তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বন্ধ হবে প্রথম ও দ্বিতীয়টি

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫৪ এএম

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ছাড় দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছেতৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালে ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না। এমন শর্ত নিয়ে আপত্তি ও প্রশ্ন তুলেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে একজন সংসদ সদস্য জানতে চান, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালে বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখলে দেশের কোনো লাভ নেই, বরং ক্ষতি হবে। দেশের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে এমন চুক্তির কারণ জানতে চান তিনি। এ সময় সিভিল অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তখন চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করে দেশের স্বার্থ বিবেচনায় রেখে তা করার দাবি জানান একাধিক সদস্য।

জানা গেছে, বৈঠকে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের খরচসহ যাবতীয় বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। পরের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

কমিটির সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ গণমাধ্যমকে বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে আমাদের ক্যাপাসিটি বাড়বে। কিন্তু তাই বলে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনাল বন্ধ করে দিতে হবে কেন? এটা তো রাষ্ট্রের সম্পদ। এই দুই টার্মিনাল দিয়ে তো ৮০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। এটা বন্ধ করা ঠিক হবে না। জানা গেছে, বর্তমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রথম

ও দ্বিতীয় টার্মিনালে বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ৮০ লাখ। তৃতীয় টার্মিনালের বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা ১ কোটি ২০ লাখ।

কমিটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে একাধিক সংসদ সদস্য প্রশ্ন তোলেনতৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করতে হবে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে সিভিল অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান জানান, তিনি যোগদানের আগে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি এর বেশি কিছু বলতে পারেননি।

জানা গেছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জাপানি পক্ষের প্রস্তাবিত চারটি বিতর্কিত চুক্তির শর্ত অনুমোদন করেছে সরকার। একইসঙ্গে শাহজালাল বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আগামী ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু না করার শর্তেও সম্মত হয়েছে বেবিচক।

এসব সিদ্ধান্ত সরকারের দর-কষাকষির সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ঢাকাকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের অন্যতম কেন্দ্র বা অ্যাভিয়েশন হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

চুক্তির আলোচনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ চারটি শর্ত অনুমোদন করেছে। তিনি আরও স্বীকার করেছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ১৫ বছর কোনো প্রতিযোগী বেসামরিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম শুরু না করার শর্তেও সম্মতি দিয়েছে বেবিচক।

এদিকে এসব শর্ত অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করতে বেবিচককে নির্দেশ দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা-১ শাখা থেকে ড. সাইফুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জাপানি সাব-ওয়ার্কিং গ্রুপের উত্থাপিত বিষয়গুলো দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সংসদ সচিবালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যেসব শূন্য পদ রয়েছে, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে সেগুলো দ্রুত পূরণের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিগত আট মাসে সিভিল অ্যাভিয়েশনের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং কেনাকাটার ওপর প্রতিবেদন প্রদানের সুপারিশ করেছে।

বৈঠকে জানানো হয়, বিদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কমিটি সিভিল অ্যাভিয়েশন, বিমান ও পর্যটনের কেনাকাটা, বদলি, নিয়োগ এবং বিমানবন্দরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকির লক্ষ্যে একজন আহ্বায়ক ও চার সদস্য নিয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট সাব-কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে।

বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন যেসব সংস্থা রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে আকস্মিক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কমিটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিপূরক হয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে।

কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী মন্ত্রণালয়ের স্বার্থে যোগ্যতাসম্পন্ন জনবলকে সঠিক জায়গায় পদায়নের সুপারিশ করেন। কমিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত সভা আয়োজনের সুপারিশ করে।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমেদ, মিজ মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মিজ শওকত আরা আক্তার, মো. কামরুল হাসান ও মো. আবু তালিব অংশগ্রহণ করেন।

কমিটির বিশেষ আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার গিয়াস উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত