দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অভিজ্ঞতার আয়নায় বাংলাদেশের উন্নয়ন

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:২২ পিএম

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্যের নব্য শিল্পায়িত দেশসমূহে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের সুযোগ ও প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে যে অভূতপূর্ব (যা ছিল ইস্ট এশিয়ান মিরাকল  নামে খ্যাত) সাফল্য অর্জিত হয়েছিল তার মূলে ছিল সেসব দেশে : ১. বিশ্বায়নে অবগাহন এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণে সচেতন ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ, ২. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের আকাক্সক্ষা ও আয়োজনকে একটা পরিশীলিত ও টেকসই প্রেক্ষাপটে স্থাপন, ৩. যে কোনো মূল্যে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে বহির্বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থান নিশ্চিতকরণে রপ্তানি উদ্যোগ বৃদ্ধি, ৪. টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার শক্ত ভিত নির্মাণ, ৫. আন্তঃদেশীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত সত্ত্বেও বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্প্রসারণের স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব প্রদান, ৬. মানবসম্পদকে পুঁজি হিসেবে রূপান্তরে পর্যাপ্ত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে অধিকতর মনোযোগ, ৭. অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে একটা দেশাত্মগত দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ এবং পুঁজিবাজারের সংস্কার সাধন, ৮. শ্রমবাজারকে সুসংগতকরণে অভিজ্ঞতা বিনিময়ে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি ও অবাধ অভিবাসনের উদ্যোগ গ্রহণ, ৯. বেসরকারি পুঁজিবাজার সৃষ্টিতে তথ্য ও প্রযুক্তি প্রবাহে বাস্তবানুগ আইন প্রণয়ন ও উৎসাহ প্রদায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ, ১০. বিদেশি প্রযুক্তির প্রতি উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ এবং কৌশলগত কারণে বিশেষ বিশেষ শিল্প প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্বারোপ, ১১. রপ্তানি উন্নয়নে মৌলিক শিল্প ও উদ্ভাবনী শিল্প শক্তির সমন্বয়ের দ্বারা পণ্য বহুমুখীকরণ, ১২. বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন প্রেক্ষাপটকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনায় রেখে সচেতন বিবেচনায় এনে শিল্প বিনিয়োগ নীতিমালাকে সংস্কার ও উদারীকরণ এবং সর্বোপরি, ১৩. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার কারণে অভূতপূর্ব শিল্পোন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছিল। 

তাইওয়ান মূল ভূখ- চায়নার সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতে গিয়ে যুদ্ধে মেতে উন্নয়নের কর্মকান্ড থামিয়ে বসে থাকেনি রাজনৈতিক জেদাজেদিতে তাদের শিল্প বিকাশের নীতি বাস্তবায়ন সংকল্পে চিড় ধরাতে পারেনি। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র থাকলেও কোরিয়ার জনগণ ও সরকার দেশের শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত হয়নি।

জাতীয় সংহতিকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে মালয়েশীয় অর্থনীতিকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গড়ে তুলতে মাহাথির মোহাম্মদের নেতৃত্ব ছিল অবিসংবাদিত। দুর্নীতি ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও ফিলিপাইনের নাগরিকরা বেসরকারি খাতের বলিষ্ঠ বিকাশের ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেই চলেছে। সিঙ্গাপুর, চীন, থাইল্যান্ড সবাই যার যার দেশে এগিয়ে চলেছে। এই উপমহাদেশের শ্রীলঙ্কা ও ভারত, অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রশ্নে, ভেতরে যত দ্বন্দ্ব ও বিবাদ বিসংবাদ থাকুক না কেন সব পক্ষের ঐকমত্যের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ়চিত্ত। জাপানি অর্থনীতিবিদ এস ইচিমুরা তার ‘দ্য রোল অব জাপান ইন এশিয়া’ (১৯৯৩) গ্রন্থে  জাপান এবং পূর্ব এশীয় কয়েকটি দেশে অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণসমূহের তালিকায় দেখিয়েছেন জাপানের  ক্ষেত্রে ১. উচ্চহারে পুঁজির সংস্থান, ২. উচ্চহারে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বৃদ্ধি, ৩. পরিশ্রমী ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক  শক্তি, ৪. কৃষি খাতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, ৫. বিদেশি ও জাপানি প্রযুক্তি অনুধাবন ও প্রয়োগে উন্নত মেধা, ৬. উন্নত  শ্রম ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক- উৎপাদন মালিকানার মধ্যে মেলবন্ধন, ৭. কার্যকর রাজস্ব ও মুদ্রানীতি, ৮. উচ্চ গুণ ও ক্ষমতাসম্পন্ন শিল্পনীতি, ৯. ব্যাংক সেক্টর কর্তৃক বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তাকে উপযুক্ত পরামর্শ ও প্রযতœ  প্রদান এবং ১০. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

ইচিমুরা দেখিয়েছেন, অনেকগুলো কারণের মধ্যে সেরা এগারো কারণ পূর্ব এশীয় অর্থনীতি সাফল্যের দ্বারে  পৌঁছিয়েছে ১. উচ্চহারে পুঁজি সংস্থান, ২. অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বৃদ্ধি, ৩. কৃষি ও শিল্প খাতে উপযুক্ত প্রযুক্তির   সফল প্রয়োগ, ৪. দক্ষ শ্রমিক শক্তি, ৫. নিয়ন্ত্রিত জন্মহার, ৬. রপ্তানিমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা, ৭. যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের সহযোগিতা, ৮. তুলনামূলকভাবে পরিবেশের উন্নত ভারসাম্য বজায়, ১০. অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগী বেসরকারি ও সরকারি আমলা সৃষ্টি এবং ১১. সামাজিক শান্তি ও রাজনৈতিক  স্থিতিশীলতায়  স্বাভাবিক  অবস্থা বজায় থাকা। এসব দেশে এ চেতনাই সর্বত্রগামী হয়েছে যে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ভাবনাকে সামগ্রিকতায় রূপ দিতে হবে। পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বা থেকে সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না। সময়ের দাবিকে সুবিবেচনায় এনে প্রাপ্ত সমুদয় সুযোগকে সদ্ব্যবহারে যে দেশ যতখানি সক্ষম হয়েছে সে  দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ততখানি সুদৃঢ়করণ সম্ভব হয়েছে। সময়সূচি অনুসরণে, লাগসই পন্থা অবল¤¦নে এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সাফল্য সুদূরপরাহত রয়ে গিয়েছে যে পরিবেশে সেখানে শিল্পোন্নয়ন এখনো দুঃস্বপ্ন বৈকি।

প্রথাগত রীতিনীতি প্রয়োগ, পরীক্ষা, পর্যালোচনা ও পরিবীক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে এবং বহিরারোপিত প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টায় অভিনয়ে সময় ক্ষেপণের অবকাশ নেই। একথা জাপান গত শতাব্দীর শুরুতেই উপলব্ধি করতে পেরেছিল। তাই তারা শত বাধাবিপত্তি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও) মোকাবিলা করেও তাদের শিল্প-বাণিজ্য বিকাশের ধারাকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে। ১৮৬৮ সালে মেইজি যুগ শুরু হওয়ার পর জাপান প্রথম বিশ্বাভিমুখী হওয়ার চিন্তাচেতনাকে নিজেদের মেধা ও মননের সৃজনশীলতায় সম্প্রসারণ করে। এ সময়ে তারা সরকারি আমলা ব্যবস্থাপনাকে বেসরকারি আমলায় উত্তরণ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়াসকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। দেশীয় অর্থনীতির সঠিক স্বার্থরক্ষায় জাপানি সরকার, আমলা ও জনগণের একনিষ্ঠতায় কোনো ঘাটতি নেই। তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো বিভেদ কিংবা বৈষম্যের দেয়াল তোলার অবকাশ নেই। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় অর্থলগ্নিতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ব্যাংক ব্যবসাকে ট্যাক্সপেয়ারের মানি ভর্তুকি দিয়ে টেনে তোলার মতো আপাত হঠকারী হিসেবে প্রতীয়মান পদক্ষেপ নিতেও তারা কুণ্ঠিত হয় না। কেননা অর্থনীতির চলৎশক্তি বজায় রাখার স্বার্থে জনমত সেখানে সদাজাগ্রত এবং গঠনমূলক আলাপ-আলোচনার প্ল্যাটফর্ম তৈরির মাধ্যমে মিডিয়া সব সময় নীতিনির্ধারণে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। জাপানিরা যে কোনো অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কিংবা পদক্ষেপের সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতে জানে। আজ আর কালের মধ্যে, নিজেদের দলগত স্বার্থ আর শাসনামলের মধ্যে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়ন ভাবনাকে বেঁধে ফেলে না নিজেদের আখের গোছানোর  উদ্দেশ্য নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে না। পরিপোষণমূলক সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নে দল বা সমর্থক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার কথা চিন্তা করে না, রীতিনীতি ও পদ্ধতি প্রবর্তনে ক্ষুদ্র স্বার্থবাদিতাকে প্রশ্রয় দেয় না। হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না  জাপানি অর্থনীতি বিকাশের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপ প্রশ্নে এটাই মোদ্দা কথা। সে দেশে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে কারা এলো গেল সেখানকার ‘কাশিমবাজার কুঠি’ থেকে তার তত্ত্ব-তালাশ চলে না। চিয়োদা কু’র বড় কোম্পানিগুলোর কেন্দ্রীয় কার্যালয়গুলোও কখনো বিচলিত হয় না কিংবা মাথা ঘামায় না কাশিমাগাসেকির সরকারি সচিবালয়ে কে এলো বা গেল। পদলেহন, দলাদলি, লাল সাদা নীল গ্র“পবাজির কোনো ব্যাপার সেখানে নেই। অতীতেও কি ছিল? কিছুটা হয়তো ছিল গত শতাব্দীর প্রথম ৩/৪টি দশকে, যখন সেখানে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও বেশ কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল।

এখন অধিকাংশ দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মুখ্য উৎস ও নিয়ন্তা। পাবলিক সেক্টর সেখানে প্রাইভেট সেক্টরের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং ক্ষেত্রবিশেষে অন্যতম অংশীদার। সরকার এখন আর ব্যবসা বাণিজ্য কিংবা শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নেই। সরকারি উদ্যোগ এখন শিল্পায়নের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ আর বাজার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর নীতিমালা নির্ধারণ ও অর্থনৈতিক কূটনীতির সহায়তা প্রদানে সচেষ্ট। স্বাধীনতা লাভের পর প্রথম দশকে মালয়েশীয় নেতৃত্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকান্ডকে এমন একটা শক্ত ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সত্তরের দশকে একবার এবং ১৯৯৭ সালে এশিয়ার অর্থনৈতিক সংকটের সময় সাফল্যের সঙ্গে টিকে যায় দেশটি। বিগত দুই দশকে মালয়েশিয়ার উন্নয়ন প্রয়াসে নেতৃত্বদানকারী প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের উন্নয়ন দর্শন (ভিশন ২০২০ নামে খ্যাত) এর মূল কথা ছিল সমগ্র মালয়েশীয় অর্থনীতিকে ইনকরপোরেটেড অর্থনীতিতে পরিণত করা এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মালয়েশিয়াকে শুধু স্বয়ম্ভর করে তোলা নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নেতৃত্ব গ্রহণোপযোগী করে তোলা।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত