রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে আরও এক ধাপ এগিয়েছে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১। প্রকল্পটির চারটি গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় টানেল ও স্টেশন নির্মাণ, ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন, সিগন্যালিং, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে এমআরটি লাইন-৬ ডিপো এলাকায় অবস্থিত মেট্রোরেল ভবনের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি এবং জাইকা বাংলাদেশ অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ তাকাহাশি জুনকো। এ ছাড়া প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং নাগরিকদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণসহ নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সময়োপযোগী নগর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপান সরকারের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও জাইকার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
চারটি প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরকে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক উল্লেখ করে তিনি চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে শ্রম আইনসহ দেশের প্রচলিত আইন মেনে নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে, যাতে নির্মাণকাজের কারণে সাধারণ মানুষের সাময়িক ভোগান্তি দীর্ঘায়িত না হয়। পাশাপাশি পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসকারী জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ (Employer), প্রকৌশলী (Engineer) ও ঠিকাদারদের (Contractor) মধ্যে স্বচ্ছ, ধারাবাহিক ও কার্যকর সমন্বয় এবং যোগাযোগ বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন সচিব। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতার মাধ্যমে ঢাকাবাসীর জন্য দ্রুততর, আধুনিক, নিরাপদ ও বিশ্বমানের গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্রশংসা করেন। মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজের স্থবিরতা কাটিয়ে পুনরায় বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু ও গতিশীল করার উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাপান পাশে থাকতে আগ্রহী।
চার প্যাকেজে যেসব কাজ হবে
চুক্তি স্বাক্ষরিত চারটি প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
সিপি-০৪ (টানেল ও স্টেশন নির্মাণ): এ প্যাকেজের আওতায় রামপুরা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত ৪ দশমিক ৪৪৭ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ করা হবে।
সিপি-০৬ (টানেল ও স্টেশন নির্মাণ): নদ্দা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশন পর্যন্ত ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণ করা হবে।
সিপি-০৯ (ট্র্যাক ও ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম): এ প্যাকেজের আওতায় রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিংসহ ট্র্যাক স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সুবিধা ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
সিপি-১০ (সিগন্যালিং, টেলিযোগাযোগ, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর ও এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম): এ প্যাকেজের আওতায় কমিউনিকেশন বেজড অটোমেটিক ট্রেন কন্ট্রোলিং সিস্টেম, অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক, এলটিই (LTE) প্রযুক্তির রেডিও কমিউনিকেশন ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ERMS) স্থাপন করা হবে।
চারটি প্যাকেজের কাজ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। পাশাপাশি ঢাকার ক্রমবর্ধমান যাতায়াত চাহিদা মোকাবিলা, যানজটের চাপ কমানো এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।