দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। অথচ ঢাকায় শুরু হতে যাওয়া এবারের প্রতিযোগিতাকে ঘিরে নেই প্রত্যাশিত উন্মাদনা, নেই প্রচার-প্রচারণার দৃশ্যমান আয়োজন। টুর্নামেন্ট শুরুর আগমুহূর্তেও সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশ জানেন না, ঢাকায় বসতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের এই আসর। এমনকি ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম প্রাঙ্গনেও নেই কোন বিলবোর্ড বা ব্যানার। আন্তর্জাতিক মানের একটি টুর্নামেন্টকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে যেখানে থাকার কথা উৎসবের আমেজ, সেখানে চোখে পড়ছে প্রচারের ঘাটতি, অগোছালো পরিবেশ আর নানা অসংগতি।
কাল বৃহষ্পতিবার জাতীয় স্টেডিয়ামে পর্দা উঠছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের। কিন্তু মাঠের বাইরের আয়োজন নিয়ে শুরু থেকেই রয়েছে অস্বস্তি। প্রচার-প্রচারণার অভাব, আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম, স্টেডিয়ামের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নানা প্রশ্নের মুখে আয়োজক বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ও দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশন (সাফ)।
একসময় সাফ মানেই ছিল ফুটবলপ্রেমীদের বাড়তি আগ্রহ। বাংলাদেশ-ভারত কিংবা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে আলোচনা শুরু হতো অনেক আগে থেকেই। পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকত ব্যাপক প্রচার। দলগুলোর অনুশীলন, খেলোয়াড়দের বক্তব্য, ম্যাচের বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে তৈরি হতো উৎসবমুখর পরিবেশ। অথচ এবার সেই চেনা দৃশ্য অনেকটাই অনুপস্থিত। টুর্নামেন্টের আগে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরিতে আয়োজকদের দৃশ্যমান কোনো বড় প্রচার কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, জনসমাগমস্থল কিংবা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পৌঁছানোর মতো প্রচারণার উদ্যোগও ছিল খুবই সীমিত। টুর্নামেন্ট শুরুর আগ পর্যন্ত ঢাকার কোথাও সাফের প্রচারসংবলিত ব্যানারও চোখে পড়েনি। ফলে অনেকের কাছেই অজানা থেকে গেছে এত বড় একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজনের খবর। শুধু সংবাদমাধ্যমের প্রচারের ওপর নির্ভর করে একটি মহাদেশীয় টুর্নামেন্টের আবহ তৈরি করা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
প্রচার-প্রচারণার ঘাটতির পাশাপাশি স্টেডিয়ামের পরিবেশও হতাশ করেছে। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক দিন আগে জাতীয় স্টেডিয়াম এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে অগোছালো চিত্র। স্টেডিয়াম চত্বর অপরিচ্ছন্ন, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং। এমনকি স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণের ভেতর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে যানবাহন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় আসর শুরুর আগে যে ধরনের সাজসজ্জা, নিরাপত্তা ও উৎসবমুখর পরিবেশ প্রত্যাশিত, তার সঙ্গে এই চিত্রের যথেষ্ট ফারাক। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে।
দর্শক টানার ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকিটের মূল্য। সাধারণ গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতে গুনতে হবে এক হাজার টাকা। ক্লাব হাউসের টিকিট চার হাজার, ভিআইপি গ্যালারি সাত হাজার, রেড বক্স আট হাজার এবং করপোরেট বক্সের টিকিটের দাম ১০ হাজার টাকা। এক টিকিটে একই দিনে দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও সাধারণ দর্শকদের জন্য এই মূল্য যথেষ্ট বেশি। বিশেষ করে দুই ম্যাচের মধ্যবর্তী বিরতি যখন আড়াই ঘণ্টা, তখন একই টিকিটে দুটি ম্যাচ দেখার সুবিধা কতটা কাজে আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচে সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল ৪০০ টাকা। সেই তুলনায় সাফের টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য এক হাজার টাকা নির্ধারণ করায় সমর্থক ও সাবেক ফুটবলারদের মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে যেখানে দর্শকদের মাঠে ফেরানো জরুরি, সেখানে টিকিটের এমন মূল্য নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক, সেই প্রশ্নও উঠছে।
টুর্নামেন্টের আকর্ষণ কমার পেছনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফিফার নিষেধাজ্ঞার কারণে নেপাল এবার অংশ নিতে পারছে না। ফলে ছয় দল নিয়েই আয়োজন করতে হচ্ছে সাফকে। অন্যদিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারতও আসছে না পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে। ভারতীয় সুপার লিগ ও নিউজিল্যান্ড সফরের সূচির কারণে তরুণ এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে দল সাজিয়েছে তারা। ভারতীয় কোচ নওশাদ মুসা অবশ্য জানিয়েছেন, সাফকে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারপরও পূর্ণ শক্তির ভারতীয় দল দেখার প্রত্যাশা করা দর্শকদের জন্য এটি হতাশার খবর।
প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। এবারের আসরের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ভিএআর লাইট ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জাতীয় স্টেডিয়ামের অবকাঠামোগত সুবিধা পূর্ণাঙ্গ ভিএআর ব্যবহারের উপযোগী নয় বলে জানিয়েছেন সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম কাট্টেল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে প্রযুক্তির সহায়তা পাওয়া গেলেও থাকছে না পূর্ণাঙ্গ ভিএআর ব্যবস্থা। আধুনিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার যখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন এমন সীমাবদ্ধতাও আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
অবশ্য আয়োজক বাফুফে ও সাফের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, মাঠ, টিকিটিং ও দর্শক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বয় সভা করার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু সভা ও পরিকল্পনার বাইরে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান প্রস্তুতি কতটা নিশ্চিত করা গেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের মর্যাদা রক্ষায় শুধু মাঠ প্রস্তুত রাখাই যথেষ্ট নয়; দর্শকদের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা, প্রচার এবং সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের লাহোরে চার দল নিয়ে সার্ক গোল্ডকাপ নামে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই প্রতিযোগিতার। সময়ের সঙ্গে সেটিই পরিণত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল আসরে। অথচ ৩৩ বছর পরও আয়োজনের মান, প্রচার-প্রচারণা ও দর্শক সম্পৃক্ততা নিয়ে এমন প্রশ্ন ওঠা উদ্বেগজনক। এবারের আসরে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা অংশ নিচ্ছে। আজ উদ্বোধনী দিনে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের পর রাতে স্বাগতিক বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে ভুটানের।
মাঠের লড়াইয়ে হয়তো উত্তেজনা ফিরবে, গ্যালারিতে তৈরি হতে পারে নতুন উন্মাদনা। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আয়োজকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দর্শকদের আস্থা অর্জন। স্টেডিয়ামের পরিবেশ ঠিক করা, প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো এবং দর্শকদের জন্য স্বস্তিদায়ক আয়োজন নিশ্চিত করা এখন জরুরি। কারণ শুধু কয়েকটি ম্যাচ আয়োজন করলেই একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট সফল হয় না। প্রয়োজন পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, প্রচার এবং দর্শক সম্পৃক্ততার সমন্বয়। এবারের সাফের শুরুতেই সেই সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।