দিলীপ কুমারের জীবন বদলে যাওয়া মুহূর্ত

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:০২ পিএম

১১ ডিসেম্বর ১৯২২ তখনকার ব্রিটিশ ভারতের, এখনকার পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার শহরের কিসসাখানি বাজারের একটি ফল ব্যবসায়ী পরিবারে মোহাম্মদ ইউসুফ খান জন্মগ্রহণ করেন। বাবা লালা গুলাম সারওয়ার খান এবং মা আয়েশা বেগম। এক দিন বাবার চোখে পড়ল রাস্তার দেয়ালে সিনেমার পোস্টার। তাতে সিনেমার নায়কের যে ছবি তা ইউসুফ খানের বলেই তিনি মনে করলেন, কিন্তু নাম ভিন্ন, দিলীপ কুমার। তিনি নিশ্চিত হতে চান। বাড়ি ফিরে ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন।

পোস্টারে লেখা আছে দিলীপ কুমার অভিনীত জোয়ার ভাটা। সেদিন তার বাবার সঙ্গে ছিলেন দেওয়ান বাশেশ^রনাথ কাপুর (ইউসুফের বন্ধু, একই এলাকার রাজ কাপুরের দাদা), তিনিও সন্দেহ করলেন এই ছেলে ইউসুফ না হয়ে যায় না। দুজন একসঙ্গে টোঙ্গাতে ফিরছিলেন। সন্দেহ কাপুরেরও।

লালা গুলাম সারওয়ার খান বললেন, ‘সিনেমার পোস্টারে দিলীপ কুমার নামের একটি ছেলেকে দেখলাম। কসম খোদার সে দেখতে তোর মতো। পোস্টারের ছেলেটি কি তুই?’

ছেলে নিশ্চুপ, ক্ষুব্ধ লালাজি বললেন, ‘জবাব দে, পোস্টারের ছেলেটি তুই, না অন্য কেউ?’

কোমল ও আতঙ্কিত কণ্ঠের জবাব, ‘হ্যাঁ আমি’।

তারপর প্রবল একটা চড় পড়ল তার গালে, মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন। মেঝেতে পড়ে রইলেন, পাঁচ আঙুল বসে গেছে।

পরের আদেশ, ‘এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।’

এ বছরই প্রকাশিত ফয়সাল ফারুকীর ‘দিলীপ কুমার : ইন দ্য শ্যাডো অব অ্যা লেজেন্ড’ গ্রন্থে দিলীপ কুমারের বলা এ কাহিনী প্রকাশিত হয়েছে।

যদি মা আয়েশা খাতুন ও বড় বোন সকিনা না থাকতেন তাকে বাড়িছাড়া হতে হতো।

‘আমি সিনেমায় থাকার কথা কখনো ভাবিনি, আমার প্রিয় কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রীও ছিলেন না। আমি দেখেছি আমাদের খাবার জোগাড় করতে আমার আব্বা-আম্মা উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেন। কিছু কামাই করে তাদের ভার কিছুটা লাঘব করার চেষ্টাই আমার ছিল।

দিলীপ কুমার কাহিনীর বাকি অংশ তার আত্মজীবনী ‘দ্য সাবস্ট্যান্স অ্যান্ড দ্য স্যাডো : অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’র ‘দ্য টার্নিং পয়েন্ট’ অধ্যায় থেকে কিছুটা সংক্ষেপে উপস্থাপন করছি :

আমি এক দিন সকালে চার্চগেইট স্টেশনে অপেক্ষা করছি, সেখান থেকে লোকাল ট্রেনে সেন্ট্রাল বোম্বের দাদর যাব। সেখানে একজনের সঙ্গে দেখা করব, তিনি একটা ব্যবসা দিতে পারেন। ব্যাপারটা ক্যান্টনমেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য কাঠের খাট সরবরাহ-সংক্রান্ত। সেখানে ডক্টর মাসানিকে দেখতে পেলাম। তিনি একজন মনোবিজ্ঞানী, একবার উইলসন কলেজে এসেছিলেন তখন আমি সেখানকার ছাত্র। উইডলসনে আমি এক বছর পড়াশোনা করেছি। চার্চগেইট স্টেশনে আমি এগিয়ে তার কাছে যাই এবং নিজের পরিচয় দিই। যেহেতু তিনি আমার আব্বার পরিচিত আমাকে চিনবেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইউসুফ এখানে কী করছো?’

আমি বললাম চাকরির খোঁজ করছি কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। তাই ব্যবসায়ের চেষ্টা করছিলাম। তিনি বললেন, তিনি বোম্বের পশ্চিম উপশহরের দিকে মালাদ-এ যাচ্ছেন সেখানে সিনেমা স্টুডিও বোম্বে টকিজ-এর মালিকের সঙ্গে দেখা করবেন। তিনি বললেন, তুমি যদি আমার সঙ্গে যেতে চাও চলো, তাদের সঙ্গে দেখা হবে। তোমার জন্য তাদের কাছেও কোনো চাকরি থাকতে পারে। খুব সাদামাটাভাবে তিনি কথাগুলো বললেন। আমি এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দাদর যাওয়ার ব্যাপারটা বাদ দিলাম এবং তার সঙ্গে যোগ দিলাম। রেলওয়েতে আমার একটা ফার্স্ট ক্লাস সিজন টিকিট ছিল, কিন্তু সেটা বান্দ্রা পর্যন্ত, মালাদ বান্দ্রা পেরিয়ে আরও ১৮ মাইল দূরে। ডক্টর মাসানি টিকিট চেকারকে চিনতেন। সুতরাং বর্ধিত অংশের একটা টিকিট পেয়ে গেলাম। যদিও স্টেশন থেকে বোম্বে টকিজ খুব কাছে তবুও তিনি ট্যাক্সি নিলেন, কারণ লাঞ্চটাইম প্রায় হয়ে গেছে, তিনি চিন্তিত বোম্বে টকিজ-এর বস মিসেস দেবিকা রানী দুপুরের খাবার খেতে আবার না বাসায় চলে যান।

***

এর আগে আমি জীবনেও কখনো সিনেমার স্টুডিও দেখিনি, এমনকি স্টুডিওর ছবিও না। আমি রাজ কাপুরের কাছে বোম্বে টকিজের কথা শুনেছি। তার পিতা পৃথ্বীরাজ কাপুর অভিনীত সিনেমার শ্যুটিং হতো এখানে। বহু একর জমিনের ওপর ছড়িয়ে আছে বোম্বে টকিজ স্টুডিও, একটা বাগান, বাগানে একটা ঝরনা। এর অফিস ভবন দেখতে সনাতন অফিসের মতো নয়, বাংলোর মতন।

ডক্টর মাসানি যখন প্রবেশ করলেন দেবিকা রানী তাকে উষ্ণ সম্ভাষণ জানালেন এবং তাকে বসতে বললেন। পরিচিত হওয়ার জন্য আমি যখন দাঁড়িয়ে আছি তিনি বিস্মিত চোখে আমার দিকে তাকালেন। তিনি রুচিশীলতার প্রতিমূর্তি, ডক্টর মাসানি যখন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন নমস্তে বলে আমাকে স্বাগত জানিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসতে বললেন। কিন্তু তার দৃষ্টি আমার ওপর নিবদ্ধ যেন আমাকে নিয়ে তিনি কিছু একটা ভাবছেন। তিনি আমাদের অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, পরে জেনেছি তিনি বিখ্যাত পরিচালক; তিনি সোফায় বসেছিলেন। দেবিকা রানী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি উর্দুতে ভালো কি না। আমি ‘হ্যাঁ’ বললাম। ডক্টর মাসানি আমার পেছনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করলেন; বললেন আমরা পেশোয়ার থেকেই উঠে এসেছি। আমার বাবার কথা, তার ব্যবসায়ের কথা বললেন। তিনি আগ্রহ নিয়ে শুনলেন, আমি তার মুখের দিকে তাকাই, স্বাভাবিক দ্যুতিময়তা ও সুস্বাস্থ্যের প্রমাণ তাতে। তিনি কেবল আমার উর্দু জ্ঞানের কথা শুনলেনএতে কোন ধরনের চাকরি তিনি আমাকে দিতে পারেন আমি তাই ভাবছিলাম।

তিনি আমার দিকে ফিরে মিষ্টি হেসে আমাকে যে প্রশ্নটা করলেন তা আমার জীবনের ধারা সম্পূর্ণভাবে এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বদলে দিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমি অভিনয় করতে চাই কি না? মাসে সাড়ে বারোশো টাকা বেতনে তা করতে রাজি কি না? আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। ডক্টর মাসানির দিকে যখন তাকালাম তাকেও বিস্মিত মনে হলো। তিনি কাঁধ নাড়লেন, আমি বুঝতে পারলাম আমাকে হ্যাঁ বলানোর এটা একটা সংকেত। আমি বেহুদা চিন্তা করে সময় নষ্ট করার মানুষ নই। সুতরাং আমি হাসিমুখে তার হাসির জবাব দিতে গিয়ে বললাম, এটা তার বিশেষ দয়া যে অভিনয় করার একটা চাকরি তিনি আমাকে দিচ্ছেন। কিন্তু আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই, ফিল্ম সম্পর্কে ধারণাও নেই। তা ছাড়া আমি জীবনে একটি মাত্র সিনেমা দেখেছি, সেটাও একটা যুদ্ধের ডকুমেন্টারি। দেওলালির সৈনিকদের জন্য ছবিটি নির্মিত।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের পারিবারিক ফল ব্যবসায়ী তুমি কতটা অভিজ্ঞ? আমি বললাম, আমি শিখছি, বেশি অভিজ্ঞতার দাবি করতে পারব না।

তিনি বললেন, এই তো ফলের ব্যবসায় এসে তুমি ফল, ফলচাষএসব সম্পর্কে যেমন শিখছো সিনেমা তৈরির শৈলী, অভিনয় এসব একইভাবে শিখে নিতে পারবে। আমার একজন তরুণ, সুদর্শন এবং শিক্ষিত অভিনেতা দরকার। আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার মধ্যে ভালো অভিনেতা হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে।

লাঞ্চের সময় এসে গেল, আমরা তার সঙ্গে লাঞ্চে যোগ দেব কি না আন্তরিকভাবেই জিজ্ঞেস করলেন। ডক্টর মাসানি বিনীতভাবে জানালেন লাঞ্চ করবেন না, বিদায় দিয়ে চলে এলেন, আমি তাকে অনুসরণ করলাম। ফেরার পথে ডক্টর মাসানি তেমন কথা বললেন না। দ্রুতগতিতে ছোটা রেলের শব্দ এবং চাকরির অফারের বিস্ময় আমাদের দুজনকে নির্বাক করে দিয়েছে। আমি যে সিনেমা ও অভিনয় নিয়ে কিছুই জানি না এটা আমাকে আর বিচলিত করেনি। ট্রেনের দুলুনিতে আমার মধ্যে যখন আয়েশি ভাব এসে গেল আমি ভালো বোধ করলাম এবং এত বেতনের জন্য কৃতজ্ঞ বোধ করতে থাকলাম। এখন আমার লিখিত সম্পত্তির অপেক্ষা।

* * *

বাড়ি ফিরে ভাইদের মধ্যে তার বড় জন আইয়ুব সাহাবকে তার চাকরির সাড়ে বারোশো টাকা বেতনের অফারটার কথা বললেন (পারিবারিক সংস্কৃতিতে বড় ভাইকে শুধু নাম ধরে ডাকা যাবে না, নামের সঙ্গে সাহাব যোগ করতে হবে, কিন্তু ইউসুফ আইয়ুবকে নাম ধরে ডেকে বকা ও মারও খেয়েছেন।) আইয়ুব বললেন, চাকরি ঠিকই আছে তবে বেতন বছরে সাড়ে বারোশো টাকা। তিনি আরও বললেন, রাজ কাপুর বোম্বে টকিজ থেকে মাসে ১৭০ টাকা পান, এটা তার জানা আছে। আমার মনে হলো আইয়ুব ঠিকই বলেছেন। আমাকে প্রতি মাসে এত টাকা তিনি কেমন করে দেবেন? আমি বুঝলাম আসলেই বছরে সাড়ে বারোশো। আমি ভাবলাম এ চাকরি গ্রহণ করার মানে নেই, তাতে আমার আব্বার ভার তেমন কমবে না।

আইয়ুব ছাড়া বাড়ির কেউ আর আমার এই চাকরি পাওয়ার কথা জানেন না। আমার সবচেয়ে বড় ভাই নূর সাহাব এসব নিয়ে কখনো ভাবেন না, তিনি তার নিজস্ব ভুবনে বাস করেন। তাকে কেবল খাবার সময় বাড়িতে দেখা যায়। আমি ভাবলাম আমার সিদ্ধান্তটি আগে ডক্টর মাসানিকে জানানো সমীচীন হবে। আমি চার্চগেইটে তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম, বললাম, ইলেকট্রিক ট্রেনে প্রতিদিন মালাদ আসা-যাওয়া করে যে খরচ হবে তাতে বছরে সাড়ে বারোশো টাকায় আসলে পোষাবে না।

কিন্তু তিনি নিশ্চিত বছরে নয় মাসে ১২৫০ টাকা। তিনি আমার সামনে নিজে থেকেই দেবিকা রানীকে ফোন করে বেতনটা নিশ্চিত হলেন, তিনি যেভাবে ফোন ধরে থাকলেন তাতে আমার মনে হলো তিনি অপর প্রান্ত থেকে সুখকর কিছু শুনছেন। রিসিভার রেখে তিনি বললেন, বার্ষিক নয় মাসিক ১২৫০; দেবিকা মনে করেন আমি প্রতিশ্রুতিশীল, কাজেই আমি সানন্দে গ্রহণ করতে পারি এমন অফারই তিনি দিয়েছেন। পরদিন দুপুরের খাবারের পর চার্চগেইট স্টেশনে ডক্টর মাসানির সঙ্গে দেখা করি। বছরটা ১৯৪২, দিনটা শুক্রবার, তারিখটা মনে নেই। নামাজের পর, ভালো ভোজনের পর আমি নীরবে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। কেউ জানে না আমি কোথায় যাচ্ছি।

ইউসুফ খান এসে হাজির হলেন বোম্বে টকিজ-এ; দেবিকা রানী বুঝতে পারলেন ইউসুফ চাকরির অফারটা যে গ্রহণ করেছেন তা নিশ্চিত করতে এসেছেন। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আয়েশা বেগমকে বললেন, ‘আম্মা আমি মাসে ১২৫০ টাকা বেতনের একটা চাকরি পেয়েছি, তাতে আপনার রান্নাঘরের খুচরো খরচ, আর আমার ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচটা মেটানো যাবে।’

কিন্তু এত টাকার চাকরি, কাজটা কী? সন্দিগ্ধ আয়েশা খাতুন জিজ্ঞেস করলেন।

তিনি বললেন, সম্মানজনক কাজ, উর্দুতে ভালো বলেই কাজটা পেয়েছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এই উন্মাতাল সময়ে উর্দুর ভালো জ্ঞান হয়তো গুরুত্বপূর্ণইমা তাই ভাবলেন। মা বোঝেননি এটা ইউসুফ খানের দিলীপ কুমার হওয়ার চাকরি।

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত