দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি শ্রমিক। তাদের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ।
একজন শ্রমিক দিনের পর দিন পরিশ্রম করে নিজের পরিবার পরিচালনা করেন এবং দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। অথচ অনেক সময় তারাই ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। কোথাও মজুরি আটকে রাখা হয়, কোথাও কাজের তুলনায় কম পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। আবার কোথাও অতিরিক্ত শ্রম আদায় করেও যথাযথ মূল্য দেওয়া হয় না। ইসলাম শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় এসব অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।
ইসলাম সৎ উপায়ে উপার্জন করাকে মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে গণ্য করে। কোনো বৈধ পেশার মানুষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।’ (সুরা নাজম ৩৯) এ আয়াত মানুষের কর্ম ও প্রচেষ্টার মূল্য সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি নিজেও জীবনে ব্যবসা করেছেন এবং সাহাবিরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তারা নিজেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য পরিশ্রম করতেন। শ্রমিকের কাজকে অবজ্ঞা করা কিংবা পেশার কারণে কাউকে হেয় করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
একজন শ্রমিকের প্রধান প্রত্যাশা হলো, তার পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়া। তিনি যে কাজের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তা সম্পন্ন করার পর নির্ধারিত মজুরি পাওয়া তার ন্যায্য অধিকার। মালিকের দায়িত্ব হলো, চুক্তি অনুযায়ী যথাসময়ে তার পাওনা পরিশোধ করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৪৪৩) এই হাদিস শ্রমিকের পারিশ্রমিক দ্রুত পরিশোধের গুরুত্ব তুলে ধরে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, মহান আল্লাহ কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে বাদী হবেন। তাদের একজন হলো, যে শ্রমিকের কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে নেয়, অথচ তার মজুরি পরিশোধ করে না। (সহিহ বুখারি ২২২৭)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শ্রমিকের পাওনা আটকে রাখা কিংবা আত্মসাৎ করা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, এটি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়।
আমাদের সমাজে অনেক শ্রমিক দৈনিক মজুরির ওপর নির্ভরশীল। তাদের সেই আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে হয়। অথচ অনেক সময় কাজ শেষ হওয়ার পরও তাদের পারিশ্রমিকের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। কেউ কেউ কাজের চুক্তি অনুযায়ী মজুরি পান না। আবার অনেক ক্ষেত্রে অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানো হয়।
এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। শ্রমিকের অভাব-অনটনকে পুঁজি করে তার পাওনা আটকে রাখা জুলুম। ইসলাম কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট করার অনুমতি দেয় না।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল ৯০) তাই কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও সদাচরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শ্রমিকের অধিকার শুধু মজুরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বিশ্রামের সুযোগ, অসুস্থতার সময় সহযোগিতা এবং সম্মানজনক আচরণ পাওয়াও তার অধিকার। বিশেষ করে নির্মাণশ্রমিক, কারখানার শ্রমিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো শ্রমিককে তার সামর্থ্যরে বাইরে কাজ করতে বাধ্য করা উচিত নয়। কাজের সময় ও দায়িত্ব নির্ধারণে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। একজন শ্রমিকও মানুষ। তার পরিবার আছে, শারীরিক প্রয়োজন আছে এবং বিশ্রামের অধিকার রয়েছে।
ইসলাম শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শ্রমিককেও দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। শ্রমিককে চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে হবে, কাজে ফাঁকি দেওয়া যাবে না এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদের প্রতি আমানতদার হতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে।’ (সুরা নিসা ৫৮) কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেকের ওপর অর্পিত দায়িত্বও আমানতের অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে মালিককে শ্রমিকের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে। নির্ধারিত মজুরি কম দেওয়া, বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত কাজ করানো কিংবা পাওনা পরিশোধে অযথা বিলম্ব করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা হলে কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে। পরিবার ও সমাজে অর্থনৈতিক স্বস্তি আসবে। তাই শ্রমিকের ঘামের মূল্য যথাসময়ে পরিশোধ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার ন্যায্য অধিকার। এই অধিকার রক্ষা করা প্রত্যেক মালিক ও নিয়োগকর্তার দায়িত্ব।
লেখক : খতিব, জামিউন নূর জামে মসজিদ, দক্ষিণ গফরগাঁও, ময়মনসিংহ