শব্দের মারপ্যাঁচ

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:৩৮ পিএম

মোটা বুদ্ধির মানুষদের মাথায় ম্যাক্রো-মাইক্রোর মারপ্যাঁচ সহজে ঢোকার কথা না। বিড়ালকে কোনো কোনো এলাকায় মেকুর বলার চল এখনো আছে। বিড়াল বাঘের মাইক্রো সংস্করণ সে কারণে কিনা আলেফ মিয়া মাঝে মাঝে ভাবে। শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় নিয়ে মাথা ঘামান এমন অধ্যাপকের সঙ্গে মোটামুটি ঘণ্টা তিনেকের মতো সময় কাটালেই আলেফ মিয়া মনে করে তাবৎ শব্দরা তাদের জাতকুল মানসম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য হয়তো তার বিরুদ্ধেই রিট মামলা জুড়ে দিতে তেড়ে আসতে চাইবে। গবেষণা শব্দটি তো সেদিন খুব মাইন্ড করে বসল যখন সে শুনল গবেষণার সন্ধিবিচ্ছেদ হলো গো+এষণা। গো মানে গরু, এষণা মানে খোঁজা। এভাবেই গবেষণা শব্দটি ধরাধামে এসেছে অর্থাৎ ভদ্র ভাষায় বলতে গেলে গরু খোঁজার কাজই হলো গবেষণা, এত সব সম্মানীয় গবেষক যাদের সবাই সম্মান ও সমীহ করে, তাহলে তাদের মানসম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? সারণী সারসংক্ষেপ হাইপোথিসিস হাইথট পর্যালোচনা পর্যবেক্ষণ নিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ল্যাবে যাদের দিন কাটে তাদের কিনা গুরুর গরু খোঁজার কাজে হতভম্ব গরুর রাখালের পর্যায়ে নীচে নামানো? গবেষণার ইংরেজি প্রতিশব্দ রিসার্চ, এখানে রি বা বারবার সার্চ বা খোঁজাখুঁজি করার মধ্যে মানসম্মান মোটামুটি চলার মতো থাকে বলে মনে হয়।  

ইদানীং রাজনৈতিক সিলসিলার কিছু শব্দ যেমন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্প্রদায়িকতা, চিন্তা-চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সন্ত্রাসী, সদাচার, সুশাসন ইত্যাদির ঘাটে-অঘাটে ব্যবহার অপ-ব্যবহার নিয়ে বড্ড বিব্রত আলেফ মিয়া। রাত নেই দিন নেই তারা আলেফ মিয়ার মাথায় এসে ঘ্যান ঘ্যান করা শুরু করে। তার এমনিতে সাইনাসের ব্যামো আছে, সে এসব শব্দের ওজর আপত্তি শুনতে না চাইলেও তাকে সেগুলো ভাবিয়ে তুলছে। তার ভয় এরা না জানি কবে আইএমএফের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। কেননা ইদানীং পরস্পরের দোষারোপের দ্বারা বর্তমানের অপকর্মের বৈতরণী পার পায়োর উপায় যখন খোঁজা হচ্ছে, তখন ‘অপ’ উপসর্গ যোগ করে অনেক বংশীয় ও বলশালী শব্দেরই অপ-ব্যবহারের পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। যেমন অপ-শক্তি, অপ-ব্যবহার, অপ-তৎপরতা ইত্যাদি। অপর পক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তাদের যেসব কাজকে দোষারোপ করা হচ্ছে, অন্যদিকে নিজেরা একই কাজ করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী পক্ষ হয়ে যাচ্ছে ‘অপ-শক্তি’। নিজেরাই যে অপ-শক্তির প্রতিভূ সেটি অপর পক্ষ বলবার ক্ষমতা না পাওয়া পর্যন্ত এভাবে আক্রমণাত্মক ভাষায় এভাবেই বলা হবে। যেন অন্যরা অপ-শক্তি আর নিজেরা সাধু। চোরের মার বড় গলা বলে একটা কথা আছে না? বোকাসোকা আলেফ মিয়ারা দেখতে পাচ্ছে অপ-শক্তিরাই পরস্পরকে অপ-শক্তি বলছে, আর সবাই শিলনোড়ার মতো পিষ্ট হয়েই চলছে। নানান শ্রেণীকরণে তারা বিভক্ত হয়েই যাচ্ছে। ডানরা বামপন্থিকে, বামরা ডানপন্থিকে যুগপৎভাবে আক্রমণ-আমন্ত্রণ করেই চলছে। নিরপেক্ষতার নিস্তার নেই। গেল শতকের নব্বইয়ের দশকের আগে পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্র পরস্পরকে এক হাত নেওয়ার আগে যা যা করত। গর্বাচেভ সাহেবের পেরেস্ত্রোইকা তরিকার অপ-মৃত্যুতে পুঁজিবাদীদের এখন পোয়াবারো। এখন সব কিছুতে একক বাড়াবাড়িতে সর্বসাধারণের প্রাণ ওষ্ঠাগত হলেও অন্যকে অপ-শক্তি বলে গাল দিয়ে নিজেদের মধ্যে গজিয়ে ওঠা বড় বড় অপকর্মকারীকে দুধ-কলা দিয়ে পোষার মহড়া চলছে। কৃষি ব্যাংকের ১২ হাজার টাকার ঋণখেলাপিকে কোমরে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয় অথচ হাজার কোটি টাকা লোপাটকারীর বিচার ও তদন্তের ফাইল নড়েও না চড়েও না। বড় বড় আদালতে মৌলিক অধিকারের দাবিতে বড় বড় লোকেরা রাষ্ট্রীয় কর, দায়-দেনা পরিশোধে স্থিতি অবস্থা চান এবং পানও, প্রভাবশালীদের বড়  বড় দুর্নীতি এমনকি খুন-খারাবির বিচার বিলম্ব করানো, মোড় ঘোরানোর আনুকূল্য লাভে বেগ পেতে হয় না। সুখের বিষয় দেশের উত্তারাঞ্চলের একজন স্থানীয় নেতা খুন হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে পুলিশের চার্জশিট এমনকি নিম্ন আদালতে অভিযুক্তদের ফাঁসির আদেশও হয়েছে সর্বনিম্ন সময়ে। এই তৎপরতা ও নিষ্পত্তি নিঃসন্দেহে বিচারব্যবস্থায় প্রশংসনীয় আগ্রগতি, কিন্তু ১০ বছরের বেশি সময় আগে সাগর-রুনী হত্যার মামলার চার্জশিট দিতে বিলম্বের রাত কবে শেষ হবে? দেশে লাখো-কোটি বেকারের কর্মসংস্থান না করে, দুর্নীতি করে বা বড় ঋণ নিয়ে দেশে বিনিয়োগ না করে, বিদেশে ধনীর ক্লাবে নাম লেখানোটা যেন ইদানীং দোষের কিছু না। বরং বাহাদুরি। 

আলেফ মিয়ার এক প্রশিক্ষক গুরু সুদূর জার্মানি থেকে তার কাছে একবার জানতে চেয়েছিলেন‘মাঠে মারা যাওয়া’ কথাটির বুৎপত্তি কী? বেশ বিব্রতকর প্রশ্ন। মানুষ মাঠে মারা যাবে কেন এবং দৈবাৎ দু-একজন ঘটনাচক্রে মারা গেলেই বা কী? তাকে বাক্যবিন্যাস বিধিমালার আওতায় এনে, অনেকটা ৫৪ ধারার মতো, ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার প্রয়াস কেন? অনেক পরে নওগাঁর জেলা প্রশাসকের কাছে জানা গেল এই শব্দ তিনটির পয়লা ব্যবহারকারী হলেন নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পতিসরে রবিবাবু কৃষিকাজে বেশ কিছু টাকাকড়ি বিনিয়োগ করেছিলেন, ছেলে রথীনকে মার্কিন মুলুক থেকে সেচবিদ্যা ও রাশিয়া থেকে কৃষিপাঠ দিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, কৃষকদের কৃষিঋণ বা পুঁজির জোগান দিতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তখনো জন্মগ্রহণ করেননি, এমনকি কৃষি ব্যাংকের খোদ চেয়ারম্যান মহোদয়ের পিতাও মনে হয় তখন... যাই হোক রবীন্দ্রনাথ মাঠে কৃষকের কাজে টাকা-পয়সা বিনিয়োগের যে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তাতে ‘পরি’ এবং ‘কল্পনা’ দুটোরই মনে হয় পুষ্টিহীনতা ছিল, যদিও তিনি নিজে কবি ছিলেন, ছিলেন কল্পনার রাজাধিরাজ। কবির মাঠের কৃষিকাজে বিনিয়োগ ব্যবসা সফল হয়নি। কাকে যেন লিখলেন ‘সমুদয় অর্থ মাঠে মারা গেল হে’। সেই থেকে ব্যর্থ প্রয়াসের প্রতিভূ শব্দাবলি হিসেবে মাঠে মারা যাওয়ার প্রচলন।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শব্দের সম্মান-অসম্মান সমানতালে বাড়া-কমার মধ্যে আছে। রোডও নেই ম্যাপও নেই, আছে কিছু হাবিজাবি তালিকা আর কর্মপরিকল্পনা, তার নাম রোডম্যাপ। কাগজে রাষ্ট্র আছে, দখলে নেইএমন দেশের মতো, নরসিংদীর নদীর পাড়ের ৩ ভাইয়ের জমি বিক্রির সময় দেখা গেল যেমন ‘জোতে জমি নেই’, তিন ভাই যে যখন পেরেছে একই দাগ থেকে আলাদা আলাদা করে জমি বিক্রি করেছে। এখন আর বিক্রির হিসাব মিলছে না। যেন সব বিক্রি শেষ!

ম্যাক্রো মাইক্রো শব্দদ্বয় দেখতে দুই ভাইয়ের মতো হলেও এদের বাড়ি কিন্তু এদেশে না এবং এদের নাড়িনক্ষত্র ঘাঁটলে ভালো কিছু বের হবে বলে মনে হয় না। এখনো পর্যন্ত এই দুই বিদেশির উপযুক্ত প্রতিস্থাপনীয় বাংলায় পয়দা হয়েছে বলে শুনিনি। ম্যাক্রোর দৃষ্টি প্রসারিত, প্রলম্বিত ও প্রবহমান। সে তার বাহুতে, কাঁধে, মাথায় অনেক কিছু নিতে পারে। একসঙ্গে পাঁচ ইঁদুর যেমন ধরা যায় না ম্যাক্রোর কাছে তেমনি পরিশীলিত পরিমার্জিত পারিজাত কোনো কিছু চটজলদি আশা করা যায় না। তার সব ফলাফলই সময়সাপেক্ষ এবং অনেকগুলো ফ্যাক্টর যাচাইযোগ্য। সামষ্টিক বলে ম্যাক্রোর একটা প্রতিশব্দ অনেক বলে-কয়ে জোগাড় করা গেছে তাও এপার বাংলায়, ওপার বাংলায় এখনো এককভাবে শব্দটির অন্নপ্রাশন হয়নি বলে মনে হয়। ‘ম্যাক্রো ইকোনমিক্স’-কে সেখানকার সাহিত্য সংসদ তাদের ঢাউস ডিকশনারিতে ‘বৃহত্তর একক বিদ্যা সংক্রান্ত অর্থবিদ্যা বা ধনবিজ্ঞান’ বলে কোনো রকমে পার পেয়েছে। পক্ষান্তরে মাইক্রো ক্ষুদ্র বা অণু পর্যায়ের বলে তাকে একা একা রাস্তায় ছেড়ে দিতে কেউ রাজি না। মাইক্রোসকোপ, মাইক্রোফিল্ম, মাইক্রোবায়োলজি, মাইক্রোফোন এসব ডাকসাইটে শব্দমালার সঙ্গে মাইক্রোকে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সামষ্টিকের বিপরীতে ব্যষ্টিককে মানাবে ভালোএই বিবেচনায় এপার বাংলায় মাইক্রোকে ব্যষ্টিক বলার চল শুরু হলো বলে, ওপার বাংলায় মাইক্রোকে অণু বা ক্ষুদ্র এরকম একটা তকমা (প্রত্যয়) দিয়ে অন্যের পরিচয় দেওয়ার জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছেযেমন মাইক্রোবায়োলজি জীবাণু বিজ্ঞান, মাইক্রোসকোপ অণুবীক্ষণ। আগেই বলেছি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে মাইক্রোর কাজ কারবার। যা কিছু করবার তা ধীরস্থিরভাবে গভীর অভিনিবেশ সহকারে করা তার ধর্ম। মনে হয় মাইক্রোর দিকে বিধাতার ঝোঁক বেশি। সেজন্য মাইক্রোর শব্দভা-ার বেশি। ক্ষুদ্র অতি ক্ষুদ্রকে নিয়ে যেহেতু মাইক্রোর কারবার সেহেতু সে বেশ খানিকটা অন্তর্যামী, অন্তর্গামীও বটে। অনেকের সঙ্গে তাই তার আত্মীয়তা ও জানাশোনা বেশি। মাইক্রোওভেনে চটজলদি অনেক কিছু গরম করা যায়, মাইক্রোওয়েভে শব্দতরঙ্গ নিয়ে ভেল্কিবাজি চলে, মাইক্রোচিপস মুঠোফোনে কমপিউটারে বিপ্লব ঘটিয়ে চলছে। গোটা দুনিয়াটা মাইক্রোচিপসের মধ্যে মোড়ানোর মওকা চলছে। মাইক্রোর জয়জয়কার সবখানে।

আলেফ মিয়ার, কেন জানি তার নিজেরও মাইক্রোর প্রতি প্রেম-মহব্বত বেশি। হতে পারে তার দেশ বাংলাদেশ মাইক্রোক্রেডিটের দেশ বলে। সবাই জানে নোবেল বিজয় লাভ এই মাইক্রোর জন্যই ঘটেছে। বলা যায় আজকের বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বিশ্ব চিনেছে এই মাইক্রোর কারণে। মানুষ কেন সব কিছুই তো ছোট থেকে বড় হয়। ম্যাক্রোলেভেলে কথা বলে কূলকিনারা মেলে না সহজে, আব্বাসউদ্দিনের গানের মতো আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাব....। ঢাউস বাসে চেপে হট্টগোলে নয়,  মাইক্রোবাসে চড়ে প্রেমের মধুপুরে যাওয়ার চেষ্টাই যেন শ্রেয়।

লেখক: সরকারের সাবেক সচিব

এন বি আরের সাবেক চেয়ারম্যান 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত