রইজ উদ্দিন থেকে আমির হামজা, সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২২, ০৯:৪৭ পিএম

এ বছর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ ঘোষণার পরপরই এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সাহিত্য ও বোদ্ধামহলের পাশাপাশি সাধারণের মধ্যেও তির্যক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

সাধারণত জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতি বছর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে। মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের তালিকা প্রকাশ করেছে।

এ বছর ১০ ব্যক্তি ও একটি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে। তবে সবাইকে ছাপিয়ে এ বছর সাহিত্যে যিনি পুরস্কার পেয়েছেন, সেই মো. আমির হামজাকে নিয়ে শুরু হয়েছে শোরগোল। সবার একটিই জিজ্ঞাসা, কে এই মো. আমির হামজা?

প্রসঙ্গত, এর আগে রইজ উদ্দিন আহম্মদ নামের এক ব্যক্তিকে সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণার পরও সমালোচনা তৈরি হয়। পরে অবশ্য, সমালোচনার মুখে তাকে আর সম্মাননাটি দেয়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রকাশিত ‘বাঘের থাবা’ ও ‘পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি’নামের মাত্র দুটি বইয়ের জন্য আমির হামজাকে সাহিত্য শাখায় দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারটি দেয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ৮৭ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত সমস্যায় আমির হামজা যখন মারা যান, তখন ‘বাঘের থাবা’ নামে কবিতা ও গানের এই বই তিনি কেবল দেখে যেতে পেরেছেন।

আমির হামজার মেজ ছেলে খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী হিসেবে কর্মরত আসাদুজ্জামান জানান, ঝিনাইদহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক থাকাকালীন ২০১৮ সালের বইমেলায় আমরা ‘বাঘের থাবা’ বইটি সারথি ফাউন্ডেশন থেকে বের করি। পরে ২০১৯-এ এই বইয়ের গান অংশটুকু “পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি” এবং কবিতা অংশটুকু “বাঘের থাবা” নাম দিয়ে আলাদা দুটি বই হিসেবে আবার বের হয় অন্যপ্রকাশ থেকে। পরে ২০২১ সালে ‘একুশের পাঁচালি’ নামে আমির হামজার আরও একটি বই বের হয়েছে বলে তার ছেলে জানান।

আসাদুজ্জামান তার বাবাকে কবিয়াল বিজয় সরকারের শিষ্য বলে দাবি করে জানান, ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের জনক আমির হামজা ব্যবসা ও কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরে আকবর হোসেনের নেতৃত্বাধীন ‘আকবর বাহিনী’র একজন যোদ্ধা ছিলেন।

জীবদ্দশায় আমির হামজার কোনো লেখা সেভাবে কোথাও কোনো মানসম্মত জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি বলে জানা যায়।

স্বাধীনতা পদকের মতো রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবান একটি সম্মাননা একজন অচেনা একজনকে দেওয়াতে ক্ষুব্ধ সাহিত্যিকমহলও। ফেসবুকে লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, সম্পাদকদের অনেকে এ বিষয়ে নিজেদের মত প্রকাশ করেছেন।

সাংবাদিক গাজী নাসিরুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সবাইকে তো চিনবেন না। নিজেদের বলয়ের বাইরে গেলেই আপনারা আর তারে চেনেন না। আমির হামজা মফস্বলের কবিয়াল। না-ই চিনতে পারেন। শহিদুল জহিরকে চিনতেন তো? চিনলে তার মৃত্যুর খবর পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় সিঙ্গেল কলাম পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব শহীদুল হক মারা গেছেন হেডলাইনে ছাপতেন না। কথা হইল, শাহ আব্দুল করিম কিন্তু স্বাধীনতা পদক পাননি। একুশে পদক পাইছিলেন সম্ভবত। সরকার সমর্থকদের বলছি, আর যাই যুক্তি আনেন তিনি তো আর শাহ আব্দুল করিমের চেয়ে বড় নন।’

বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত গবেষক সাইমন জাকারিয়া বলেন, ‘বাংলা একাডেমি থেকে "সাধক কবিদের রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি" প্রকাশের মাধ্যমে সাধক কবিদের সৃষ্টিতে ইতিহাসের ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করণের ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপিত ও বিশ্লেষিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা নিশ্চিত বহু সাধক কবি ও তাঁদের সৃষ্টিকর্ম আমাদের আলোচনা-সমালোচনার বাইরে রয়ে গেছে। এ বছর স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত প্রয়াত সাধক কবি আমির হামজা তাঁদের একজন। তিনি ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে ১০ই নভেম্বর মাগুরা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবেশনের ধারায় প্রতিযোগিতামূলক আসরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংগীত রচনা ও পরিবেশন করতেন। তত্ত্বগানের পাশাপাশি সমকালীন সময়, রাজনীতি, ইতিহাস নির্ভর গান রচনা করেছেন। রচিত গানের সংকলন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে 'বাঘের থাবা', 'পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি', 'একুশের পাঁচালি' প্রভৃতি শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। এবছর সাহিত্য বিভাগে সাধক কবিদের ভেতর থেকে একজন প্রয়াত সাধক কবি আমির হামজাকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।’

কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ বলেন, ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবার ২০২২ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন। সরকারি প্রেসনোটে তা জানলাম। এইবার এই পুরস্কার নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল। কেন আগ্রহ ছিল সেটা আগে বলি।

‘একবার আমরা ফেনীর সোনাগাজিতে গেলাম। সেখানে উপজেলা প্রশাসন সেলিম আল দীন উৎসবের আয়োজন করেছে। আমরা প্রচুর হইচই করলাম। খাওয়া-দাওয়া করলাম। ঘুরে বেড়ালাম আশেপাশে। সেখানে গিয়ে সেলিম আল দীনের ঘরে খানিক বসলাম। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখা গেল। সেখানে বসে আলাপেই জানলাম সেলিম আল দীন রাষ্ট্রীয় পদক বা সম্মাননা খুব বেশি পাননি। এরপরে ঢাকায় চলে এলাম আমরা। পরে যা হয়। আমরা নানা কাজে জড়িয়ে যাই, ব্যস্ত হই।’

‘এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন বা প্রস্তাব আহ্বান করা হলো সরকারের তরফে। জানতে পেলাম, সেলিম আল দীনের ভাই নিজে উদ্যোগী হয়ে তার ভাইয়ের নাম প্রস্তাব করতে চান। কিন্তু এজন্য কিছু নিয়ম মানতে হয়। একজন প্রস্তাবকারী দরকার যিনি আগেই স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি দস্তখত করে দিবেন। আমরা সেলিনা হোসেন এর বাসায় গেলাম। সেলিনা আপা শুনে অবাক হলেন। বললেন, এখনো সেলিম আল দীন পাননি এটা সত্যি দুঃখজনক।’

‘যাইহোক, এবারও সেলিম আল দীন স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি। সাহিত্য বিভাগে পেয়েছেন যিনি তার নাম- মরহুম মো. আমির হামজা। তার পরিচয় বলা হচ্ছে- কবি, গীতিকার ও সুরকার। তার প্রকাশিত বই দুটি। একটির নাম, বাঘের থাবা। অপর বইটি মুজিবর্ষে প্রকাশিত হয়েছে। নাম- পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি। ২০১৯ এর ২৩ জানুযারি তিনি মারা গেছেন।’

‘মরহুম মো. আমির হামজা কেন পুরস্কার পেলেন? পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা কী কী- এসব আমরা জানতে চাই না। সেলিম আল দীনকে যে দেওয়া হলো না, এটা একটা বিষয়। সেলিম আল দীনকে কেন বিবেচনায় রাখা গেল না? এটুকু জানতে ইচ্ছে করছে।’

লিটলম্যাগ ‘ক্ষ্যাপা’র সম্পাদক পাভেল রহমান লিখেছেন, ‌‘সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন মরহুম মো. আমির হামজা। উনার বই পড়তে চাই। কেউ উনাকে চিনলে বইয়ের নাম উল্লেখ করেন। উনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। শুনেছি, সেলিম আল দীনের জন্য এবার আবেদন জমা পড়েছিল।

লেখক-সাংবাদিক মোস্তাফা হোসাইন লিখেছেন, ‘আমির হামজা নামের একজন সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২২ পেলেন। তাঁর কোনো লেখা পড়ার সুযোগ পাইনি। নাম শুনেছেন এই লেখকের?’

এর আগে ২০২০ সালে এস এম রইজ উদ্দিন আহম্মদ নামের এক ব্যক্তিকে সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য নাম ঘোষণা করা হয়। সাহিত্য অঙ্গনে একেবারে অপরিচিত ওই ব্যক্তির পুরস্কার অবশ্য পরে দেওয়া হয়নি। সেবার রইজ উদ্দিনের নাম এসেছিল ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে।

অনলাইন বুকশপ রকমারিতে আমির হামজার একটি বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। যেখানে লেখক পরিচয়ে লেখা রয়েছে, কবি আমির হামজার জন্ম ১৯৩১ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার বরিশাট গ্রামে। কৈশোরে পিতৃহীন হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তার খুব বেশি এগোয়নি, পড়াশোনা করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বরিশাট কাজীপাড়া সরকারি বিদ্যালয় থেকে। এরপর ভর্তি হন মহেশচন্দ্র পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। তার বাবা ইমারত সরদার মা অবিরন। কবি আমির হামজা একাধারে কবি গীতিকার ও সুরকার।

তার বিশেষত্ব উল্লেখ করতে গিয়ে পরিচয়ে লেখা— ‘তিনি কেবল গীতিকবি নন, নিজে গাইতেনও। প্রতিযোগিতামূলক কবিগান ও পালাগান করে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল যে, গানের আসরেই গান লিখে ও সুর করে পরিবেশন করতে পারতেন। তার কবি জীবনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি তাৎক্ষণিক দেশ ও জাতির হয়ে শ্রোতার চাহিদা অনুযায়ী গান লিখে পরিবেশন করতেন।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শ্রীপুর বাহিনীতে যোগ দিয়ে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন বলেও তার নিজ বইয়ের লেখক পরিচিতিতে লেখা আছে। তাতে আরও বলা হয়েছে, ‘তার প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বাঘের থাবা’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা গ্রন্থটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়। মুজিববর্ষ উপলক্ষে ’পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি’ শীর্ষক গানের বইটি কবির প্রকাশিত  দ্বিতীয় গ্রন্থ। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য কবিকে ২০১৫ সালে সারথি ফাউন্ডেশন সম্মাননা প্রদান করা হয়।’

এ বছর পুরস্কারপ্রাপ্তরা হচ্ছেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী, শহীদ কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা (বীর বিক্রম), আব্দুল জলিল, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, প্রয়াত মোহাম্মদ ছহিউদ্দিন বিশ্বাস এবং প্রয়াত সিরাজুল হক।

চিকিৎসাবিদ্যায় পুরস্কার পাচ্ছেন অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া ও অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল ইসলাম।

সাহিত্যে পুরস্কার পাচ্ছেন প্রয়াত মো. আমির হামজা এবং স্থাপত্যে প্রয়াত স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন।

গবেষণা ও প্রশিক্ষণে পুরস্কার পাচ্ছে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিডব্লিউএমআরআই)।

পুরস্কারজয়ী প্রত্যেকে পাবেন ১৮ ক্যারেট মানের ৫০ গ্রাম ওজনের একটি স্বর্ণপদক, ৫ লাখ টাকার চেক ও একটি সম্মাননাপত্র।

জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতিবছর স্বাধীনতা পুরস্কার দিচ্ছে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত