শিক্ষাগুরুর অমর্যাদা যে সমাজে

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৩৪ পিএম

আমরা যে সমাজে বা রাষ্ট্রে বসবাস করি, সেখানে শিক্ষকের মর্যাদা কেমন তা সম্প্রতি কিছু (অ)বর্ণনীয় ঘটনা থেকে স্পষ্ট। যে শিক্ষকের মর্যাদা আজ ভূলুণ্ঠিত, আর যে ছাত্ররা এমনটা করেছে, তারা কেউই এই সমাজের বাইরে না। আসলে ব্যক্তির আচরণ অনেকটাই রাষ্ট্রের আচরণের ওপর নির্ভর করে। তাই, শিক্ষকের প্রতি অসম্মানের বিষয়ে আলোকপাত করতে গেলে, স্বাধীনতা-উত্তরকালে শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ পর্যবেক্ষণ করার বিকল্প নেই। এরশাদের মিলিটারি শাসনামলে, শিক্ষক অমর্যাদার বিষয়টা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এরশাদের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে যে বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিবাদ হয়, তার সিংহভাগ হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্যোগে আর প্ররোচনায়। তাই এরশাদ সরকার শিক্ষকদের জেল, জরিমানা, চাকরিচ্যুত করা থেকে শুরু করে, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বসার ব্যবস্থা করেন ১৬তম সারিতে। কী সাংঘাতিক জিঘাংসা রাষ্ট্র কর্র্তৃপক্ষের! যে শিক্ষকের কাছে পড়ে, তারই ছাত্র-ছাত্রীরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-এমপি, সচিব হয়, সেই শিক্ষকের অবস্থান হলো, এদের সবার পরে। এরই ধারাবাহিকতায়, মুক্ত জ্ঞানের চর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের শিক্ষা অথবা অধিকার ও বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে, অনেক শিক্ষককে হতে হয়েছে কারাবন্দি, চাকরিচ্যুত অথবা পেশাগতভাবে অন্য কোনো নিগ্রহের শিকার।

শিক্ষা এ দেশের জাতীয় নীতিতে কখনোই প্রাধান্য পায়নি। তার প্রমাণ হিসেবে শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় বাজেট-বরাদ্দ দেখলেই বোঝা যায়। ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে শিক্ষকের সম্মানের কথা বলা হলেও, রাষ্ট্রীয় আইনি পরিকাঠামোতে শিক্ষকের উচ্চতর মর্যাদা স্বীকৃতি পায়নি। তাই তো, প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের দিয়ে করানো হতো আদমশুমারি, ভোটার লিস্ট, টিকার প্রচার, স্যানিটারি টয়লেটের গণনা আরও কত কি! যে প্রাইমারির শিক্ষকরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান আর নৈতিকতা শেখান, তাদের সারা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে, বিভিন্ন সরকারি বিষয়ের মাঠ জরিপ করানোর মতো নির্মমতা রাষ্ট্র দেখিয়েছে বহুবার। স্কুল-কলেজের বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন-বোনাসের দাবিতে রাজপথে নামতে হয়, রোদে-বৃষ্টিতে পুড়ে আন্দোলন করে ন্যূনতম দাবিগুলো আদায় করতে হয়। এমনকি জাতীয় উৎসবগুলোর আগেও বেতন-ভাতা নিয়ে এদের অনিশ্চয়তায় থাকতে হয়। সরকারি আমলাদের যে হাজারো সুযোগ-সুবিধা, তার কিয়দংশও তাদের কপালে জোটে না। রাষ্ট্রের দ্বারা এ সমাজের শিক্ষার বা শিক্ষকের পৃষ্ঠপোষকতা কখনোই করা হয়নি।

এমন পরিপ্রেক্ষিতেই মেধাবীরা আজ আর কেউ শিক্ষক হতে চান না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল’ গ্র্যাজুয়েট বা অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায় সবাই এ দেশে আজ আমলা হতে চান। আমলা তোষণের এই দেশে, তাই জনপ্রশাসন ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ রাখা হয়। সরকারি আমলা হলে এ দেশে জুটে যায় অর্থ, সম্মান, ক্ষমতা, বিদেশ ভ্রমণ, আরও কত কি!

ধুঁকে ধুঁকে চলা এহেন শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের সামান্য সম্মানটুকু ছাড়া আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেই অপ্রাতিষ্ঠানিক সম্মানের জায়গাও আজ ছিন্নবিচ্ছিন্ন। শিক্ষককে অসম্মান করা যেন আজ কোনো দুর্ঘটনা নয়। শিক্ষককে আটক করা, হত্যা করা, লাঞ্ছিত করা, এমন ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এই জাতি। কিছু ঘটনা মিডিয়ার কল্যাণে গুরুত্ব পেলেও, অনেক ঘটনা থেকে যায় খবরের আড়ালে। শিক্ষক লাঞ্ছনার এই সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ হয়েছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট। চুন থেকে পান খসলেই যেন, ছিঁড়ে ফেলা হবে শিক্ষককে, আর তার সঙ্গে ঘটবে অপরাধীর দায়মুক্তি। এর পাশাপাশি, স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটির নেতাদের সঙ্গে শিক্ষকদের এক দূরত্ব দেখা যায়। ম্যানেজিং কমিটির অনেক অযাচিত স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রাক্কালে, যখন কোনো আদর্শ, বিবেকবান শিক্ষক রুখে দাঁড়ান, তখন সেই শিক্ষককে শায়েস্তা করতে লেলিয়ে দেওয়া হয় তারই কোনো শিক্ষক সহকর্মী বা শিক্ষার্থীদের। বহিরাগতদের আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয় তখন শিক্ষক-রাজনীতি। কিছু শিক্ষক তাদের আর্থিক বা পেশাগত অবস্থান নিশ্চিত করতে, অন্য শিক্ষকদের সম্মান বা অবস্থান বলি দিতে দ্বিধা করেন না।

সাধারণ শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের, ম্যানেজিং কমিটির এবং ক্ষমতাবান শিক্ষক সহকর্মীদের আচরণ দেখে, ছাত্রছাত্রীরা অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের যথাযোগ্য সম্মান জানাতে ব্যর্থ হয়। সম্মান প্রদর্শন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটা আসলে কালচারের অংশ। অবৈধ অর্থ, অশিক্ষা, আর লাগামহীন রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে, নিরীহ শিক্ষকদের প্রতি অবিচার যেন প্রথাসিদ্ধ রূপ পেয়ে গেছে এ সমাজে। পুঁজিবাদী সমাজে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও আজ যাবতীয়ভাবে তাদের উপার্জনের দিকে লক্ষ রেখেছেন। সন্তান ও পরিবার তাদের কাছে গৌণ। তাই আজকের সন্তানরা পারিবারিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। প্রযুক্তি-আসক্ত এই প্রজন্ম না পাচ্ছে পারিবারিক মনোযোগ, না পাচ্ছে আদর্শিক গুণগত শিক্ষা। এ যেন এক দিশেহারা অবস্থা!

‘শিক্ষকদের সম্মান দাও, দেওয়া উচিত’ এমন বায়বীয় উপদেশ আজ আর যথেষ্ট নয়। বাদশাহ আলমগীরের শিক্ষকের প্রতি মর্যাদার গল্পও এখন খুব বেশি কার্যকর হবে না। দরকার প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবস্থার উন্নয়ন। প্রথম দরকার আদর্শিক ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা, যেন শিক্ষকদের যোগ্যতার মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকে, যেখানে শিক্ষকরা নিজেরাই প্রথমে নিজেদের সম্মান করতে জানবেন। এরপরে দরকার রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয়, শিক্ষকদের সর্বোচ্চ অবস্থান এবং মর্যাদাকর পারিতোষিক নিশ্চিত করা। এরপরে দরকার শিক্ষকদের নিরাপত্তার জন্য কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। আরও দরকার শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। এর পাশাপাশি দরকার ম্যানেজিং বা গভর্নিং কমিটির নামে রাজনৈতিক বা আর্থিক ক্ষমতাবানদের শিক্ষকদের ওপর ছড়ি ঘোরানো বন্ধ করা। রাষ্ট্র যখন নিজেই শিক্ষকদের নিয়োগ দিচ্ছে এবং যাবতীয় বিষয় দেখভালের দায়িত্বে আছে, তখন অপ্রয়োজনীয় গভর্নিং বডির কালচার বিলোপ করা দরকার। আর্থিক এবং পেশাগতভাবে শিক্ষকদের যথাযোগ্য মর্যাদা না দিতে পারলে, কোনো দিনও তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তবে, সর্বোপরি দরকার পারিবারিক শিক্ষা।

লেখক : শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত