অজানিতেই কত বিস্ময়ের মুখোমুখি হই আমরা, নিজের কোনো হাতই থাকে না, সময় আর সুযোগ সেখানে নিয়ে দাঁড় করায়।
হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর রুমের আবাসিক। এই রুমটাকেই তিনি অভিধা দিয়েছেন, পুরনো তীর্থক্ষেত্র। একজন লেখকের জন্য নিজের লেখার জায়গাকে তীর্থক্ষেত্র মনে করার ভেতরে কাজটির প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশিত হয়। সাহিত্যিক হিসেবে নিজের কাজের প্রতি তার পরম মমতা ও ভালোবাসা আমৃত্যু অটুট ছিল।
হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘আমার লেখালেখি জীবনের শুরু হয় মুহসীন হলে। ৫৬৪ নম্বর রুমেই রাত জেগে জেগে লিখে ফেলি প্রথম ও দ্বিতীয় উপন্যাস নন্দিত নরকে ও শঙ্খনীল কারাগার। যাত্রা শুরু করি অচেনা এক পথে। সেই পথ দুঃখ ও আনন্দময়।’ প্রকাশের দিক থেকে ‘নন্দিত নরকে’ আগে, লেখার দিক থেকে ‘শঙ্খনীল কারগার’। তবে কাছাকাছি সময়ে তিনি পর পর তিনটে লেখা লিখেছিলেন ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘নন্দিত নরকে’ আর ‘মনসুবিজন’। প্রভাবিত হয়েছিলেন ১৯৪২-এ ঘাতকের হাতে নিহত সোমেন চন্দের বিখ্যাত ‘ইঁদুর’ গল্প পড়ে, ‘শঙ্খনীল কারাগারে’র প্রথম প্রকাশের ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন তিনি। নামকরণ থেকে কাহিনীসূত্রে কারও দ্বারা প্রভাবিত হলে হুমায়ূন আহমেদ স্বীকৃতিতে কোথাও কার্পণ্য করেননি। কিন্তু, স্মৃতির ছোট-একটি প্রতারণা হুমায়ূন আহমেদের ‘অনন্ত অম্বরে’র (১৯৯২) সঙ্গে ‘বলপয়েন্ট’ (২০০৯) মিলিয়ে পড়লেই চোখে পড়ে। ৫৬৪ মুহসীন হলে যে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যিকযাত্রার সূচনা ঘটেনি, তাও। তিনিই বিস্তারিত জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি। বাবার চাকরির সূত্রে তখন পিরোজপুরে। পিরোজপুর থেকে হুলারহাটের দিকে যে রাস্তাটা গেছে সেখানে একটি কবরস্থান। সেই কবরস্থানের বৃদ্ধ কেয়ারটেকারের সঙ্গে এক বর্ষণমুখর বিকেলে তার আলাপ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হুমায়ূন বৃদ্ধের প্রতি কৌতূহলী। প্রায়ই বিকালের দিকে তিনি সেখানে যান। আকর্ষণ ওই বৃদ্ধ। এত বড় কবরখানায় লোকটি একা থাকেন। বৃদ্ধ একদিন হুমায়ূনের কাছে জানতে চেয়েছেন, এখানে যে প্রায়ই আসেন আপন কেউ আছে? তিনি জানিয়েছেন, না। (তিনি সেদিন জানতেন না একদিন তার বাবা এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন!) এক শেষ বিকেলে সেখান থেকে ফিরে হুমায়ূন আহমেদ ‘শঙ্খনীল কারাগার’ লিখতে শুরু করেন। লেখা শুরুর সেই বর্ণনাটা অসাধারণ : ‘সন্ধ্যাবেলায় আয়োজন করে Chemistry-র বই বের করে পড়তে বসি। খাতায় লেখি- The term ‘macromolecule’ was first suggested by Staudinger./ এইটুকু লিখেই পরের লাইন লিখলাম বাস থেকে নেমে হকচকিয়ে গেলাম।/ Macromolecule-এর সঙ্গে বাসের কোনোই সম্পর্ক নেই। তারপরেও কেন লিখলাম!/ বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাসার সামনে বিশাল পুকুর। পুকুর থেকে ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টির শব্দ আসছে। পিরোজপুর শহরে বৃষ্টি হওয়া মানেই কারেন্ট চলে যাওয়া। আমি সিরিয়াসলি পড়ছি ভেবেই আমার সামনে হারিকেন দেওয়া হয়েছে। আমার মাথার ভেতরে একের পর এক লাইন আসছে। এক ধরনের অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আমি লিখতে শুরু করেছি আমার প্রথম উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার।’ ওই
প্রাকৃতিক অবস্থার ভেতরে ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর শুরুর অংশের মিলও আছে। হয়তো বৃষ্টি এখানে প্রভাবক অথবা অনুঘটক : ‘বৃষ্টিতে ভেসে গেছে সব। রাস্তায় পানির ধারা স্রোত। লোকজন চলাচল করছে না, লাইটপোস্টের বাতি নিবে গেছে। অথচ দশ মিনিট আগেও যেখানে ছিলাম সেখানে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই। শুকনা খটখট করছে চারিদিক।...’
‘শঙ্খনীল কারাগার’ লেখা শেষ হলে তার বাবাকে পড়ানো নিয়েও আছে হুমায়ূন আহমেদের দারুণ অভিজ্ঞতা। তিনি খাতাটা রেখে এসেছেন তার বাবার অফিসের টেবিলে। লিখেছিলেন একটি নীল খাতায়। তার বাবা বাসায় দুপুরের খাবার খেতে এলেন বিকেলের দিকে। কিন্তু ছেলেকে বললেন না কিছু। সন্ধ্যার নামাজের পরে হুমায়ূন আহমেদের মাকে ডেকে বললেন, ‘আল্লাহপাক তোমার বড় ছেলেকে লেখক বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্।’ এই পান্ডুলিপি হুমায়ূন আহমেদ পিরোজপুরেই রেখে এসেছিলেন। ‘ছুটি শেষ হয়ে গেল। আমি বাক্সভর্তি কেমিস্ট্রি বই নিয়ে ঢাকায় ফিরলাম। ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর পান্ডুলিপি ফেলে এলাম। পান্ডুলিপি সঙ্গে রাখার কিছু নেই। বই হিসেবে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ প্রকাশিত হবে, পাঠক পড়বে, কোনো একদিন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় সেই উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবে। সেই চলচ্চিত্র দেশে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান পাবে, মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে পাবে Honourable mention- এইসব কিছুই উনিশ বছরের যুবকটি জানত না।’ ফলে, তার ‘অনন্ত অম্বরে’তে ওই কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়।
‘নন্দিত নরকে’ ৫৬৪ মুহসীন হলে রচিত। এটি তার দ্বিতীয় লেখা, এবং প্রথমটির পর-পরই। এই রুমেই হুমায়ূন আহমেদের, ‘কুকুরজীবন’ পর্বের শুরু অথবা পাকাপাকি চেপে বসে। কুকুরজীবন কেন? ‘লেখকের জীবন হলো কুকুরের জীবন, কিন্তু এই একমাত্র অর্থবহ জীবন।’ গুস্তাভ ফ্লোবেয়ারের এই কথাটি উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘অধ্যাপনা ছেড়ে আমি একসময় কুকুরের জীবন বেছে নেব তা কখনো ভাবিনি।’ ঝোঁকের মাথায় একটি উপন্যাস অথবা দীর্ঘ কাহিনী বা বড়গল্প হয়তো লেখা যায়, কিন্তু একটি লেখাও প্রকাশের আগেই একসঙ্গে পাশাপাশি আরও দুটো কাহিনী রচনা অন্তর্গত লেখকশক্তিরই পরিচায়ক। তাই, মুহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর রুম হুমায়ূন আহমেদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরে একে বলেছেন পুরনো তীর্থক্ষেত্র। এখানে তার ‘হাত দেখা বিদ্যার (!!!) পূর্ণবিকাশ হয়েছে। আবার জীবনের খুবই মর্মান্তিক সময়ও তিনি এখানে কাটিয়েছেন। পাকিস্তান মিলিটারি তার বাবাকে হত্যা করেছে। লাশ তখনো দেখেননি। এখানে ওখানে নিরাশ্রয়ী হয়ে মা-সহ ছোট ভাইবোনদের নিয়ে কাটিয়েছেন, গিয়েছিলেন শর্ষিনা পীরের আশ্রয়েও। আশ্রয় পাননি। ফিরে এসে কোথায় থাকবেন, তার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল অন্তত নিরাপদ, তাই সেখানেই এসে উঠেছেন আবার। সেই ৫৬৪ নম্বর রুম, মুহসীন হল, লিফট আছে, নতুন হয়েছে এই হল, ‘হলে ভর্তি, হলে সিট পাওয়া ব্যাপারটা এত সহজ? বিশ্বাস হতে চায় না। আমি নিজের ঘরে ঢুকলাম।’ দরজায় কাগজ সেঁটেছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ/রসায়ন প্রথম বর্ষ সম্মান, রোল ৩২।’ আর ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পরে, ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্র্যায়। রোজার মাস। থাকি মুহসীন হলের ৫৬৪ নম্বর রুমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের হলগুলো তখন ছাত্রদের জন্য নিরাপদ ভাবা হতো। কারণ যারা এই সময়ে হলে থাকবে তারা অবশ্যই পাকিস্তান অনুরাগী।’ এ সময়ে এখানে ভাতের হোটেল খুললেন। এখন সেই দরজায় লেখা : ‘আহমেদিয়া ভাতের হোটেল।/ ভাত এক টাকা। ডাল আট আনা। ডিম এক টাকা।’ একদিন এখান থেকে আর্মি তাকে ধরে নিয়ে যায়। [‘আমার আপন আঁধার’ (১৯৯৩)]।
এর বছর কুড়ি পড়ে ৫৬৪ নম্বর রুমে থাকার সুযোগ হয় আমার। অজানিতেই এই বিস্ময়ের মুখোমুখি। হুমায়ূন আহমেদ এই রুমের প্রথম বাসিন্দা তা জেনেছি ‘অনন্ত অম্বরে’ পড়ে। রুমটি আমার আবাল্য বন্ধু শেখ মোহাম্মদ মাহমুদের। ছোট ওর ডাকনাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয় এ সময়ে নানান কারণে প্রায়ই দুই-চার মাস বন্ধ থাকে। মাহমুদের রুমে থাকি। হতে পারে, ‘অনন্ত অম্বরে’ পড়ার আগে মাহমুদ বলেছিল এই রুমে হুমায়ূন আহমেদ থাকতেন। রুমটা মুহসীন হলের পাঁচতলায় একেবারে উত্তর দিকে। এদিকে এক সারিতে কয়েকটি সিঙ্গেল রুম, বারান্দা থেকে সামনে তাকালে রাস্তার উলটোপাশে কাঁটাবনের ঢাল দেখা যায়। জানালা খুললে সূর্য সেন হল আর শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট। এ সময়ে প্রতি মাসে দু-মাসে রাতে প্রচুর গোলাগুলি হতো। আন্তঃহল গোলাগুলি। মুহসীনের সঙ্গে জহুরুল হক। কখনো যুক্ত হতো সূর্য সেন-জসীমউদ্দীন। সেই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের মাত্রা বেশি হলে পাশের মাঠেও তা ছড়িয়ে পড়ত। মাহমুদের কাছে শোনা আর অনন্ত অম্বরে পড়ার পরে, একসন্ধ্যার আগে আগে পাতলা ঘুম ভেঙে হঠাৎ ছাদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, এই রুমেই লেখা হয়েছে ‘নন্দিত নরকে’? রুমে একা। এই যে বামদিকে দেয়ালে ঢুকে যাওয়া ছোট্ট টেবিলে রসায়নের পাঠ্যবই পাশে সরিয়ে এখানেই লেখা ওই বই! এরপর আমি অনায়াসে ‘নন্দিত নরকে’র প্রথম কয়েকটি বাক্য ভাবতে পেরেছিলাম : ‘রারেয়া ঘুরে ঘুরে সেই কথা ক’টিই বারবার বলছিল।/ রুনুর মাথা নিচু হতে হতে থুতনি বুকের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। সে তার জ্যামিতি খাতায় আঁকি-ঝুকি করত লাগল।’ ওই বয়েসে নিজেকে খোকা বা মন্টু ভাবাও যায়। এরপরেও মাঝে মধ্যে রাতে, যখন মাহমুদ ওই টেবিলের সামনে পড়ত, শুধু ওখানেই একটি বাল্ব, রুম আধো-অন্ধকার, তখন ছাদের দিকে তাকিয়ে ওই বাক্যগুলো ঘুরে ঘুরে মনে পড়ত!
‘অনন্ত অম্বরে’তেই পড়েছি, একদিন তিনি এসেছিলেন এই হলে। লিখেছেন, ‘বছর পাঁচেক [আনু. ১৯৮৬-৮৭?] আগে মুহসীন হলে গিয়েছিলাম। রাত দশটার মতো বাজে। চুপিচুপি ৫৬৪ নম্বর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা দিলাম। এক ছেলে দরজা খুলে ভয়ংকর গলায় বলল, কী চাই? আমি থতমত খেয়ে বললাম, রং নাম্বার। ভুল জায়গায় এসেছি। পুরনো তীর্থক্ষেত্র দেখার শখ ছিল। দেখা হলো না।’
তবু, মুহসীন হলের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে শেখ মাহমুদ ছোট কিছু ফুল কিনে রুমে রেখেছিল, যদি এই রুমের সাবেক প্রথম বাসিন্দা হুমায়ূন আহমেদ আসেন। কিন্তু পুরনো তীর্থক্ষেত্র দেখতে তিনি আসেননি!
লেখক কথাসাহিত্যিক