রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পিঠায় মুগ্ধ পর্যটকরা

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কুয়াকাটায় পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াচ্ছে রাখাইন সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও খাদ্যঐতিহ্য। শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা বাহারি পিঠার স্বাদ পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন রাখাইন তরুণ-তরুণী। তাদের হাতে তৈরি বিন্নি চালের বিভিন্ন পিঠা ইতোমধ্যে পর্যটকদের প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

বিন্নি চাল, নারকেল, চিনি ও পাকা তালের রসসহ স্থানীয় বিভিন্ন উপকরণে তৈরি এসব পিঠা শুধু খাবার নয়, রাখাইন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান, নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দ কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এসব পিঠা তৈরির প্রচলন দীর্ঘদিনের। তবে সময়ের পরিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরির চর্চা কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের এই উদ্যোগ খাদ্যঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুয়াকাটার রাখাইন মার্কেট এলাকায় গড়ে ওঠা ‘কেন ছাই’ নামের পিঠাঘরে পাওয়া যাচ্ছে হেতাল পিঠা, চালন পিঠা, পুলি পিঠা, বিন্নি চালের ভাপা ও স্টিকি রাইস বলসহ নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার। পাশাপাশি রয়েছে রাখাইনদের জনপ্রিয় মন্ডি, চিকেন মন্ডি, মন্ডি লাকসু, চিকেন লাকসু ও বিশেষ স্যুপ।

স্থানীয় রাখাইন তরুণ-তরুণীদের নিজেদের হাতে তৈরি এসব খাবার পর্যটকদের নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত করছে। একই সঙ্গে নিজেদের খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটকেরা সাধারণত সমুদ্রসৈকত, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও খাবারের প্রতিও তাদের আগ্রহ রয়েছে। সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে রাখাইন তরুণ-তরুণীদের এ উদ্যোগ কুয়াকাটার পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

কেন ছাই পিঠাঘরের পরিচালক নুংহ্লামং বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে কক্সবাজারে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা পাওয়া যায়। তবে কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটকেরাও যেন এসব পিঠার স্বাদ নিতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই তাঁরা উদ্যোগটি নিয়েছেন। চারজন মিলে কাজটি শুরু করেছেন। পর্যটকেরা ভ্রমণের পাশাপাশি রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পিঠার স্বাদ নিতে পারবেন, এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

পিঠার পাশাপাশি এখানে রাখাইনদের জনপ্রিয় মন্ডি, মন্ডি স্যুপ, নুডলস, মন্ডি লাকসু ও চিকেন লাকসুও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে একই জায়গায় পর্যটকেরা রাখাইন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে পারছেন।

রাখাইন নারী উদ্যোক্তা ও পিঠা তৈরির কারিগর উখিংছেন বলেন, মূলত তাদের ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়। কুয়াকাটা পর্যটন এলাকা হওয়ায় প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। তাঁরা বাঙালি খাবারের স্বাদ নিতে পারলেও সাধারণ সময়ে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা খাওয়ার সুযোগ পান না। এ কারণেই কয়েকজন মিলে দোকানটি চালু করেছেন।

তিনি বলেন, দোকান চালুর পর থেকেই পর্যটকদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে পর্যটন কার্নিভালের সময় চাহিদা অনুযায়ী পিঠা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। অন্য জায়গার খাবার নিয়ে কারও কারও অভিযোগ থাকলেও তাঁদের পিঠা খেয়ে পর্যটকেরা প্রশংসা করছেন।

উখিংছেন আরও বলেন, তাদের পিঠার স্বাদ কিছুটা ব্যতিক্রম। পাহাড়ি ঝুমচাষিদের কাছ থেকে সুগন্ধি সাদা ও লাল বিন্নি চাল সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন হয় নারকেল ও জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা হেতাল পাতা। এসব উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে পিঠা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় অনেক পরিশ্রম করতে হয়।

পর্যটকেরা পিঠা খেয়ে তাদের একটি রেস্তোরাঁ চালুর পরামর্শ দিচ্ছেন, যেখানে প্রতিদিনের খাবারের পাশাপাশি রাখাইনদের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবারও থাকবে। বিষয়টি নিয়ে তাঁরাও ভাবছেন। ব্যবসায়িকভাবে আগে কখনো পিঠা তৈরি না করলেও ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছ থেকে পিঠা তৈরির কৌশল শিখেছেন তিনি। এখন সেই পারিবারিক ঐতিহ্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে পেরে ভালো লাগছে বলে জানান এ উদ্যোক্তা।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কুয়াকাটা বেড়াতে আসা পর্যটক অনিক বলেন, রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা বিক্রি হয়, বিষয়টি আগে তার জানা ছিল না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাখাইন মার্কেটে কেনাকাটা করতে এসে দোকানটি দেখতে পান। পরে কৌতূহল থেকে পিঠার স্বাদ নিতে সেখানে যান।

তিনি বলেন, চালন পিঠা ও হেতাল পিঠাসহ কয়েক ধরনের পিঠা খেয়েছেন। স্বাদ বেশ ভালো লেগেছে। এর আগে কক্সবাজারে রাখাইনদের পিঠা খেলেও কুয়াকাটার পিঠাগুলো তার কাছে বেশ খাঁটি ও সুস্বাদু মনে হয়েছে।

অনিকের ভাষ্য, দৈনন্দিন জীবনে সাধারণত তেলে ভাজা, ভাপা কিংবা রুটি পিঠা খাওয়া হয়। কিন্তু রাখাইনদের পিঠার গঠন, প্রস্তুতপ্রণালি ও স্বাদ সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে চালন পিঠা বাইরে থেকে মচমচে, ভেতরে নরম এবং নারকেলের স্বাদে বেশ সুস্বাদু। কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক অরিন বলেন, কুয়াকাটায় রাখাইনদের তৈরি পিঠা খেয়ে তার খুব ভালো লেগেছে। তাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নও তাকে মুগ্ধ করেছে। 

তিনি বলেন, এর আগে সাজেকে এ ধরনের পিঠা খেলেও কুয়াকাটার পিঠার স্বাদ তাঁর বেশি ভালো লেগেছে। বিশেষ করে রাখাইনদের মন্ডি খুবই সুস্বাদু। পর্যটকদের প্রতি তাঁর পরামর্শ, কুয়াকাটায় বেড়াতে এলে অবশ্যই দোকানটিতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী পিঠার স্বাদ নেওয়া উচিত।

তবে দোকানটির প্রচার-প্রচারণা তুলনামূলক কম বলে মনে করেন অরিন। তাঁর মতে, অনলাইনে প্রচারণা এবং স্থানীয়ভাবে দোকানটির পরিচিতি বাড়ানো প্রয়োজন। এতে পর্যটকের সংখ্যা ও বিক্রি বাড়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তারাও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

কুয়াকাটা কেন্দ্রীয় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো জানান, রাখাইন সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠার বিশেষ স্থান রয়েছে। এর মধ্যে চালন পিঠা (ছ্রেয় চাফু মুং), হেতাল পিঠা (ফেয় থোউ মুং), ঝরা পিঠা (মুংলু শে) ও তাল বরক পিঠা (থেয় চিং মুং) উল্লেখযোগ্য। এসব পিঠার বেশির ভাগই বিন্নি চাল দিয়ে তৈরি হয়। কোনো কোনো পিঠায় নারকেল, চিনি ও পাকা তালের রস ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া রাখাইনরা কুলি পিঠা, পাটিসাপটা ও ভাপা পিঠাসহ বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরি করেন।

তিনি বলেন, বর্ষার শুরুতে হালচাষ, ধানের চারা রোপণ ও রোপণ শেষে এবং নতুন ধান কাটার আনন্দে রাখাইন পরিবারগুলোতে পিঠা তৈরির প্রচলন রয়েছে। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান এবং অতিথি আপ্যায়নেও এসব পিঠা পরিবেশন করা হয়।

তবে সময়ের পরিবর্তনে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরির প্রচলন ধীরে ধীরে কমছে। বিন্নি চাল ও পাকা নারকেলের সহজলভ্যতা কমে যাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের আগ্রহের অভাব এর অন্যতম কারণ।

ভদন্ত ইন্দ্রবংশ থেরো আরও বলেন, নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা এগিয়ে এসে ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরির উদ্যোগ নিলে একদিকে হারিয়ে যেতে বসা খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে কুয়াকাটার পর্যটনেও নতুন মাত্রা যোগ হবে। এতে পর্যটকেরা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। বরিশাল ও উপকূলীয় অঞ্চলের রাখাইনদের সুস্বাদু বিন্নি চালের পিঠা পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

কুয়াকাটা রাখাইন মহিলা মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, রাখাইন তরুণ-তরুণীদের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পর্যটকেরা শুধু সমুদ্রসৈকত বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতেই কুয়াকাটায় আসেন না, তাঁরা স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খাবারের সঙ্গেও পরিচিত হতে চান। সেই বিবেচনায় ঐতিহ্যবাহী পিঠার দোকানটি পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরি করবে।

তিনি বলেন, রাখাইন সম্প্রদায়ের নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থাকলেও সেগুলো সাধারণত ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যবসার মাধ্যমে সেই ঐতিহ্য পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছেন। এতে রাখাইন সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিচিত করতে প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে বলে জানান।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, কুয়াকাটা রাখাইন মার্কেটে ‘সম্প্রীতি কেন ছাই’ নামে পিঠার ঘরটি পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠবে। রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পিঠা বিক্রির এ উদ্যোগ স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাদ্যঐতিহ্যকে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কয়েকটি দোকান চালু করা গেলে পুরো মার্কেটটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে। বর্তমানে যেসব দোকান তালাবদ্ধ রয়েছে, সেগুলো পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট দোকানিরা আগ্রহী না হলে তাদের পরিবর্তে নতুন উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে দোকানগুলো চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত