পর্যটন নগরীতে প্রশান্তিময় ভ্রমণে আজব যান ‘চান্দের গাড়ি’

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০১ এএম

‘চলে আমার চান্দের গাড়ি/যাইবো সোনা বন্ধুর বাড়ি/বন্ধু আমার রসের হাঁড়ি/ভাবের তরী বন্দনা/এমন বসন্তে বন্ধু আইলো না।’ উপরোক্ত কলিগুলো গীতিকার ও সুরকার তরুণ শিল্পী তুহিন কান্তি দাসের রচিত একটি জনপ্রিয় গান। গানটির শিরোনাম ‘চান্দের গাড়ি’। প্রায় দুই দশকের অধিককাল ধরে চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার জেলা পর্যটন নগরী নামে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সে সময়কাল থেকে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের কাছে অন্যতম ভালোলাগা ও ভালোবাসার স্থান হলো জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা। আর শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের আকাঁ-বাকা পাহাড়ি পথে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় যান হলো অনিন্দ সুন্দর চান্দের গাড়ি। শ্রীমঙ্গলে প্রায় তিন শতাধিক চান্দের গাড়ির অধিকাংশই লাল রঙের। তবে কিছু কিছু গাড়ি হলুদ, সাদা, কালো, নীল ইত্যাদি বাহারি রঙেরও রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে চান্দের গাড়ির চাহিদা এখন আকাশচুম্বি। প্রতিদিন শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো ভ্রমণে আসেন প্রচুর পরিমাণ দেশি-বিদেশি পর্যটক। সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবার এবং ঈদ-পূজাসহ সরকারি অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে এ অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকদের ঢল নামে। দুর্গম এলাকায় এবং পাহাড়ি আকাঁ-বাকা সড়কে চলাচলে স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন চান্দের গাড়ি নামক জিপ গাড়ির। এ অঞ্চলে আগত পর্যটকদের কাছে চান্দের গাড়ির চাহিদা সর্বাধিক। কোন কোন পর্যটক চান্দের গাড়ির চালক পরিচিত হলে অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখেন। সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবার এবং সরকারি অন্যান্য ছুটির দিনগুলোতে চান্দের গাড়ি পাওয়া অনেকটাই দুরূহ ব্যাপার। 

গত কয়েক বছর ধরে চান্দের গাড়ি এ অঞ্চলে আগত পর্যটকের কাছে প্রশান্তিময় ভ্রমণের জন্য জন্য একটি অত্যাবশকীয় যানে পরিণত হয়েছে। এ গাড়িতে ভ্রমণ না করতে পারলে যেন পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলায় ভ্রমণ করা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এছাড়া যেহেতু শ্রীমঙ্গলসহ আশপাশের উপজেলাগুলোর পর্যটন স্পটগুলোর অধিকাংশই পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। ফলে উঁচু-নিচু পাহাড়ি বা গ্রাম্য মেঠোপথে নিরাপদ ভ্রমণের জন্য এ গাড়ির বিকল্প নেই। চান্দের গাড়িগুলো ফোর হুইল গিয়ারযুক্ত। এ কারনে উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ বা কাদাযুক্ত মেঠোপথে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে গাড়িগুলো।

জানা যায়, চান্দের গাড়ি মূলত ব্রিটিশ আমলের এক ধরণের জিপ গাড়ি। এ গাড়ি চলতে উঁচু-নিচু পথ কোন বিষয়ই নয়। গাড়িগুলো আসন থাকে সাধারণত ৮ থেকে ১০ জনের। তবে আসনে বসে ও দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে পারেন ১৫ থেকে ২০ জন পর্যন্ত।

ব্রিটিশ আমল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলাচলকারী এবং এদেশে হালের জনপ্রিয় চান্দের গাড়ির প্রস্তুতকারী দেশ হলো জাপান। গাড়িটির মৌলিক নাম ‘মিৎসুবিসি জিপ’। শহুরে জনপদে গাড়িটির নাম এখনো জিপ গাড়ি হলেও পাহাড়ি জনপদে এটির নাম চান্দের গাড়ি। গাড়িটি পাহাড়ি জনপদে কেন বা কীভাবে চান্দের গাড়ি নামে পরিচিত হয়ে ওঠলো তার কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। পাহাড়ি জনপদের বাসিন্দাদের মতে ফোর হুইল গিয়ারসমৃদ্ধ এ গাড়িটি যেহেতু পাহাড়ি উঁচু-নিচু টিলা, মেঠোপথ, কাদা মাড়িয়ে চলাচলে সক্ষম সেহেতু এ গাড়ি নিয়ে চান্দেও (চাঁদে) যাওয়া সম্ভব। তাই গাড়িটির নামকরণ করা হয় চান্দের গাড়ি। 

জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মিছির আলী বলেন, ‘আমাদের মৌলভীবাজার ও পার্শ্ববর্তী জেলা হবিগঞ্জের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই আনারস, লেবু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলমূল উৎপাদিত হয়ে থাকে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপাদিত ফল শহরে নিয়ে আসার জন্য মিৎসুবিসি জিপ গাড়ি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রায় দুই দশক আগে শ্রীমঙ্গলের পর্যটন শিল্পে জাগরণ শুরু হয়। সে সময় থেকেই এ গাড়িগুলোরও কদর বাড়তে থাকে। বর্তমানে পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য বিভিন্ন রঙের প্রায় তিন শতাধিক চান্দের গাড়ি রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। আর পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত ফলমূল পরিবহনের জন্য রয়েছে আরো দুই শতাধিক জিপ গাড়ি। পর্যটকদের পরিবহনের চান্দের গাড়ি গুলোর থাকে ছাদ খোলা। জেলার শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও বড়লেখা উপজেলার অধিকাংশ পর্যটন স্পট পাহাড়ি এলাকায়। তবে উন্নত আবাসন ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার জন্য পর্যটকদের প্রথম পছন্দ হলো শ্রীমঙ্গল। ফলে পর্যটকরা শ্রীমঙ্গল থেকেই চান্দের গাড়ি ভাড়া করে জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও ভ্রমণ করে থাকেন।’ 

চান্দের গাড়ির চালক মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছর শীত মৌসুমে প্রচুর পরিমাণ পর্যটক আসেন শ্রীমঙ্গলে। এর মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশ দেশি এবং ১০ শতাংশ বিদিশে। পর্যটকদের অধিকাংশই শ্রীমঙ্গলে আসার পরপরই খোঁজ করেন চান্দের গাড়ির। আমাদের এখানে চান্দের গাড়ির সবগুলোই ছাদ খোলা। তরুণ-যুবক পর্যকটরা গাড়িতে চড়ে গানের তালে তালে নাচতে নাচতে পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণ করেন। যা দেখে আমরাও তাদের সাথে আনন্দে ভাসি।’

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) শ্রীমঙ্গলে ভ্রমণে আসা জয়পুরহাটের কলেজ শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন বলেন, ‘আমি আমার পরিবারের সাথে প্রথমবার গত বছরের অক্টোবর মাসে শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে এসেছিলাম। সে সময়ে আমরা দুটি লাল রঙের চান্দের গাড়ি ভাড়া করে পর্যটন স্পটগুলোতে গিয়েছিলাম। শ্রীমঙ্গলের অবারিত সবুজ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আমি এতোই বিমোহীত যে, আমার বন্ধুদের সাথে শ্রীমঙ্গলের কথা প্রায়ই বর্ণনা করি। আমার বন্ধুদেরও আগ্রহ জাগে শ্রীমঙ্গল সম্পর্কে। গতকাল আমরা আট বন্ধু এসেছি প্রকৃতির সান্নিধ্যে। আজ চান্দের গাড়ি ভাড়া করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেশ কয়েকটি স্থানে গিয়েছি, পান করেছি সাত লেয়ারের চা। সবকিছু মাড়িয়ে ছাদখোলা চান্দের গাড়িতে ভ্রমণের মজাটাই আলাদা।’

চান্দের গাড়ির ভাড়া কেমন?
পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত শ্রীমঙ্গল ও আশপাশ উপজেলার পর্যটন স্পটগুলো ভ্রমণে গেলে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রতিটি চান্দের গাড়ের ভাড়া ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। চান্দের গাড়িতে করে সারাদিনে দেখা যাবে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, লাউয়াছড়া খাসিয়া পান পুঞ্জি, মাগুরছড়া পরিত্যক্ত গ্যাসকূপ, মাধবপুর লেক, মণিপুরী পাড়া, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর স্মৃতিসৌধ, শ্রীমঙ্গলের অবারিত চা বাগান, রাবার বাগান, বিটিআরআই, বধ্যভূমি একাত্তর, নিরালা খাসিয়া পানপুঞ্জি, বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, বাইক্কা বিল ইত্যাদি পর্যটন স্পট। শ্রীমঙ্গল থেকে জেলার অন্যান্য উপজেলায় গেলে ওই সময়ের জন্য ভাড়া নেবে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকার মধ্যে। পর্যটন মৌসুম তথা শীতকালে এবং সরকারি ছুটির দিনে যেহেতু শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের ঢল নামে সেহেতু ওই সময়ের যে ভাড়া থাকে অন্যান্য সময়ে সে ভাড়া থেকে কিছুটা কমে পাওয়া যায় চান্দের গাড়িগুলো।

কোথায় পাওয়া যায় চান্দের গাড়ি?
শ্রীমঙ্গল শহরে চান্দের গাড়ির নির্দিষ্ট কোন স্ট্যান্ড নেই। তবে শহরের রেলওয়ে স্টেশন রোডস্থ যমুনা পেট্রোল পাম্পের বিপরীত পাশে, দেওয়ান বেকারির সামনে, ঘরণীর সামনে, ভানুগাছ রোডস্থ মহসিন অডিটোরিয়ামের সামনে প্রতিদিন ভোর থেকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য অপেক্ষমান থাকে গাড়িগুলো। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী আন্ত:নগর ট্রেনগুলোর শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ টাইমে স্টেশনের পাশেই চান্দের গাড়িগুলো পাওয়া যায়। তবে পর্যটন মৌসুমে (শীতকাল), শুক্র ও শনিবার এবং ঈদ-পূজাসহ অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনে শ্রীমঙ্গলে এসে চান্দের গাড়িতে ভ্রমণের ইচ্ছে থাকলে আগাম বুকিং দিয়ে রাখতে হবে। নতুবা চান্দের গাড়ি পাওয়া অনেকটা দুরুহ হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত