ভারতের জাতীয় নির্বাচন ও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোর অধিবাসীদের ভোট দেওয়ার প্রবণতায় যে মিল নেই তা কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট। গত দু’বছর সময়ে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তিশগড়ের মতো কিছু রাজ্যের ভোটাররা বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। সেই বিবেচনা থেকে দেখলে, গত সপ্তাহের পশ্চিমবঙ্গের তিনটি উপনির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্দান্ত জয়কে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা উচিত নয়। কথাটা আরও যুক্তিসংগত এজন্য যে, উপনির্বাচন প্রায়শই ভিন্নরকম বা অপ্রত্যাশিত ফল উপস্থাপন করে, বৃহত্তর পরিসরে যার পুনরাবৃত্তি হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এসপি-বিএসপি মহাগঠবন্ধনের কথা। দল দুটির ওই জোট বাধার ঘটনা ২০১৮ সালের লোকসভা উপনির্বাচনে তাদের সাফল্য এনে দিয়েছিল। ওই ঘটনায় বিরোধীদের অনেকের মনে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির শাসনের অবমাননাকর বিদায় ঘনিয়ে আসছে। পরে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন তাদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে।
ভোটারদের রায়ের ঐতিহাসিক নজির অবশ্য ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ভোটের পªবণতা পাল্টে দেওয়ার ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব কেড়ে নিতে পারবে না। এবারের সাধারণ নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো অতি-রাজনীতির রাজ্যে প্রতিটি নির্বাচনের ফলাফল- সংসদ, বিধানসভা বা স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন যেটাই হোক, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। ২০১৯ এর মে মাসের পরে, এমন একটি ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ত„ণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পªাণশক্তি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে রমরমা বেড়ে ওঠা বিজেপি দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার জন্য মঞ্চের পেছনে সাজঘরে অপেক্ষা করছে। এখন তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে দুটিতেই বিজেপির বিশাল অগ্রগামিতাকে উল্টে দিয়ে ত„ণমূল প্রধান মমতা ব্যানার্জি সফলভাবে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। বার্তাটি হচ্ছে সফলভাবে রুখে দাঁড়িয়ে লড়াই চালানোর মতো পর্যাপ্ত রাজনৈতিক শক্তি তার ভাণ্ডারে এখনো মজুদ আছে।
২০২১ সালের মে মাসের আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা নয়। তবে মমতা ব্যানার্জি এরইমধ্যে এ ধারণা পাল্টে দিয়েছেন যে তিনি চাপে কোণঠাসা হয়ে আছেন। গত ছয় মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে তুলনামূলকভাবে নরম দেখা গিয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে বড় ধরনের জয়ের পর সুপরিচিত প্রাণবন্ত, আক্রমণাত্মক রূপের মমতা ব্যানার্জির প্রত্যাবর্তন আশা করা যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে, রাজনৈতিক সহিংসতা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন একটি রাজ্যে অনেক সময়ই এ কথার অর্থ হয় রক্তাক্ত সংঘাত। জেলাগুলো থেকে পাওয়া খবর বলছে, পªতিশোধের পালা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বিজয়গর্বে গর্বিত ত„ণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা হতোদ্যম বিজেপি কর্মীদের ওপর চড়াও হয়ে চোটপাট চালাচ্ছে।
যথারীতি পশ্চিমবঙ্গের উপনির্বাচনের ফলেরও ব্যাখ্যা-বিশেস্নষণ হয়েছে। এর মধ্যে অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতিশ্রুত দেশব্যাপী জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) বিষয়টি। বলা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জি এনআরসির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে রাজ্যের ভোটারদের আতঙ্ককে সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। তবে এর মধ্যে একটু কারসাজির ব্যাপার আছে। সংসদের চলমান অধিবেশনে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর এনআরসি হবে বলে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ত„ণমূল তাদের প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু করে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে অনুষ্ঠিত আসামের এনআরসির ঘটনাকে।
তৃণমূল প্রচার করে আসছে যে, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) কর্মসূচি কেবল মুসলমানদের প্রতিই বৈষম্যমূলক হবে না, গোর্খা ও রাজবংশী স¤প্রদায়সহ হিন্দু শরণার্থীদের রাষ্ট্রহীন করবে। সংক্ষেপে বললে, আসামের ত্রুটিযুক্ত এনআরসিকে একটি প্রস্তাবিত এনআরসি’র সমতুল্য হিসেবে দেখা হয় যা বাংলাদেশ থেকে আসা সমস্ত হিন্দু শরণার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করবে।
এই নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর প্রচারণাটি গত সাধারণ নির্বাচনে বিজেপিকে সমর্থন করা হিন্দু ভোটারদের কী পরিমাণে উদ্বিগ্ন করেছে তা পরিমাপ করা কঠিন। তবে বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনা প্রমাণ করে, ভোটারদের মমতার পক্ষে ঝুঁকতে এ প্রচারণা ভূমিকা পালন করেছে। ত„ণমূল প্রধান ঘোষণা করেছেন, তিনি কোনো পরিস্থিতিতেই পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি হতে দেবেন না। বিপরীতে, বিজেপি কোনো পাল্টা আক্রমণ চালানো এবং প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিষয়টি প্রচারের ক্ষেত্রে ঢিলেমি দেখিয়েছে। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য এনআরসি নিয়ে নিরন্তর প্রচারণা চালিয়ে স্থানীয় বিজেপি নেতারা বস্তুত সোজা মমতার ফাঁদেই পড়েছেন।
বিজেপি দেশের বিভিন্ন বড় বড় অংশে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে, কিন্তু একটি কার্যকর গণ দল হিসেবে এটি পশ্চিমবাংলায় তুলনামূলকভাবে নতুন। ২০১৪ সালের আগে তারা রাজ্যটির রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রািন্তক অবস্থানেই ছিল। দলের জাতীয় পর্যায়ের গৌরবের আলোর আভাটুকু পেয়েই ছিল তৃপ্ত। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভাবসাব ছিল অনেকটা রাজ্যে সফরে আসা জাতীয় নেতাদের জন্য ঘরোয়া ক্লাব আর আতিথেয়তার জোগানদারের। রাজ্য বিজেপির জন্য এটি এখন আর সত্য নয়। তবে দলটি
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জেরবার। একদল বিজেপিকে একটি ক্ষুদ্র ও সংহত মূলত অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দেখে। অন্যপক্ষ তৃণমূল কংগ্রেসের কায়দার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের অনুসারী। এই লড়াইয়ের সমাধান হয়নি। এছাড়া দলটিতে স্থানীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপের ওপর অযৌক্তিক রকম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বাংলার সাংস্কৃতিক আবহ বোঝার ক্ষেত্রে বিজেপির ঘাটতি রয়েছে বলে যে মার্কামারা ধারণা চালু আছে তা-ই আরও জোরদার হচ্ছে।
এগুলোর কোনোটিই সমাধান অযোগ্য সমস্যা নয়। তবে বিষয়গুলো স্পষ্টতই আঞ্চলিকের সঙ্গে জাতীয় কৌশল সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে। গত লোকসভা নির্বাচনে ত„ণমূল কংগ্রেস একটি জাতীয় অবস্থান নেওয়ার আনাড়ি চেষ্টা করে যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল মমতাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা। কৌশলটি কাজে দেয়নি। এখন বিজেপি যদি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য মোদি আর অমিত শাহকে সামনে রেখে মাঠে নেমে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা মমতার হাতকেই শক্তিশালী করবে। দৃঢ়সংকল্প আর কঠোরতার সঙ্গে চোয়াড়ে আঞ্চলিকতার সফল মিশেলে যিনি অভ্যস্ত।
পশ্চিমবঙ্গ অর্থ এবং পেশিশক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে সৃজনশীল রাজনীতির পরীক্ষাগার হতে পারে। তবে এজন্য ছাঁচটি ভাঙার চেষ্টা করতে হবে আগে।
লেখক : ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামনিস্ট ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার।
টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ