পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় আসছে

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২১, ১০:০৩ পিএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন সমাগত। ‘গোদি মিডিয়া’ প্রচার করছে সেখানে বিজেপি ক্ষমতায় এলো বলে। বাংলাদেশ থেকেও অনেক আন্দাজ চলছে। কিন্তু করপোরেট মিডিয়ার চোখ দিয়ে পশ্চিম বাংলার রাজনীতি ও নির্বাচন দেখতে চাই না। যদিও আজকের যুগে আপনি কী খাবেন, কী পরবেন সব ঠিক করে দিচ্ছে করপোরেট মিডিয়া। ফলে করপোরেট মিডিয়াকে আপনি হয়তো অস্বীকার করতে পারেন কিন্তু উপেক্ষা করতে পারবেন না। সে কারণে করপোরেট মিডিয়াকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করার পথ ও কৌশল বের করাই আজকের দিনের পরিবর্তনকামী ও তরুণদের বড় কাজ হওয়া উচিত।

প্রশ্ন করা যেতে পারে, বিজেপি আমলে কতটা নিচে নেমেছে ভারত? কংগ্রেস আমলে ভারত দুনিয়ার অন্যতম ধনী দেশ ছিল না সত্য, তবে বেকারত্বের মহামারীতে এবার অতীতের ৪৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে গেছে। দেশটির ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিস (এনএসএসও) অতীতের সব প্রতিবেদন জমা দিলেও মোদি-জমানার প্রতিবেদনটি প্রকাশই করতে পারেনি।

একপাশে বেকারত্বের ভয়াবহতা, অন্যদিকে ধনী-গরিবের বৈষম্য। গত ৮০ বছরের মধ্যে ভারতে এখন ধনী-গরিবের বৈষম্য সব থেকে বেশি। গরিব আরও গরিব হলেও ধনীরা আরও ধনী হয়েছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যাংকের অর্থ লোপাট করে। ভারতে মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৮ কোটি রুপি। অথচ মাত্র ছয় বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ১০৯ কোটি রুপি। শুধু বিজেপির এ আমলে দেশটিতে ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার ব্যাড লোন বা মন্দ ঋণ নিয়েছেন ধনীরা। এসব অর্থের বড় অংশই নেওয়া হয়েছে সরকারি ব্যাংক থেকে। জনগণের টাকা লোপাট করে যে সম্পদ ধনীরা তৈরি করেছেন, তাতে এখন ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় সম্পদ-বৈষম্যের দেশ।

২০২০ সালে প্রকাশিত ‘ক্রেডিট সুইসে’র গ্লোবাল ওয়েলথ রিপোর্টের তথ্য মতে, দুনিয়ায় আলট্রা ধনীরা যেখানে সবচেয়ে বেশি সম্পদ বানিয়েছেন, এমন দেশের তালিকায় প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র, এরপর চীন ও জার্মানি তারপরই ভারতের নাম। ভারতীয় ধনীদের সম্পদের বড় অংশ বেড়েছে বিজেপির এ আমলে। দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিও ভালো নেই, ভারতের জিডিপি ২০০০ সালের পর এখন সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে।

গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স বা অনাহারের সূচকে ভারত ১১৭ দেশের মধ্যে ১০২ নম্বর স্থানে রয়েছে। এমনকি পাকিস্তান, বাংলাদেশ আর নেপালও ভারতের ওপরে আছে।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন বিজেপির হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, তখন রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানির সম্পদ ছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে এসে মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ বিলিয়ন ডলার। করোনা মহামারীর সময় যখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সম্পদ কমেছে, তখন ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী মুকেশ আম্বানির সম্পদ বেড়েছে ২০ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজক্লিকের তথ্য অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানির প্রতিদিনের আয় ১২২ কোটি ভারতীয় রুপি।

২০০১ সালের অক্টোবরে ভারতের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদি। এর আগ পর্যন্ত গুজরাটে আদানি গ্রুপ সে রকম বলার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো কোম্পানি ছিল না। মোদি গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। এ সময় মোদি আদানির সঙ্গে বন্ধুত্বের দাম দিয়েছে অনেক, আদানি এ সময় তাদের সম্পদ বানিয়েছে ২.৬ বিলিয়ন ডলার। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ বিলিয়ন ডলার।

হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনের রাজনীতিতে ভারতকে ভয়ংকর ও বিপজ্জনক এক খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে বিজেপি। ভারতের সব থেকে বড় সৌন্দর্য ছিল বহু পথ, মত, ভাষা ও সংস্কৃতি। আজ সেটি ধ্বংসের মুখে। ভারত এক ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র নয়। কিন্তু যে বহুত্ববাদী

সংস্কৃতিকে নিয়ে ভারত রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল, তা এখন ভাঙনের মুখে। ফলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের দর্শন সেই অর্থে অখণ্ড ভারতের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

এত তথ্য দেওয়ার কারণ, বিজেপির আমলে ভারতের ব্যবসায়ীরা এমন সব সুবিধা পেয়েছেন, যা নজিরবিহীন। পুরো ভারতে যখন মানুষের আয় কমেছে, তখন বিজেপির এসব ব্যবসায়ীর সম্পদ বেড়েছে। ভারতের পুরো কৃষি খাত এসব বিগ করপোরেটের হাতে তুলে দিচ্ছে বিজেপি। ব্যাংক, টেলিকম বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিচ্ছে। সবশেষ নির্বাচনে ভারতীয়দের দেওয়া মোট ভোটের ৩০ শতাংশের কিছু বেশি নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায়। আসামে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে এনআরসি করার পর জানা গেল শুধু মুসলমান নয়, লাখ লাখ হিন্দুও নাগরিকহীন হয়ে পড়েছেন। বাতিল হলো আসামের এনআরসি।

বিজেপি ত্রিপুরায় ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেখানকার পরিস্থিতি খুবই নাজুক। ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর প্রত্যেকটিতে বেকারত্ব বেশি, কৃষকের আত্মহত্যার হার বেশি। সারা ভারতকে বিজেপি হিন্দু ও মুসলিম দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের পাড়ার মোড়ে বিজেপির কোনো একজনকে তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো পাতি নেতার ঝগড়াও বড় আকারে জায়গা পাচ্ছে রাজ্যের পত্রিকা ও টিভিতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোথাও বিজেপির কোনো সংগঠন নেই। মূলত সিপিএমের যেসব নেতাকর্মী তৃণমূল কংগ্রেসের ভয়াবহ অত্যাচারে ঘরছাড়া, তেমন সংগঠকদের ওপর ভর করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে কল্কে পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সেটি কি রাজ্য নির্বাচনে সম্ভব? তাহলে অনেকে কেন বিজেপি আসছে বলছে?

রাজনীতিতে রুপালি পর্দার নায়ক-নায়িকাদের ব্যাপক আকারে ব্যবহার শুরু করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। সে পথেই এবার বিজেপি হেঁটেছে। যেসব নায়ক-নায়িকাকে মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছে তারা কতবার তাদের এলাকায় গিয়েছে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে তা বরাবর প্রশ্নের মুখে। সেই নায়ক-নায়িকাদের দিয়ে ফের বাজিমাত করতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বেকারের চাকরি কি নায়ক-নায়িকা দেখে মিলবে? ক্ষুধার্তের পেটে কি ভাত যাবে রুপালি পর্দার লোকদের মুখ দেখে? যাবে না।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আসছে এটা আপনার মনে হতে পারে। কেন? কারণ পল্টুদা বলছে। পল্টুদা কেন বলছে, কারণ মন্টুদা বলছে। মন্টুদা কেন বলছে কারণ অধিকাংশ মানুষ বলছে। অধিকাংশ মানুষ কেন বলে? কারণ সবাই বলছে। সবাই কেন বলছে? কারণ মিডিয়া বলছে। নানা জরিপ, ঝগড়ার টুকরো খবর নানা মোড়কে এমনভাবে পাঠকের সামনে হাজির হচ্ছে তাতে কেউ বুঝতেও পারছে না মিডিয়া আসলে এজেন্ডা ঠিক করে দিচ্ছে।

মিডিয়ার কোনো তথ্য বিনা প্রশ্নে ছেড়ে দেওয়া আজকের দিনে কোনো কাজের কথা না।

আজ যারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি তাদের প্রত্যেকের থাকার কথা জেলে, কারাগারে। তারা এখন জোড়া ঘাসফুলের বদলে পদ্মফুল মার্কা নিয়ে দিব্যি রাজনীতি করছে; আবার ক্ষমতায় আসার জন্য বক্তৃতা দিচ্ছে। তৃণমূলের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরা বিজেপিতে যোগ দিয়ে বলছে তারা দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা করবে। এর চেয়ে বড় স্যাটায়ার আর হতে পারে না।

তৃণমূলের সব থেকে বড় অন্যায় হলো পশ্চিম বাংলায় যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিবেশ ছিল তা তারা নষ্ট করেছে। সিপিএমকে নির্মূল করতে গিয়ে তারা গণতন্ত্রকেই নাই করে দিয়েছে। আর এর ফলে তৃণমূলের ঝোলনোলে খেয়ে যাদের পোষাচ্ছে না তারা আরও বড় পার্টিতে গিয়েছে আরও বড় দান মারতে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত