এআই যেন দেশের বেকারত্ব প্রকট না করে, সতর্ক করলেন রাষ্ট্রপতি

‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের যথাযথভাবে প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে পারলে এআইশিল্পে বিশ্বে নতুন পরিচয় তৈরি করা সম্ভব।’

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৫২ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, এআই যেন দেশের বেকারত্বের সমস্যা আরও প্রকট না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি হবে মানুষের জন্য, মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেন মানুষের সক্ষমতা বাড়ায়, মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখে এবং বৃহত্তর জনকল্যাণে অবদান রাখে, সেদিকে সবার নজর রাখতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ব এখন এক মহাপরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রধান অনুঘটক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগামী দশকে এআইয়ের পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করে দেবে। তাই এ সম্মেলন নিছক কোনো অনুষ্ঠান নয়, বরং ভবিষ্যতের পথরেখা তৈরির মঞ্চ।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কোটি তরুণের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৌশল হিসেবে এআইকে কাজে লাগাতে হবে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কত দ্রুত নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারে, তার ওপর। বর্তমান বিশ্বের সেই নতুন জ্ঞানের নাম এআই। এ প্রযুক্তিকে বিদ্যুতের মতো যুগান্তকারী আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বিদ্যুৎ যেমন পুরো সভ্যতার চেহারা বদলে দিয়েছিল, এআইও তেমনি সবকিছু বদলে দিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এ পরিবর্তনের গতি আরও বাড়বে।

তবে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, এআই যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে প্রতিটি পর্যায়ে সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্য এর নিরাপদ ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় পুরো মানবসভ্যতা অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে।

বাংলাদেশে বেকারত্ব অন্যতম প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই যেন এ সমস্যাকে আরও প্রকট না করে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের সক্ষমতা বাড়াবে, মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখবে এবং বৃহত্তর জনকল্যাণে ভূমিকা রাখবে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, এআই নীতিমালায় নৈতিকতা, মানবাধিকার, ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয় এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য সংযোজন করবে। বাংলাদেশের এ সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশকে এআই উদ্ভাবন ও প্রয়োগকারী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

ব্যবসায়ী সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু ব্যয় কমানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং নতুন পণ্য ও সেবা তৈরি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে এ প্রযুক্তিকে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাত, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণ প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখছে, তা পূরণ করা সম্ভব।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সম্মিলিতভাবে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যে বাংলাদেশ এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি এআই উদ্ভাবনেও নেতৃত্ব দেবে এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের অংশীদার ও প্রণেতা হবে। লক্ষ্য হতে হবে এআইনির্ভর নয়, বরং এআই-সক্ষম, উদ্ভাবনসমৃদ্ধ ও মানবকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের যথাযথভাবে প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে পারলে এআইশিল্পে বিশ্বে নতুন পরিচয় তৈরি করা সম্ভব। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণার সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি সম্মেলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করেন।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত