পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রেক্ষাপটে কারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রেখে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরা।
তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কেবল শ্রমিকদের নায্য স্বার্থের দিকটিই নয়, একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকার আর্থিক সক্ষমতাও গভীরভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক বাসসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধান হওয়া উচিত।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘এ জন্য মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।’
ফজলুল হক বিগত ব্যবস্থার কথা স্মরণ করে জানান, প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি বোর্ড পর্যালোচনার প্রচলিত বিধান ছিল। ২০২১ সালে সর্বশেষ মজুরি বোর্ড গঠনের সময় পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বাধ্যতামূলক বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করে এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে।
শ্রমিকদের অনুকূলে নেওয়া তৎকালীন সেই সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষ চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও মেনে নিয়েছিল। আগামী জানুয়ারিতে এই তিন বছরের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি মিছিল বা আন্দোলনের মাধ্যমে নয়, নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমাধান করতে হবে। এ জন্য মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা প্রয়োজন।’
শ্রমিকদের নায্য দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি বর্তমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ফজলুল হক বলেন, ‘শুধু বেতন বাড়ানোর দাবি করলেই হবে না, শিল্পের সেই বাড়তি ব্যয় বহনের সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।’
শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট ও কষ্টের বাস্তবতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সব সমস্যার সমাধান নিয়মতান্ত্রিক পথেই হওয়া উচিত। সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দু’জন করে প্রতিনিধি এবং সরকারের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তাই বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর সংশ্লিষ্ট সবার আস্থা রাখা প্রয়োজন।’
কারখানা বন্ধের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে তিনি জানান, এ বিষয়ে নানা ধরনের তথ্য আসছে। তবে উত্তরা এলাকায় আট থেকে দশ দিন আগেই বিচ্ছিন্ন কিছু মিছিলের মাধ্যমে শ্রমিক অসন্তোষের প্রাথমিক পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমান দেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে চরম ধৈর্য ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং এ মুহূর্তে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকাই সবচেয়ে সমীচীন।
এদিকে, রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর বর্তমান কমিটির নির্বাহী সভাপতি এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, শ্রমিকদের বেতন নির্ধারণের জন্য সরকার যখন ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তখন চলমান এই আন্দোলনের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই পরিস্থিতির সমাধান করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনের দাবি ও এর পেছনের কারণগুলো স্পষ্টভাবে জানা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।’
এছাড়া তিনি শ্রমিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা এবং সামগ্রিক শিল্পাঞ্চলে একটি শান্তিপূর্ণ কর্মপরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও জোর দেন।
শ্রমিক অসন্তোষে গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
‘ডিসেম্বর ছাড়িয়েও’ শ্রমিক বিক্ষোভকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা: উপদেষ্টা
মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ