'অধ্যক্ষের দুর্নীতির ইতিহাস লম্বা', পদত্যাগের আল্টিমেটাম

‘ড. মেহেরুন নেছা আইন বা সরকারি আদেশের কোনো তোয়াক্কা না করে কীভাবে নিজের লাভজনক উদ্দেশ্যে বহিরাগতদের এভাবে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন?’

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম
রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সাইন্সের (সাবেক গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন নেছাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার পদত্যাগে দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
 
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটকের সামনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আন্দোলনের এই চূড়ান্ত বার্তা ও আগামী দিনের রূপরেখা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যক্ত করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
 
সংবাদ সম্মেলনের পূর্বে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের সামনের সড়কের দু’পাশে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। অবরোধের জেরে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম নীলক্ষেত মোড় থেকে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডগামী সমস্ত যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে পার্শ্ববর্তী সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ অবরুদ্ধ থাকায় যানবাহনগুলোকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে দেখা যায়।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি স্পষ্ট দুটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও দাবি তুলে ধরা হয়। শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দুই দফা দাবি হলো:

১. গভীর রাতে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ও সংলগ্ন এলাকায় নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। এই তদন্তের মাধ্যমে ঘটনায় সরাসরি জড়িত সকল পুলিশ সদস্য ও নির্দেশদাতা কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি কঠোর আইনানুগ বিচার করতে হবে।

২. প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক সাধারণ শিক্ষার্থীদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন নেছাকে কলেজে সর্বাত্মকভাবে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হলো। তার পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে আনুষ্ঠানিক সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সাইন্সের সব ধরনের ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নির্ধারিত ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটামের মধ্যে যদি তাদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিগুলো মানা না হয়, তবে পরবর্তীতে আরও কঠোর ও আন্দোলনমুখী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একইসঙ্গে দায়িত্বশীল প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস ও প্রজ্ঞাপন না পাওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ও আন্দোলন ত্যাগ করবেন না বলেও জানান তারা।  

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, ‘অধ্যক্ষ মহোদয় যেদিন থেকে এই ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাসে যোগ দিয়েছেন, সেদিন থেকেই তার প্রতিটি পদক্ষেপ সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। আজ অত্যন্ত বাধ্য হয়ে আমরা তার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছি। আমাদের এই ক্ষোভ বা আন্দোলন কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া একদিনের ঘটনা নয়। আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে ওনার অনিয়ম ও দুর্নীতির ইতিহাস অনেক লম্বা।’

শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আবাসিক সুবিধা ও কোয়ার্টার ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, ‘আপনারা ক্যাম্পাসের যে প্রধান বাউন্ডারি দেখতে পাচ্ছেন, এই সীমান প্রাচীরের ভেতরেই ওনার সরকারি বাসভবন বা কোয়ার্টার অবস্থিত। তিনি ওনার কোয়ার্টারে আইনবহির্ভূতভাবে বহিরাগতদের ভাড়া দিয়ে রেখেছেন।’
 
‘আপনারা সবাই অবগত আছেন যে, সরকারি এই কলোনিগুলো থেকে অন্যান্য যাদের অবৈধভাবে জায়গা দেওয়া হয়েছিল, তাদের ইতিপূর্বে বের করে দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও ড. মেহেরুন নেছা আইন বা সরকারি আদেশের কোনো তোয়াক্কা না করে কীভাবে নিজের লাভজনক উদ্দেশ্যে বহিরাগতদের এভাবে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন? তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাউকেই কোনো প্রকার তোয়াক্কা করেন না এবং স্বেচ্ছাচারী উপায়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছেন,’ বলেন তারা। 

অধ্যক্ষ ড. মেহেরুন নেছার বিরুদ্ধে ক্রমাগত নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও চরম স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে তার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে উত্তাল আন্দোলন শুরু করেন কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যক্ষকে তার নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। দিনভর উত্তেজনার পর দীর্ঘ প্রায় ১৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ও প্রশাসনিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে ড. মেহেরুন নেছাকে ‘উদ্ধার’ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা জানান, তারা তাদের সহপাঠীদের ওপর পুলিশি হামলার বর্বরতার শেষ পর্যন্ত বিচার দেখে ছাড়বেন এবং কোনো অবস্থাতেই বিতর্কিত অধ্যক্ষের অধীনে এই প্রতিষ্ঠানে আর কোনো একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন না। 
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত