মাছ চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ১১:১৩ পিএম

ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম। তেলাপিয়া উৎপাদনে ৪র্থ। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশে^ বাংলাদেশের অবস্থান ৩য়। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে ৪র্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে ৫ম। এটা জাতির জন্য এক বিশাল গৌরব ও অহংকারের বিষয়। বাংলাদেশ মাছ চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশে মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বল্পমূল্যে মাছ থেকে প্রাণিজ আমিষের স্বাদ ভোগ করছে। হচ্ছে মেধার বিকাশ। বাড়ছে গড় আয়ু। গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে মাছ চাষের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান।  মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য সম্পদের অবদান ৪ শতাংশ। দেশের প্রায়  ১ কোটি ৮২ লাখ লোকের জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে মৎস্য চাষ এবং মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ১৪ লাখ নারী মৎস্য খাতের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়োজিত।

দেশের যে ক’টি জেলায় সবচেয়ে বেশি মাছ উৎপাদিত হয় তার মধ্যে ময়মনসিংহ অন্যতম। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের ১১ ভাগ উৎপাদন হয় ময়মনসিংহ জেলায়। আর মোট উৎপাদিত পাঙ্গাশের শতকরা ৫০ ভাগ আসে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে। ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলায় অসংখ্য মৎস্য খামার গড়ে উঠলেও ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছা, ফুলপুর, গৌরীপুর, গফরগাঁও ও ভালুকাতেই মাছের খামারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ময়মনসিংহ জেলায় সাড়ে চার লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়, যা জেলার চাহিদার চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি। জেলায় মাছের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। আর পাঙ্গাশ যাচ্ছে বিদেশে।

গত কয়েক দশকে মৎস্য খাতে রীতিমতো নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে বাংলাদেশে। এ ক্ষেত্রে বড় একটি ভূমিকা রেখেছে অ্যাকুয়াকালচার বা চাষের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন। ফসল চাষের চেয়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য উদ্যোক্তা এখন মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। লাভজনক এ ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন তারা। মাছ চাষ এখন গ্রামীণ অর্থনীতিকে বেশ শক্তিশালী করে তুলছে। চাষের মাধ্যমে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশে^ পঞ্চম। দেশে মোট উৎপাদিত মাছের অর্ধেকেরও বেশি আসছে অ্যাকুয়াকালচার থেকে। স্বাধীনতার সময় দেশে চাষকৃত ও আহরিত মিলে মোট মাছের উৎপাদন ছিল সাত লাখ টনের কিছু বেশি। পাঁচ দশকের  মধ্যে শুধু অ্যাকুয়াকালচার থেকেই বার্ষিক সরবরাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টনে।

ষাটের দশকে দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর ছিল পাঁচ লাখ। এর বাইরেও ছিল অসংখ্য খাল-বিল ও জলাশয়। এরপরও বাণিজ্যিকভিত্তিতে মৎস্য চাষের বিষয়টি তখনো তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। কারণ নদী থেকে বাছাইকৃত পোনা এনে বদ্ধ  জলাশয়ে চাষ করার বিষয়টি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে, কার্প জাতীয় মাছের ক্ষেত্রে এ নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে মৎস্যচাষিদের। বিষয়টি মাছের জন্য যেমন অনিরাপদ ছিল, তেমনি পোনার মান ধরে রাখাটাও ছিল বেশ কঠিন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সে সময় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবে অনুভব করছিলেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা। এ ক্ষেত্রে সফলতা এসেছিল  স্বাধীনতার ঠিক আগ মুহূর্তে। তৎকালীন মৎস্য বিভাগের পরিচালক ড.  মো. ইউসুফ আলীর হাত ধরে। চাঁদপুরে অবস্থিত মৎস্য বিভাগের অধীন স্বাদু পানির মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কয়েক বছরের প্রচেষ্টার পর কার্প জাতীয় মাছ বিশেষ করে রুই, কাতলা ও মৃগেলের কৃত্রিম প্রজননে সমর্থ হন তিনি। তার ওই উদ্ভাবন বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে মাছ চাষে এক নবদিগন্তের সূচনা করে।

খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বলছে, পুকুরে মাছ চাষে বিশে^ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ।  অভূতপূর্ব এ ঘটনাকে ইফপ্রি ‘নীল বিপ্লব’ বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে মাছ চাষ নিয়ে চার বছরে সাতটি গবেষণা করেছে ইফপ্রি। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত মাছের ৫৬ শতাংশ এখন আসছে পুকুর থেকে।  পুকুরে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে দেশে মাছের মোট উৎপাদন গত ৩৪ বছরে ছয়গুণ বেড়েছে। আর শুধু পুকুরে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ১২ গুণের বেশি। গ্রামে ক্ষুদ্রচাষিদের সৃজনশীল উদ্যোগ, সরকারের নীতি-সহায়তা ও বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন- সব মিলিয়েই এই সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। মাছের উৎপাদন বাড়ায় দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ধানের চেয়েও মাছ চাষ বেশি লাভজনক। এক একর জমিতে বছরে ধান হয় তিন থেকে চার টন আর এক একর আয়তনের পুকুরে বছরে মাছ উৎপাদন হয় ৪০ টন।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট মাছ উৎপাদন হয় ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে পুকুরে উৎপাদিত হয় ২৪ লাখ  ৮৯ হাজার টন। অথচ ১৯৮৩-৮৪ সালে পুকুরে মাছের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন। মূলত দেশের ২৪টি জেলায় পুকুরে মাছের চাষ দ্রুত বেড়েছে। এর মধ্যে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও নেত্রকোনায় পুকুরের  পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের দক্ষিণ, পশ্চিমাঞ্চলের ঘেরে মাছ চাষ গত দুই যুগে ২৪ শতাংশ হ্রাস পেলেও সেখানে পুকুরে দিন দিন মাছ চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। 

 পুকুর থেকে কাদা পরিষ্কার, মাটি কাটা, পাড় বাঁধা ও চুন প্রয়োগ কাজে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন সারা দেশের মৎস্য খামারিরা। আর কিছুদিন পরেই শুরু হবে পুকুরে পোনা ছাড়ার কর্মকা-। যশোর, সান্তাহার ও আদমদিঘির হ্যাচারিগুলোতেও রেণু পোনা উৎপাদন চলছে পুরোদমে। প্রচ- খরা, করোনা আর কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে এবারও যশোরে মাছের রেণু উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন হ্যাচারি মালিকরা। গত বছরও করোনার কারণে শ্রমিক ও পরিবহন সংকটে ওই এলাকার ৪২টি হ্যাচারি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রেণু উৎপাদনের এই ভরা মৌসুমে  করোনা ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এবারও যোগ হয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া। এ অবস্থায় এ খাতে বিভিন্নভাবে জড়িত ৫ লাখ মানুষ বেকার হওয়ার শঙ্কায় আছেন।  যশোর মৎস্য চাষি ও হ্যাচারি মালিক সমিতির নেতারা জানান, দেশের মোট চাহিদার ৬০ ভাগ রেণু যশোরের হ্যাচারিতে উৎপাদিত হয়ে থাকে। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণু উৎপাদিত হয় ৬৫ টন। যশোরে কার্প জাতীয় রেণুর চাহিদা ১৫ টন। বাকি প্রায় ৫০ টন রেণু দেশের বিভিন্ন মাছ চাষিরা নিয়ে যান।

যশোরের হ্যাচারিগুলোতে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্পসহ আরও অনেক প্রজাতির মাছের রেণু উৎপাদিত হয়। হ্যাচারিগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ কাজ করেন। এর বাইরে জেলায় ১৮ হাজার ৮৪ হেক্টর আয়তনের ৫১টি ছোট-বড় বাঁওড় রয়েছে। মাছের পোনা চাষ হয় প্রায় ৬ হাজার নার্সারিতে। এসব জায়গায় কর্মসংস্থান হয় সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষের। লকডাউনের কারণে গত কয়েকদিনে রেণু পোনা বিক্রির পরিমাণ অনেক কমে গেছে। রেণু উৎপাদন যদি এবারও ব্যাহত হয়, তাহলে  হ্যাচারি মালিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনি রেণু পোনা ও মাছ উৎপাদনে জড়িত অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়বে। এতে দেশের মাছ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন হবে।

যশোরের হ্যাচারি মালিকদের হাত ধরেই পোনা উৎপাদনের রুপালি বিপ্লব ঘটে দেশে। চার দশকে গড়ে ওঠা রেণু পোনার বিশাল বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে করোনা ভাইরাস। গত এক বছরে রেণু পোনা সরবরাহ সংকুচিত হওয়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ পুঁজি হারিয়েছেন হ্যাচারি মালিকরা। সম্প্রতি নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরুও করেছিলেন হ্যাচারি মালিকরা। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় সেই স্বপ্নও শঙ্কায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ ধাক্কায় অল্প পুঁজির হ্যাচারি মালিকদের পক্ষে টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। তাদের সুরক্ষায় সরকারি প্রণোদনা ও সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত