সাম্য কি আর ফিরবে না

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২২, ১০:৪৭ পিএম

গৌতম বুদ্ধ সাক্যসিংহ যেমনি বৈশাখী পূর্ণিমা রাতে শিষ্য আনন্দকে সঙ্গী করে নিরঞ্জনা নদীতীরের বোধিদ্রুম পরিত্যাগ করে উরুবেলা গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি সাম্যও এক দিন নিখোঁজ হয়ে যায়। গৌতম যেমনি রাজকন্যা রূপসী যৌবনবতী সুজাতার নিজ হাতে রান্না করা অমৃততুল্য পায়সান্ন ভক্ষণ করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন, সাম্যের বেলায় এমনটা ঘটেছিল কি না তা কারও জানার কথা নয়। হতে পারে জনশ্রুতি কিংবা গুজব, সাম্যকে আচমকাই দেখা গেছে ক্ষণ মুহূর্তের জন্য আমেরিকার স্ট্যাচু অব লিবার্টি কিংবা স্বাধীনতা ঘোষণার সৌধ লিবার্টি হলের পাদদেশে। গুজবের হাত-পা-চোখ-কান না থাকলেও আছে দুরন্ত পাখা। তাই উড়তে পারে হৃদয়-মন-স্মৃতির চেয়েও দ্রুতগতিতে। তাই রটে যায় সাম্যকে বিদেশি পর্যটকরা দেখতে পেয়েছে রাশিয়ার মস্কোর মিউজিয়ামে মমি হয়ে শুয়ে থাকা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের কাচের শবাধারে। হঠাৎ এমনও শোনা গেল ব্রিটেনে কার্ল মার্কসের সমাধির পাশে সাম্য দাঁড়িয়ে ছিল ধ্যানমগ্ন অবস্থায়। আসলে সবই কল্পকথার গল্পের গোলকধাঁধা। আসল সত্যটি হচ্ছে সাম্য নিখোঁজ হয়ে গেছে।

অথচ কেউ প্রশ্ন করে না, আদৌ সাম্য নামের কারও অস্তিত্ব কি বাংলাদেশ কিংবা সাব-কন্টিনেন্টে ছিল? অবশ্যই ছিল সাম্যের আকাক্সক্ষা এবং আছেও। সাম্য কোনো কিশোর-বালকের নাম নয়। সাম্য হচ্ছে নৈর্ব্যক্তিক একটি স্বপ্ন, একটি মানবকল্যাণমূলক রাজনৈতিক আদর্শ। এর যাত্রাপথ ফুলে ফুলে ঢাকা নয়, বরং কষ্টসাধ্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম এবং রক্তাক্ত। এ পথ রক্ত চায়, আত্মবলিদান চায়। মৃত্যু সেখানে আতঙ্কের বিষয় নয়, বরং প্রেরণার। বাংলাদেশ আত্মবলিদানের দেশ, রক্তদানের দেশ। এ রক্তদান হাসপাতালের রোগীর জন্য রক্তদান শিবির নয়। এ রক্ত সংগ্রামের রক্ত, মৃত্যুপণ লড়াইয়ের রক্ত। রাজনৈতিক মুক্তির জন্য রক্ত। কিন্তু নির্মম সত্যটি হচ্ছে বঙ্গ-ভারত উপমহাদেশে সাম্যের সংগ্রাম আজও পরাহত। তাই অনার্জিত। বাঙালি পাঠক, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী পাঠক অতি আগ্রহে রাত শেষ করে দিয়েছে বিপ্লবী চেগুয়েভারার রোমাঞ্চকর জীবনাখ্যান পাঠ করে। উত্তেজিত হয়েছে, শিহরণ জাগিয়েছে রক্তে, কিন্তু পারেনি চে হতে। পারেনি চে-এর মতো ফিদেল কাস্ত্রোর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে কিউবা ছেড়ে বলিভিয়ায় মৃত্যুর গুহায় পা বাড়াতে। তরুণরা, এদের সঙ্গে আমরাও কল্প চোখে দেখেছি বলিভিয়ার পাহাড়ি দুর্গম জঙ্গলেঘেরা গ্রাম্য স্কুলের (বিপ্লবীদের তৈরি) বেঞ্চিতে সটান পড়ে আছে চে-এর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ।

চে কেবল রোমান্টিক স্বপ্ন-কল্পনা নয়, বিপ্লবের নির্মম-নিষ্ঠুর জীবন বাস্তবতার রক্তাক্ত মহাসত্য। এই উপমহাদেশে বারবার চে এসেছেন, লেনিন এসেছেন, স্ট্যালিন-মাও এসেছেন স্বপ্নের পথ ধরে, বাস্তব থেকে বহু দূরবর্তী স্বপ্নে এবং রক্ত-মাংসের বাইরে রোমান্টিক ছায়ামূর্তির আকার নিয়ে। তার পরও স্বীকার করতেই হবে সাম্য বারবার স্বপ্নের রূপ ধরে বাংলার মাটিতে পা ফেলেছে। ভাষাবিদ্রোহ, গণ-অভ্যুত্থান আর স্বাধীনতার জন্য একাত্তরের যুদ্ধ। মিছিলের ভেতর, পুলিশের ভেতর কারফিউ ভেঙে ছাত্র, শ্রমিক আর গণজনতার প্রতিরোধের ভেতর আচমকা একপলক সাম্যকে দেখতে পেয়েছে মানুষ। মাত্র একপলক, তারপর অদৃশ্য। সাম্যকে প্রথম স্পষ্ট অবয়বে বাঙালিরা দেখেছে তে-ভাগা আন্দোলনে, নানকার বিদ্রোহে, কৃষক বিদ্রোহে, নকশাল আন্দোলনে। তারপর ধীরে ধীরে সব পাল্টে গেল। কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ কেমন যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে এক দিন শ্মশান-গোরস্থানের নীরবতা নেমে আসে। সেই থেকে রাজপথে মাঝেমধ্যে গণতন্ত্রের জন্য মিছিল দেখেছে মানুষ। মানুষ গণতন্ত্র চায়, ভোটের-নির্বাচনের গণতন্ত্র। কিন্তু ভুলে যায় শোষণমুক্ত সমাজের কথা। ঠিক তখন থেকেই ঢাকার রাজপথে মানুষ আর দেখতে পায় না সাম্যকে। নগর পরিত্যাগ করে হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল সাম্য?

তন্ন তন্ন করে ঢাকার রাজপথ কেন, রাজনৈতিক দলের হেডকোয়ার্টার থেকে শুরু করে সারা বাংলায় খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না সাম্যকে। কোথায় হারিয়ে গেল সাম্য? কলকাতায় কি? না, সেখানেও নয়। দান-খয়রাত, অনুদান-ভিক্ষার রাজনীতির সুরা গিলে বুঁদ হয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি। সিপিএম ‘সাম্য ... সাম্যরে ... কোথায় বাপধন তুই’ ... বলে কান্নাকাটি করছে, কিন্তু কলকাতার আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের সিপিএম হেডকোয়ার্টারের ধারে-কাছে আর সাম্যকে দেখা যায় না। কোথায় গেল তবে সাম্য? রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখতে ছুটে গেছে ওখানে? গেলে বোকামি হবে। সেই কবেই তো রাশিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, পূর্ব জার্মান, চেকোসøাভিয়া, যুগোস্লাভিয়া, শ্লোভেনিয়া, হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া থেকে তাড়া খেয়েছে সাম্য। তবে কি চীনের পিকিং গেছে সাম্য? নিশ্চয়ই যাবে না। কেননা সেখান থেকে তো তাকে তাড়িয়েছে পুঁজিবাদী ছদ্মবেশী সমাজতন্ত্র। সাম্যের বিকল্প, হুবহু তার মতোই চেহারার আর একজনকে যাত্রাপালার পোশাক পরিয়ে খাড়া করে রেখেছে বাজার অর্থনীতির চীন। তবে সাম্য গেল কই? সদরঘাট, বাংলাবাজার, নীলক্ষেত, নিউমার্কেটের পুরাতন বইয়ের দোকানে খুঁজলে সাম্যকে পাওয়া যাবে? হয়তো মিলতেও পারে। কেননা এখন আর রাশিয়া বা চীনের ঢাকার দূতাবাসের গ্রন্থাগারে, মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুংকে খুঁজে পাওয়া যায় না। গেলেন কোথায় তারা? নিশ্চয়ই পুরাতন বইয়ের দোকানে জীর্ণ, ছেঁড়া পাতার পুস্তক হয়ে রাজনৈতিক সাহিত্যের কঙ্কাল রূপ নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন মার্কস, লেনিন ও মাও।

সাম্যকে যারা ভালোবাসেন, তারা গভীর উৎকণ্ঠার ভেতর ছুটে যান সরকারি হাসপাতালে। হতাশ হয়ে বুক চেপে শেষটায় বেওয়ারিশ লাশের মর্গে। না, সাম্য নেই। দৈনিক সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিখোঁজ সংবাদকে খামাখা বিরক্ত করলেন। শেষ আশ্রয় ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ সবই বৃথা। আশায় বুক বেঁধে কেউ কেউ আবার থানা-পুলিশ করে দেশের যত শ্মশান-গোরস্থান আছে তাদের রেজিস্টার খাতায় নাম খুঁজলেন। না, সাম্য নামের কারও হদিস পেলেন না। অথচ সাম্যকে খুঁজে না-পেলে এই পৃথিবী, এই মানবসভ্যতা টিকে থাকবে না।

আমাদের বিশ্বাস সাম্যের অস্তিত্ব কখনো হারানোর নয়। সাম্য তো আর বাজারে-বন্দরে, রাজনৈতিক দলের অফিসে, রাজ-দরবারে, সরকারি দপ্তরখানায়, এনজিওদের দুয়ারে ঘুরে বেড়ায় না। সাম্য রয়েছে গণচেতনায়, শোষণ-শাসনের ক্রোধের আগুনে। তাকে জাগাতে হবে, শাণিত করতে হবে। ডেকে আনতে হবে নগরের পথে, গ্রামের মাঠে, কল-কারখানায়, শিক্ষাঙ্গনে, আন্দোলনে, সংগ্রামে, মিছিলে। উদ্দেশ্য সাম্যসাধনা না হলে রাজপথের মিছিল, সেøাগান কেবল যানজট তৈরি করবে আর শব্দদূষণ তৈরি করে মানুষের সমস্যাই বাড়াবে। সাম্যকে দূরে ঠেলে কল-কারখানায় মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করলে আকাশছোঁয়া হবে দ্রব্যমূল্য, ক্রয়ক্ষমতায় সাম্যনীতি না এলে মুদ্রার সংখ্যা বাড়বে কিন্তু কমবে তার মূল্যমান।

একাত্তরের যুদ্ধটা আমাদের অনেক ... অনেক কিছু দিয়েছে। দিয়েছে স্বাধীনতা। ধনী হওয়ার অবাধ স্বাধীনতা। যেনতেন প্রকারেন। ক্ষমতার স্বাধীনতা দিয়েছে। বাণিজ্যিক আইকন হওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। কী দেয়নি বলুন দেখি বুকে হাত দিয়ে। দিয়েছে কি সাম্য সমাজের স্বাধীনতা? জাতীয় সম্পদ ভোগের সম-অধিকার কি পেয়েছে প্রতিটি বাঙালি? রবীন্দ্রনাথের উক্তিকে ধার করে বলতেই হয়, আমরা যতটা বাঙালি হতে চাই, ততটা কি মানুষ হতে চাই? ‘রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’। কেননা একাত্তরে সাম্যকে যে আমরা দূরে ঠেলে রেখেছি। আপন করে গ্রহণ করিনি। তাই তো ‘মানুষ’ হওয়ার আগেই আমরা ‘বাঙালি’ হয়ে বসে আছি। বাঙালি হতে এক সাগর রক্ত দিতে পারি, অথচ মানুষ হওয়ার জন্য এক ফোঁটা ঘাম খরচা করতে যত্তসব কিপটেমি।

নির্মম সত্য এটাই যে সাম্যকে আমরা হারিয়ে ফেলিনি। সাম্যকে আমরা যদিও আঁকড়ে ধরতে পারিনি কোনো প্রহরেই, সাম্য কিন্তু আমাদের পাশাপাশি হেঁটেছে বাহান্নর ভাষা বিদ্রোহে, ঊনসত্তরের গণবিদ্রোহে, একাত্তরের রক্তাক্ত বিপ্লবে। আমরা তাকে চিনতে পারিনি, বুঝতে চাইনি। রণনীতি, রণকৌশল যতই ভুল হোক, সমাজতন্ত্রের জন্য আমরা লড়াই করেছি একাত্তরের পরেও। ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে পথ ছেড়ে দিয়েছি। সাম্যও আমাদের ছেড়ে গেছে। ধর্মেও যে সাম্য আছে তা আমরা খুঁজিনি, খুঁজেছি সাম্প্রদায়িকতাকে, বর্ণেও সাম্য আছে বুঝতে না পেরে আমরা দেখি কেবল উঁচু-নীচু ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণ। নারীর ভেতর আমরা কেবল কামভোগ, ধর্ষণ আর উত্তরাধিকার তৈরির যন্ত্রের গোলকধাঁধা দেখি, খুঁজি কেবল সেবিকা, দাসী রূপকে। সাম্য থাকবে কেন আমাদের চেতনা-চৈতন্যকে আলো করে?

সেই কবে এগারো-বারো বছর আগে ঢাকা শহর ছেড়েছি। এক-দুদিন করে জীবন কাটালাম যে শহরে, জনশ্রুতি এই, সেই শহর নাকি অনেক বড় হয়েছে আকারে-প্রকারে। উঁচু দালান-কোঠা, চওড়া রাজপথ, আলোর রোশনাই। রাত নামলে ৩০-৪০ তলার বাড়িগুলোর জানালার দানব-দৈত্যের চোখের আলো ঝিলিক দেয়। চিন্তা করলে ভয় হয়। এত উঁচুতে যে মানুষের নিদ্রা নিবাস তার ভেতর কি সাম্য আছে? আছে কি সাম্যের সহোদর শান্তি? হীনতা, নীচুতা, স্বার্থপরতা কি নরকের কীটের মতো কিলবিল করে না? তাই বলি, আসুন আমরা আমাদের ৫২.৬৯.৭১-এ ক্ষণিক ঝিলিক দেওয়া মুখের হারিয়ে যাওয়া সাম্যের স্বপ্নকে খুঁজে আনি। সাম্যহীন স্বাধীনতা যেমনি টেকে না, স্বাধীনতাহীন সাম্যও ঠিক তাই।

লেখক কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত