বর্ষা ও রবীন্দ্রনাথ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ১০:৪৩ পিএম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুল প্রচারিত ও পঠিত একটি কবিতাংশ দিয়েই শুরু করি, ‘গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।/কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।/রাশি রাশি ভারা ভারা/ধান কাটা হল সারা,/ভরা নদী ক্ষুরধারা/খরপরশা।/কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা- (সোনার তরী)’। এক ফোঁটা, আধ ফোটা কিংবা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, কখনো বা ঝুম বৃষ্টি বর্ষাকালের বৈশিষ্ট্য। প্রেম ও বিরহ- দুটিই চলে বৃষ্টিধারার সময়। কবিদের ক্ষেত্রেও তাই। ‘বৃষ্টি হচ্ছে’ শুনতে পেলেই কেমন যেন কৈশোর এসে গলা জড়িয়ে ধরে। ছেলেবেলা দানা বাঁধে স্মৃতিতে। বর্ষা কতই-না বিচিত্র! বিচিত্র কলধ্বনি সে ধারাপাতের। প্রতিটি অধোর রুপোর ফোঁটার মতো বৃষ্টি-জলকে আলাদা করে চিনে নিতে হয়। সোঁদা গন্ধ, প্রকৃতি রূপ, বৃষ্টিপতনে আশ্চর্য সংগীত ধ্বনিত হয় বর্ষামঙ্গলে। বাঙালি, যাকে বলে জন্ম রোমান্টিক।

আকাশপানে মেঘ জমলেই, বৃষ্টির আগাম সংকেত। মেঘ ও বৃষ্টির অনুষঙ্গ বাঙালির কাছে সমস্ত কিছু নিয়েই প্রিয়তর হয়ে ওঠে। বৃষ্টিধৌত প্রকৃতির রূপে বিমোহিত হয়। স্বতন্ত্র বর্ষাঋতুকে নিয়ে কবিদের কবিতায় বর্ষার রূপ বা সৌন্দর্য ধরা দিয়েছে। ‘এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,/গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা/দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,/গীতময় তরুলতিকা...’ (বর্ষামঙ্গল, কল্পনা)। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষা। তার ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যের পাঁচ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেছেন, ‘বর্ষা নেমেছে প্রান্তরে অনিমন্ত্রণে;/ঘনিয়েছে সার-বাঁধা তালের চূড়ায়,/রোমাঞ্চ দিয়েছে বাঁধের কালো-জলে।/বর্ষা নামে হৃদয়ের দিগন্তে/যখন পারি তাকে আহ্বান করতে...’। কবির ‘শান্তি নিকেতন’ গ্রন্থের ‘শ্রাবণসন্ধ্যা’ নামীয় প্রবন্ধটির কিছু অংশ- ‘অন্ধকারকে ঠিকমতো তার উপযুক্ত ভাষায় যদি কেউ কথা কওয়াতে পারে, তবে সে এই শ্রাবণের ধারাপতনধ্বনি। অন্ধকারে নিঃশব্দতার উপরে এই র্ঝ ঝরা কলশব্দ যেন পর্দার উপরে পর্দা টেনে দেয়, তাকে আরো গভীর করে ঘনিয়ে তোলে, বিশ্বজগতের নিদ্রাকে নিবিড় করে আনে। বৃষ্টিপতনের এই অবিরাম শব্দ, এ যেন শব্দের অন্ধকার...’।

‘এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে এসো করো স্নান নবধারাজলে...’এ গানটিতে বর্ষার নবধারাকে আহ্বান করা হয়েছে। এসব গান বাদলমুখর দিনে-রাতে মাতাল করে। একপ্রকার মাদকতা সৃষ্টি করে। শ্রাবণ আর রবীন্দ্রনাথ একসুরে গাঁথা। বরষার ফোঁটা পড়লেই গেয়ে উঠি– ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে/পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে...’। বরষা নিয়ে, মেঘ নিয়ে এমন অসংখ্য গান লিখেছেন বিশ্বকবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতুবৈচিত্র্যের ভিত্তিতে লেখা গানের সংকলন হচ্ছে ‘গীতবিতান’। এখানে ১১৫টি বর্ষার গান আছে। গীতবিতানের পাতায় পাতায় বর্ষা আসে সৌরভে, বর্ষা আসে বিরহে। এতেই বোঝা যায়, কবির প্রিয় ঋতু হচ্ছে বরষা। ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে, জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না...’– জনপ্রিয় রবীন্দ্রনাথের এ গানটি প্রেমিকের মন উচাটন করে তোলে; বিরহী করে তোলে। সঙ্গীর সান্নিধ্য পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী/উড়ে চলে দিগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণ বর্ষণ সংগীতে/রিমঝিম রিমঝিম...’এমন গান শুনতে শুনতে আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলি প্রকৃতিতে, বরষায়, মেঘের মধ্যে।

কবি তার জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর...’। কখনো রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘আজ বারি ঝরে ঝরঝর ভরা বাদরে,/আকাশ-ভাঙা আকুলধারা কোথাও না ধরে’। কবির শান্তিনিকেতনে যখন প্রথম ‘বর্ষামঙ্গল’ উৎসব হয়েছিল, তখন রবিঠাকুর গেয়েছিলেন-‘আজ আকাশের মনের কথা ঝরো ঝরো বাজে’। কবিগুরুর গানের বাণীতে কালজয়ী কত বর্ষার গান। বৃষ্টিবিলাস ও বর্ষা বন্দনায় রোমান্টিক কবি বিরহ কাতরতায় যেন লিখে রাখেন- ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘন ঘোর বরিষায়’। 

রবীন্দ্রনাথের, ‘বর্ষার শেষ দিনে বেজেছিল বেদনার সুর, নীল বেদনায় নুয়ে পড়েছিল আমার হৃদয়’ অথবা কাজী নজরুলের, ‘আজি বাদল ঝরে মোর একেলা ঘরে, কিংবা শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’ কবিতাদ্বয় বিরহের কথাই বলে। ‘আষাঢ়’ কবিতায়  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠস্বর যেন বর্ষারই চিত্ররূপ- ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে/ তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।/ বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,/আউশের খেত জলে ভরভর,/কালিমাখা মেঘে ওপারে আঁধার/ঘনিয়েছে, দেখ চাহি রে।’ এ যেন প্রকৃতির কবি লংফেলোর প্রতিচ্ছবি। শব্দমালা ভিন্ন কিন্তু বার্তা কিন্তু একই- The day is cold, and dark, and dreary;/It rains, and the wind is never weary;…My thoughts still cling to the moldering Past,/But the hopes of youth fall thick in the blast,/And the days are dark and dreary. (The Rainy Day, Henry Wadsworth Longfellow)

বরষার বাঁধভাঙা জোয়ারে প্লাবিত হয় প্রকৃতি। মানব মনে জাগে প্রণয়, বিরহ ও স্মৃতিকাতরতার অঝোর ধারা। বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কথারা ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। কৃষ্ণচূড়ার সবুজ পাতায় লাল ফুলের আড়ালে টিয়ার বৃষ্টিস্নান, কার্ণিশের জোড়া কবুতর... দূর পাহাড়ের মাথায় জমতে থাকা মেঘবালিকা  ঝরতে থাকে মাঠ-ঘাট-উঠানে, তখন হৃদয়ও নেচে ওঠে অজানা শিহরণে। এ আবেশ কখনো আনন্দের কখনো বিষাদের। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষা। তার ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যের পাঁচ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেছেন, ‘বর্ষা নেমেছে প্রান্তরে অনিমন্ত্রণে;/ঘনিয়েছে সারবাঁধা তালের চূড়ায়,/রোমাঞ্চ দিয়েছে বাঁধের কালো-জলে।/বর্ষা নামে হৃদয়ের দিগন্তে/যখন পারি তাকে আহ্বান করতে’। গান, কবিতা বা প্রবন্ধে বরষা উঠে এসেছে অবলীলায়।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত