আম ভারতকে জানার ট্রেন ভ্রমণ

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫৫ পিএম

ভারতকে বুঝতে গেলে সবচেয়ে ভালো ট্রেন ভ্রমণ। নব্বই পরবর্তী দশকে যে বিপুল মধ্যবিত্তের উত্থান ও বিকাশ তার দেখা আপনি পেতে চাইলে প্লেন ধরুন। ইদানীং অনেকেই কলকাতা থেকে দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, এমনকি বেনারস, দার্জিলিং যেতেও প্লেনকেই যাতায়াতের জন্য বেশি পছন্দ করছেন। বেসরকারি বিমানের ভাড়া মোটামুটি। সচ্ছল মধ্যবিত্তের নাগালের ভেতর। সময় কম লাগে। আরাম তুলনামূলকভাবে বেশি। তার ওপর প্লেন জার্নি এখনো একধরনের স্ট্যাটাস সিম্বল। প্লেনে ওঠার লাইনে দাঁড়িয়ে পটাপট সেলফি তোলো আর ফেবুতে আপলোড করো‘অফ টু মুম্বাই’। সুন্দর-সুন্দরী হলে কথা নেই। নিমেষে লাইক, কমেন্টের বন্যা বয়ে যাবে।

আসলে জোরে জোরে হাসা বা কথা বলা ঠিক এটিকেট সম্মত নয় বোধ হয়। আমাদের মতো বুড়ো হাবড়ারা ছবি পোস্টাতে লজ্জা পাই। লাভও নেই। লাইক কমেন্ট পড়বে মেরে-কেটে ছটা। প্লেনে কেউ চেঁচিয়ে কথা বলে না। মুখ গম্ভীর। গাম্ভীর্যের আবার শ্রেণিবিভাগ আছে। এক্সিকিউটিভ, বিজনেস ক্লাসে লোকে যত গম্ভীর, তার চেয়ে কিছুটা কম সাধারণ যাত্রীরা।

এখানে একটা গল্প না বলে পারছি না। মোহিত চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার। অসাধারণ চিত্রনাট্য লিখতেন। মৃণাল সেনের অধিকাংশ চিত্রনাট্য তারই লেখা। কল্পনা লাজমি, ভুপেন হাজারিকার টিভি শো একপলের লেখাও মোহিত দা’র। সেদিন, ডাকাডাকি করেই যাচ্ছি দরজা আর খুলছে না। অনেকক্ষণ বাদে মোহিত দা এলেন। আগের রাতে ঘোষণা হয়েছে মোহিত চট্টোপাধ্যায় ভারতের অত্যন্ত মর্যাদার জাতীয় নাটক অ্যাকাডেমির সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছেন। এর পরই মোহিত দা প্রায় বোমা ফাটালেন। বললেন, আমি আসলে প্র্যাকটিস করছিলাম কোন হাসি ঠিকঠাক। যদি হা হা করে হাসি, লোকে বলবে ছ্যাবলা। গম্ভীর হলে বলবে, পুরস্কার পেতে না পেতেই লোকটা অহংকারী হয়ে উঠেছে। তাই আয়নায় দাঁড়িয়ে ঠিকঠাক হাসি কোনটি তা জানার চেষ্টা করছিলাম। এহেন মোহিত দা তখন আমাদের অনেক তরুণের গুরু। প্রায় সকালে মোহিত দা’র বাড়ি যাই। শেখা কতটুকু হতো জানি না। কিন্তু তার অসাধারণ সান্নিধ্য এখনো মনে আছে। মোহিত দা’র বাসায় বেল বোধহয় ছিল না। থাকলেও আমরা ডাকলেই, যাই বলে সাড়া দিয়ে স্বয়ং মোহিত দা দোতলা থেকে নেমে হাসিমুখে দরজা খুলে দিতেন। কতদিন হয়ে গেছে মোহিত দা নেই। প্লেনে উঠে অকারণে গম্ভীর মুখ দেখলেই মোহিত দা’র কথা খুব মনে পড়ে। আসলে এই কৃত্রিমতাই আধুনিক ভারতের মিডল ক্লাসের বৈশিষ্ট্য।

প্লেন অনেকটা ইউরোপীয় ফুটবলের মতো যান্ত্রিক। সবকিছু পরিপাটি। সাজানো গোছানো। একটু যেন প্রাণহীন। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে ট্রেন হচ্ছে লাতিন আমেরিকার ফুটবল। বর্ণময়, ঝলমলে ও প্রাণবন্ত। সাধে কি আর বলেছি যে ট্রেনে না উঠলে আপনার ভারত দর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তবে ভুলেও ভাববেন না যে ট্রেনের কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই। রাজধানী এক্সপ্রেস, করমন্ডল এসব জাতে ‘কুলীন’। উচ্চবর্গের। ঠাঁটবাট আলাদা। আগের মতো আভিজাত্য না থাকলেও মেজাজ এখনো পুরনো জমিদারদের মতো। ওসব ট্রেনে উঠলে, এসি কামরায় গা এলিয়ে বসে ইংরেজি কেতাব হাতে না নিলে ঠিক আমেজ আসে না। ওখানে কিন্তু বাংলা পড়লে চলবে না। সত্যজিৎ রায়ের নায়ক কিন্তু রাজধানী এক্সপ্রেসের প্যাসেঞ্জার ছিলেন। একটা খটকা সিনেমাতে লেগেছিল। ট্রেন ছাড়ার অনেকক্ষণ বাদে যে স্টেশনের বাইরে জনতা নায়ককে দেখে ফেলে গুরু গুরু বলে চিৎকার করছিল সেটা বর্ধমান। ওয়াকিবহাল মাত্রই জানেন রাজধানী যে গতিতে যায় তাতে বর্ধমান অনেক আগে পার হয়ে যাওয়ার কথা।

কার্ল মার্ক্স কবেই বলেছিলেন যে, রেলপথের বিস্তার ভারতীয় সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পুঁজির বিকাশের সূচনা নিঃসন্দেহে রেলের দৌলতে। আজকের যে ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম তাও গড়ে উঠেছিল রেলওয়ের সৌজন্যে। যাক, তবুও তখন নায়ক ট্রেনে ছিলেন। এখন কোনো পার্শ্বচরিত্রকেও আমরা ট্রেনে দেখি না। যদিও ঠিকঠাক বলতে গেলে ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের কাঁচামাল রপ্তানি করার স্বার্থেই এদেশে রেলওয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনের ভূমিকা নিয়েছিল। ইংল্যান্ডে যাত্রী পরিবহনের সাতাশ বছর পরে ভারতে ট্রেন চলতে শুরু করে। ১৮৫২ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথম এদেশে বোম্বে থেকে থানে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। দূরত্ব ছিল মাত্র একুশ কিলোমিটার।

খুব যখন ছোট তখন একবার ছোট্ট ট্রেনে উঠেছিলাম। সে গাড়ির বগি এত ছোট যে এ পাড়া, এ গ্রামের অলিগলি হয়ে ছুটতে তার কোনো অসুবিধা হতো না। মার্টিন কোম্পানির ওই মার্টিন রেল হাওড়া হুগলীর পথে চলত। সে সব এখন ইতিহাস। দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেনে না চড়লে জীবন বৃথা। স্টেশনের নাম শুনলেই মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। আহা, সোনাদা, টুং, ঘুম কী সব নামের বাহার। নাম তো নয়, এক একটা যেন বৃষ্টির শব্দ। মালদা যেতে পথে ফারাক্কা। সেই ফারাক্কা। যা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার কপিল ভট্টাচার্য প্রথম আপত্তি করেছিলেন এরকম ঢাউস বাঁধ নির্মাণের। বলেছিলেন, ফারাক্কা আগামী দিনে দুই বঙ্গের কাছেই অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি নিয়ে যে অসন্তোষ তার মূল অপরাধী তো ফারাক্কাই। যার বিরুদ্ধে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গণমানুষের লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী। ফারাক্কা ব্যারেজ এখন দর্শনীয় স্থান। গঙ্গা বেশ শুকনো। মুর্শিদাবাদ আর মালদার সীমান্ত ফারাক্কা। মালদা বঙ্গের প্রাচীন রাজধানী। এ জায়গা না দেখলে আপনার বঙ্গের ইতিহাস জানা হবে না। ট্রেনে করে বেনারস যাওয়ার কত স্মৃতি। শীতের রাতে মোগল সরাই গরম গরম চা যে না খেয়েছে তার মনুষ্য জন্ম বৃথা।

কতদিন পর হাওড়া স্টেশনে এলাম। লকডাউনের পর। এমন ফাঁকা স্টেশন জীবনে দেখিনি। লোকাল ট্রেন বন্ধ বলে এমন খাঁখাঁ চত্বর। অধিকাংশ চা কফির দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। যে কটা খোলা, সবকটিই লোকসানে চলছে। যাব শান্তিনিকেতনে। কামরায় খুব ভিড়। বাইরে চমৎকার ধানের ক্ষেত। পিচকুড়ির ঢাল, ঝাপটের ঢাল, নো’আদার ঢাল সব পেছনে এখন। অজয় পার হলেই বোলপুর। শান্তিনিকেতন। টোটো স্টেশন থেকে বের হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে কয়েক হাজার টোটো। আপাত বিরক্ত হলেও ভেবে দেখলে টের পাবেন যে এত হাঁকডাকের মধ্যে লুকিয়ে আছে অর্থনৈতিক সমস্যা। ভারতের সব স্টেশনের ছবিটা এক। মাঝরাতে ভোপাল স্টেশনের বাইরেও দেখেছি টোটোওয়ালাদের পয়সার জন্য মারামারি। শান্তিনিকেতন হচ্ছে মধ্যবিত্ত বাঙালির ডেস্টিনেশন। আম ভারতকে দেখতে চাইলে বিহার উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হবে।

একটা গল্প বলে এ রেল বৃত্তান্ত আপাতত শেষ করব। একবার রাতে বিহারের দানাপুর হয়ে কোথাও একটা যাচ্ছি। খালি কম্পার্টমেন্ট। আমি একা। ওপরের বাঙ্কে মোটাসোটা এক মাঝবয়সী দেহাতি। অনেক রাতে টিকিট চেকার ভদ্রলোককে একবার দুবার ডাকতেই তিনি উঠে সটান চেকারের কলার ধরে একবার ওঠাচ্ছেন ও নামাচ্ছেন। আর বলছেন টিকিট আবার কি! মহেন্দ্র যাদবের কাছে আজ অবধি কেউ টিকিট চায়নি। তুমি কে হে! সামান্য ভদ্রতাটুকুও শেখোনি। এই ভারতকে জানতে আপনাকে ট্রেনে উঠতেই হবে।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত