চুল নিয়ে টানাটানি কেন

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২১, ১২:১৫ এএম

সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের চুল কাটা নিয়ে আন্দোলনের মধ্যেই চুল নিয়ে নতুন কাণ্ড ঘটিয়েছেন ভোলার চরফ্যাশনের জাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন হাওলাদার। বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, ‘সুন্নতি কাটিং’ ও  ‘আর্মি কাটিং’ ছাড়া অন্য কোনো ধরনে (স্টাইল) চুল কাটলে সেলুন মালিক ও কারিগরদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন এই ইউপি চেয়ারম্যান। গত ২৫ অক্টোবর ওই বিজ্ঞপ্তি জারি করে তার অনুলিপি ইউনিয়নের সর্বত্র সাঁটিয়ে দিয়েছেন তিনি। চেয়ারম্যানের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় এক কিশোরকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে চেয়ারম্যানপুত্রের বিরুদ্ধে। গত ইউপি নির্বাচনে প্রথমবারের মতো  নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নাজিম উদ্দিন হাওলাদার।

এর আগেও চুল কাটা নিয়ে দেশে বেশ কয়েকটি ঘটনা আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। চুল কাটার বিষয়ে প্রথম নিষেধাজ্ঞা আসে টাঙ্গাইলের সখীপুরে। তবে প্রথম সমালোচনা হয়েছিল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে চুল কাটা নিয়ে নোটিস জারির পর। নোটিসটি ইস্যু করেছিল ভূঞাপুর থানার ওসি রাশিদুল ইসলাম। সেই নোটিসে বলা হয়েছিল, চুল-দাড়ি-গোঁফে ফ্যাশন করার ওপর সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আদেশ অমান্যকারীদের ৪০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। নোটিসের নিচে স্বাক্ষর ছিল স্থানীয় নরসুন্দর সমিতির সভাপতি শেখর শীল, সাধারণ সম্পাদক অরুণ শীল এবং থানার ওসি রাশিদুল ইসলামের। এরপর ঝালকাঠিতেও এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার স্থানীয় নরসুন্দর সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ‘মার্জিতভাবে’ চুল কাটার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ঢাকা জেলার সাভারের তেঁতুলঝরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফখরুল আলমও চুল কাটায় ‘শৃঙ্খলা’ আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রতিটি ঘটনাই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, থানার ওসি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রত্যেকেই নিজেদের ভুল স্বীকার করে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাংলাদেশ অধ্যয়ন বিভাগের ১৪ শিক্ষার্থীর মাথার চুল কেটে  দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী প্রক্টর ফারহানা ইয়াসমিন বাতেনের বিরুদ্ধে। সে ঘটনায় আন্দোলনের মুখে ফারহানা ইয়াসমিন বাতেন তিনটি প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। ঘটনা তদন্তে গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের কমিটি। সিন্ডিকেট সভায় ফারহানাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি ফারহানার স্থায়ী অপসারণ। এ নিয়ে উত্তাল রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এদিকে ফারহানার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছিল, তদন্ত কমিটি তার সত্যতাও খুঁজে পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট  বৈঠকে বসে। কিন্তু তারা কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আইনি পরামর্শের জন্য ১০ দিন সময় নিয়েছে।

প্রায় একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের হামছাদী কাজির দীঘিরপাড় আলিম মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছয় ছাত্রের চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে সহকারী শিক্ষক মো. মঞ্জুরুল কবিরের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর তাকে আটক করেছে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। অপরদিকে, সমালোচনার মুখে চরফ্যাশনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশে জাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সাঁটানো বিজ্ঞপ্তিগুলোও খুলে ফেলা হচ্ছে।

কোনো ইউপি চেয়ারম্যান এ রকম নোটিস জারি করতে পারেন না। কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার অধিকার তার নেই। দেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ ধারা লঙ্ঘন করে মানুষের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণœ করে এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া দেশের প্রচলিত আইন অমান্যের শামিল। প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে অমূলক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষিতেই প্রতিবাদ হয়েছে। তবে চুল কাটা নিয়ে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ নতুন মাত্রা পেয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই ঘটনার মধ্যেই ভোলার ইউপি চেয়ারম্যান নতুন এক তুঘলকি কান্ড ঘটিয়ে ফেললেন। ইউপি চেয়ারম্যানের কাজ এলাকার জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা।  যার যা দায়িত্ব নয় সেই ধরনের এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এই ঘটনা মানুষের রুচি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের নামান্তর। এই ধরনের আচরণ সমাজে অস্থিতিশীলতা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই সরকারের উচিত ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত