দানবের পেটে দুই দশক

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২১, ১০:২৪ পিএম

আরএসএস সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা কিছুটা ওপর ওপর। ভাসা ভাসা। সেটা এই নয় যে, বাংলাদেশের লোকজন সেভাবে আরএসএস নিয়ে খুব একটা জানেন না। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ লোকই আরএসএস নিয়ে সেভাবে খুব একটা ওয়াকিবহাল নন। অথচ আমাদের দেশে আজ যারা দন্ডমুন্ডের কর্তা তাদের প্রায় সবারই চরম দক্ষিণপন্থি যে জীবনদর্শন তা শুরু এবং বিকাশ পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ বা আরএসএসের অভ্যন্তরে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছিলেন সংঘের সর্বসময়ের কর্মী। বিজেপি মূলত আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা। নাগপুরে আরএসএসের সদর দপ্তরই হচ্ছে বিজেপির থিংক ট্যাংক। দু-একবার আরএসএস নিয়ে একদম লিখিনি তাও নয়। তবে যত দিন যাচ্ছে, যেভাবে শুধু ভারত নয়, সারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আরএসএস নিজেদের শিকড় চারিয়ে দিচ্ছে, তাতে তার সম্পর্কে সতত সতর্ক না থাকলে বিপদ আছে।

কয়েক দিন ধরে আরএসএস নিয়ে চমৎকার একটা বই পড়ছি। নাম দানবের পেটে দুই দশক। আরএসএস, বিজেপি ও হিংস্র হিন্দুত্বকে যেভাবে দেখেছি। লেখক ড. পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আমেরিকার বাসিন্দা। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রামের অগ্রণী সৈনিক। নিউ ইয়র্কের শ্রমিকদের জনপ্রিয় শিক্ষক। এসব পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পোশাকি পরিচয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘদিন গভীর সম্পর্ক ছিল আরএসএসের। বাবা ছিলেন আরএসএসের প্রচারক। বিজেপির প্রথমসারির নেতাদের সঙ্গে পার্থদের পারিবারিক যোগ অনেক বছরের। পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও ছিলেন আরএসএসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সেখান থেকে আমূল বদলে যে বইটি লিখেছেন তা শুধু এক অসামান্য দলিলই নয়, প্রায় গুপ্ত সংগঠনের মতো আরএসএসের যে মুখ ও মুখোশ, অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। সম্পূর্ণ বেআব্রু করে মুখোশের আড়ালে থাকা ভয়ংকর ফ্যাসিস্ট মুখটাকে সামনে এনেছেন।

পড়তে পড়তে অনেক অজানা তথ্য যেমন জানছি, পাশাপাশি কখনো-সখনো কোনো কোনো অধ্যায় পড়তে গিয়ে বুকের রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কুলকুল করে ঠান্ডা স্রোত নামছে শিরদাঁড়া দিয়ে।

এবারের লেখাটা তাই একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে।

অনেক সময় বিরোধী দল বা সংগঠন আরএসএসকে ফ্যাসিবাদী বলে। একদা আরএসএস নেতা স্বয়ং পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়কে এ প্রশ্ন ভাবিয়েছে। ফ্যাসিবাদ নিয়ে নানা রকম ব্যাখ্যা আছে। লেখক নিয়েছেন জার্মানির এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মার্ক ট্রিশের তত্ত্ব। ট্রিশ বলছেন, ফ্যাসিবাদী রাজনীতির মূল বিষয় তিনটা। ১. জাতির প্রাচীন গৌরবে ফিরে যাওয়া। হিটলার যা জনমনে চারিয়ে দিয়েছিলেন। ২. সামরিক ধরনের করপোরেট সামাজিক সংগঠন। মনে করুন, হিটলারের কুখ্যাত গেস্টাপো বাহিনী। ৩. নেতাকে প্রায় পুজো করা। খেয়াল করবেন, এগুলো মিললে আপনি নিশ্চিত যে, সে দেশটা ক্রমেই ফ্যাসিবাদী পথে ঝুঁকছে।

বলাবাহুল্য, আমাদের দেশে বেদবাক্যের মতো আরএসএস জোর দেয় হিন্দু গরিমা পুনর্জাগরণে। তাদের মূল সেøাগান হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান।

করপোরেট গোত্রের সামরিক বাহিনী তাও পাবেন আরএসএসের মধ্যে। ব্যক্তিপুজো কাকে ঘিরে হচ্ছে তা আর আশা করি আলাদা করে বলে দিতে হবে না। তিনি মহামান্য শ্রীযুক্ত মাননীয় নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি।

আধা নিষিদ্ধ আরএসএসের সদস্য হতে গেলে আপনাকে প্রথমেই যে আনুগত্যের শপথ নিতে হয়, তা মোটের ওপর এ রকম সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ও আমার পূর্বপুরুষের সমক্ষে শ্রদ্ধাভরে প্রতিজ্ঞা করছি যে আমি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের সদস্য হচ্ছি, যাতে আমার পবিত্র হিন্দু ধর্ম, হিন্দু সমাজ ও হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের সর্বাঙ্গীণ মহত্ত্ব অর্জন করা যায়। আমি সৎ ও নিঃস্বার্থভাবে মনপ্রাণ দিয়ে সংঘের কাজ করব। সারা জীবন আমি এই প্রতিজ্ঞা মেনে চলব। ভারত মাতা কি জয়।

ছুতোয় নাতায় বিজেপিবিরোধী কথা বললেই ইদানীং দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে বিশিষ্টজন হোক বা সাধারণ মানুষ জেলে পোরার ঘটনা এ দেশে ক্রমেই বাড়ছে। মুশকিল হচ্ছে এটা যারা করছে তাদের রাজনীতিই কিন্তু সব সময় লেখাতে বলাতে বহুত্ববাদী ভারতকে স্রেফ হিন্দু ভূমি বলে জানান দেন। ‘যো হিন্দু কী হিত করে গা ওহি দেশমে রাজ করে গা।’ ফলে সবকা সাথ সবকা বিকাশ এসব কথাবার্তা যে স্রেফ ভাঁওতা তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। শুধু একটি, দুটো নয় আরএসএস বিজেপি যে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানেরই বিরোধী তা নাগপুরের মস্তিষ্কপ্রসূত সংঘীদের নিজস্ব উৎসব ও ছুটির তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে।

ছয়টি ‘পবিত্র’ দিনকে সংঘ পরিবার হিন্দু গৌরবের প্রতীক হিসেবে উদ্যাপন করে। ১. বর্ষ প্রতিপদ। বলা হয়, এই দিনে রামচন্দ্র সিংহাসনে বসেছিলেন। ২. হিন্দু সাম্রাজ্য দিনোৎসব। জ্যেষ্ঠ মাসের শুক্লা ত্রয়োদশীর দিন এই উৎসব উদ্যাপিত হয়। দিনটা হচ্ছে শিবাজীর রাজ্যভিষেকের। এই উপলক্ষে একটা সংস্কৃত গান গাওয়া হয়। যার বাংলা করলে সোজা ভাষায়, ‘শিবাজী মহারাজ হিন্দু জাতি ও ধর্মের সেবা করেছেন। ব্রাহ্মণ ও গো মাতাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। ৩. গুরুপূর্ণিমা। এই দিনটা স্বয়ং সেবকরা ভাগোয়া ঝা-াকে সামনে রেখে সংগঠনের সমর্থকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন। কোটি কোটি টাকা ওঠে এই একটা দিনেই। ৪. রাখিবন্ধন উৎসব। এই উৎসব হয় শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায়। এই দিনে সংঘ বন্ধুত্বের শপথ নিয়ে পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে দেন। সাধারণ প্রথা হচ্ছে বোনরা ভাইয়ের মঙ্গল চেয়ে তাদের হাতে রাখি বাঁধেন। কিন্তু সংঘ পরিবারের মানসিকতা এতই রক্ষণশীল ও পিতৃতান্ত্রিক যে এই দিনেও একজন সংঘী অপর এক সংঘীর হাতে রাখি পরান। গোবলয়ে, যেখানে জাতব্যবস্থা ভয়ংকর, সেখানে শোনা যায় এক জাত অপর জাতের হাতে রাখি বাঁধেন না। ৫. বিজয়া দশমী। এই দিনেই ১৯২৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে ড. কে বি হেডগেওয়ার আরএসএস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আরএসএসের কাছে দিনটা শস্ত্র পুজোর মধ্য দিয়ে শক্তি আহ্বানের দিন। দিনটা খুবই তাৎপর্যের সংঘ পরিবারের কাছে। এই দিন শত্রুকে ভয় দেখাতে সংঘীরা আধাসামরিক পোশাকে অস্ত্র হাতে রাস্তায় রাস্তায় মিলিটারি স্টাইলে মার্চ করেন। ৬. মকর-সংক্রান্তি। এই পৌষ মাসের শেষে আরএসএস হিন্দু ঐক্যের ডাক দেন। বাস্তবে বিভিন্ন জাত আলাদাভাবে ‘ঐক্য’ পালন করে। উৎসব ও ছুটির কোনো তালিকাতেই অ-হিন্দুর কিছুমাত্র ভূমিকা নেই । এমনকি ১৫ আগস্ট, ভারতের স্বাধীনতা দিবসকেও আরএসএস পালন করে ‘ঋষি অরবিন্দের জন্মদিন’ হিসেবে ।

এই পুরোপুরি উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলটি দেশের স্বাধীনতাকেও গুরুত্ব দেয় না। তারাই আজ কথায় কথায় দেশভক্তির সবক শেখানোয় অতি সক্রিয়।

লেখক ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত