং সহকারী অর্থমন্ত্রী মিমুরা আতসুসির এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার জাপানের অর্থমন্ত্রীর কার্যালয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এ বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও বিকল্প অর্থায়নে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যানুগত ও দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করা হয়। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে এবং সহযোগিতা গভীর করার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

আলোচনায় বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বাণিজ্য প্রসারের পাশাপাশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) বাইরে বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। উভয়পক্ষই বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে এবং নতুন নতুন খাতে একসঙ্গে কাজ করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান এবং উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। দেশটির অর্থায়নে বাংলাদেশে অতীতে বড় বড় অনেক অবকাঠামোগত ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে এবং বর্তমানেও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নতুন চুক্তি হচ্ছে। জাপান প্রবাসী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, জাপানে এক ধরনের অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে যা অনেকটা মিনি হাসপাতাল। এগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা রপ্তানি করতে পারলেও বাংলাদেশে করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিমানের ত্রুটিতে ক্ষোভ : প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটির কারণে ক্ষোভপ্রকাশ করে প্রবাসীরা বলেন, ঢাকা থেকে ছাড়ার আগে কেন সেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। যাদের অনিয়ম ছিল তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত