ইংরেজি সাহিত্যের পুরনো একটি ক্ল্যাসিক উপন্যাস চার্লস ডিকেন্সের গ্রেট এক্সপেক্টেশন থেকে মিস হাভিশামের একটি স্থির দৃশ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাইবেদিতে পড়ে থাকা এক নববধূকে দেখা গেল তার বাকি বছরগুলোর জন্য স্থির সময়ের মধ্যে আটকে থাকতে, সেই থেকে তিনি সব সময় বিয়ের পোশাক পরা, একটি স্থিরদৃশ্যে আটকা পড়ে আছেন, যখন কি না তার পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর বিবিসির দুই পর্বের তথ্যচিত্রটিও আমার ওপর একই ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। মনে হলো পুরনো লেস আর সাদা জামা পরা সেই নববধূর দিকে তাকিয়ে আছি আমি, সময়ের সঙ্গে যা বড় বেমানান। আমি তা-ই ব্যাখ্যা করব এ লেখায়।
আমার মতো কাক্সিক্ষত ও বিধ্বংসী দর্শকদের কাছে তথ্যচিত্রটি নতুন তদন্ত প্রতিবেদন হিসেবে আগাম বেচা হয়েছিল, যা নতুন তথ্য সামনে আনবে এবং এমন কিছু দেখাবে, যা আমরা আগে দেখিনি। উদার বামপন্থি বেশ কিছু মানুষের চমকপ্রদ অংশগ্রহণ ছিল, যাদের আমি সব সময়ই প্রশংসা করে থাকি এবং ভবিষ্যতেও করব, এবং আমার নায়ক হিসেবেই থাকবেন তারা। অরুন্ধতী রায়, যে লেখিকা কখনো তার কথার বরখেলাপ করেননি। আকার প্যাটেল, একজন অ্যাক্টিভিস্ট এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় প্রধান। তিনি বেশ ভালোভাবেই তার নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সিদ্ধার্থ ভারদারাজন, আমার প্রিয় সাংবাদিকদের একজন এবং তিনি সর্বশেষ স্বাধীনভাবে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেস স্পেসের প্রতিষ্ঠাতা। এ ছাড়া দ্য ক্যারাভান ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা হর্তোষ বল। ক্রিস্টোফ জাফরেলট, হিন্দু অধিকার নিয়ে প্রচুর গবেষণা ও লেখালেখি করা একজন সুপরিচিত শিক্ষাবিদ। এমন সেরা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া সত্ত্বেও, বিবিসি ওই তথ্যচিত্রে তাদের এমনভাবেই তুলে ধরেছে যে নতুন কিছুই বলা হয়নি।
তথ্যচিত্রটির জন্য ক্ষমতায় থাকা শাসকরা নিজেরাই দুর্ভোগের শিকার বলে আরও একবার অপপ্রচার চালানোর সুযোগ পাবে। এতে যুক্ত বামপন্থিদের সমালোচনাকেও তারা নিজস্ব প্রয়োজনে কাজে খাটানোর সুযোগ পাবে। বিবিসি কার্যত ভারতের সেরা অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক ও সাংবাদিকদের যারা তেজি, সজীব ও গতিশীল তথ্যচিত্রটিতে তাদেরই নিয়েছে। তাদের পুনরাবৃত্তিমূলক ও গৎবাঁধাভাবে একসঙ্গে এমনভাবে গেঁথে দিয়েছে যে দেখে মনে হয় যেন তারা স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিবিসি মিস হাভিশামের ছবিটির পুনরাবৃত্তি করেছে।
তথ্যচিত্রটির প্রথম পর্বের কথা বলা যাক। মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন সেই ২০০২ সালে ফিরে যায় ক্যামেরা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে সে সময়েই গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে। অশুভ সংগীত বাজতে থাকে এবং এ সময় একটি অন্ধকার কম্পিউটার স্ক্রিন সামনে আসে। বড় ধরনের একটি তথ্য উদঘাটন হয় তাতেএখন আর গোপন নয় এমন একটি কূটনৈতিক বার্তা এটি, যেখানে একজন ব্রিটিশ কূটনীতিক অনুমান করেছেন, মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য মোদি দায়ী এবং তিনিই পুলিশকে পিছিয়ে যেতে বলেছেন এবং জনতাকে তাদের কাজ করতে দেওয়ার আহ্বান জানান। একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক এবং সাবেক ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব জ্যাক স্ট্রের মতামত ছাড়া এই দাবির সমর্থনে কোনো নতুন প্রমাণ উপস্থাপন না করে বিবিসি ভারতে বিজেপি এবং তার মুখপাত্রদের প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে যে, ২০ বছর আগের একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকের কণ্ঠস্বর কেন সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে? বিবিসি যদি কূটনৈতিক বার্তা ব্যবহার করে দেখাতে পারত যে, যেই ব্রিটেন এবং ইউরোপ মোদিকে রক্তপাতের জন্য দায়ী করেছিল সেই তারাই কীভাবে পাঁচ বছর না যেতেই তার গলা থেকে বড়শির এই আংটা খুলে নিয়েছিল, তাহলে তারা গল্পের নতুন মোচড় দেখাতে পারত।
গোঁধরা-উত্তরহীন প্রশ্ন
২০০২ সালের সহিংসতার বিষয়টি যখনই আলোচনায় এসেছে, বিজেপি সব সময় বলতে চেয়েছে যে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার আগের দিন একটি ট্রেনের বগি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে ভিএইচপির ৫৯ জন হিন্দু কর সেবককে পুড়িয়ে ছাই করা হয়েছিল। বিবিসি এ বিষয়ে আরও কিছু কাজ করতে পারত, যা বিজেপিকে কঠিন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করত। প্রথমত, ৫৯ জন করসেবক বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ করছিলেন। ট্রেনে আরও অনেকে ছিলেন যারা টিকিট কেটে উঠেছিলেন এবং জীবিত নামার সুযোগ পেয়েছিলেন। তারা আসলে কি দেখতে পেয়েছিলেন? তাদের কথা কেন ধামাচাপা দেওয়া হয়? যদি মুসলমানরাই আসলে ওই বগিতে আগুন দিয়ে থাকে, তবে সেই জীবিতদের কথা শোনার ক্ষেত্রে তো ভয়ের কিছু থাকার কথা নয়।
তথ্যচিত্রে পুড়ে যাওয়া ট্রেনের বগিতে বেশি মনোযোগ দিয়ে বিজেপির অস্বস্তি আরও বাড়ানো যেত। পুড়িয়ে ফেলার একটি তদন্ত সেদিনের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার করেছিল। আরও একটি তদন্ত হয়েছিল কয়েক বছর পরে, বিরোধী নেতা লালু যাদব যখন রেলমন্ত্রী ছিলেন। উভয় তদন্তকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। বিবিসি কি এখানে কিছু মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারত না? নির্ধারিত স্টেশনের আগেই চেইন টেনে কেন ট্রেন থামানো হলো? মুসলমান এক মেয়ের শ্লীলতাহানি কি আসলেই করা হয়েছিল? এই গল্পগুলোর কী হয়েছিল এবং কেন এসব বিষয় হারিয়ে গেল?
এমনকি বিবিসি যদি দ্রুত গুগল সার্চও করতে চাইত, তাহলে ভিএইচপি সদস্যদের গল্প জানা যেত, যারা ট্রেনে অযোধ্যা (উত্তর প্রদেশে) থেকে গুজরাটে ফিরছিলেন। সেই দিন থেকে, ভিএইচপির এই সদস্যরা হয় তাদের সাংগঠনিক লোকদের আচরণে হতাশ কিংবা ভিএইচপি পরিবারে তাদের অবস্থান সম্পর্কে অসন্তুষ্ট ও বিভ্রান্ত বোধ করছে। কেন তাদের বিবেচনায় আনা হবে না?
ভারসাম্যের কর্মকাণ্ড
এবার আসি তথ্যচিত্রটির দ্বিতীয় পর্বে। এটি ভারতের গণপিটুনি দিয়ে শুরু২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে, আখলাকের, এবং ২০১৭ সালে ঝাড়খণ্ডে, আলিমুদ্দিন আনসারির। এ তথ্যচিত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধের বিষয়ে মোদির নীরবতার সঙ্গে ২০১৯ সালে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরকে বিকল ও বিভক্ত করা, হিন্দুদের প্রতি পক্ষপাতমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) তৈরি, সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভকে হিংসাত্মকভাবে দমনকে সম্পর্কযুক্ত করে। যথেষ্ট মজাদারভাবে এই তথ্যচিত্রের বিরুদ্ধ সমালোচনাও যুক্ত করা হয়েছে অরুন্ধতী রায়ের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘কেন আমি আপনার সঙ্গে এই তথ্যচিত্রে কথা বলব, শুধু যাতে কোথাও একটি রেকর্ড থাকে যে আমরা সবাই এর সঙ্গে একমত নই। তবে এ কোনোভাবেই সাহায্যের আহ্বান নয়, কারণ কোথাও থেকে কোনো সাহায্যই আসবে না।’
হিন্দু চরমপন্থিদের সহিংসতা ও ধর্ষণের আহ্বান এবং দিল্লির দাঙ্গায় পুলিশ সদস্যের লাথিতে মুসলমান হত্যার ভিডিওফিল্মটির সবচেয়ে জঘন্য এবং দেখা অসম্ভব অংশটি বিরোধী-তথ্য ও বাইট দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে। আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষ্য এবং নিহত ফাইজানের মায়ের কথার পাশাপাশি বিজেপি নেতা স্বপন দাশগুপ্তের বিদ্বেষপূর্ণ এবং আত্মতুষ্ট কথাবার্তা যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে তিনি আসলে দিল্লি দাঙ্গায় যে সহিংসতা হয়েছে তাকেই অস্বীকারের অপচেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বড় পরিসরে ভাবলে, দিল্লির দাঙ্গা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তবে মিডিয়ার কাছে তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এর অর্থ হচ্ছে কম পরিশ্রমেই আপনি হাতের নাগালে ভালো ফুটেজ পেয়ে যাচ্ছেন।’ এখন আমি যদি এই ফিল্ম তৈরি করতাম, আমি দাশগুপ্তের বক্তব্যর ফাঁপা দিকটি ফুটিয়ে তুলতে এর সঙ্গে সহিংসতার ফুটেজও সমান্তরালে তুলে ধরতাম। পুলিশ কর্র্তৃক মুসলিম পুরুষদের লাথি মেরে হত্যা এবং তাদের জাতীয় সংগীত গাইতে বলার ফুটেজ ব্যবহার করতাম। এরপর দর্শকরা মুখোমুখি হতেন দাশগুপ্তের ভয়াবহ সব অহংকারী কথাবার্তার, যা এই প্রশ্নকে সামনে আনেবিবিসি কি রুয়ান্ডা কিংবা আউশভিৎসের গণহত্যার ওপর তথ্যচিত্র বানানোর ক্ষেত্রে কুখ্যাত এসএসের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করে একই রকম ‘ভারসাম্য’ ধরে রাখার চেষ্টা করত?
এসব তথ্যচিত্র দিয়ে বিবিসি কী করতে চায়? তাৎক্ষণিকভাবে মনে আসে ১৯৬৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যার ওপর জোশুয়া ওপেনহাইমার নির্মিত দুই তথ্যচিত্রের কথা। যারা অপরাধী এবং তাদের কৃতকর্মের জন্য উল্লাস প্রকাশ করে থাকে, তাদেরই তিনি ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন। তাদের ভাবনাকে ‘ভারসাম্য’ দেওয়ার কোনো চেষ্টা ছাড়াই তারা কারা তা দেখিয়ে দেয় তার তথ্যচিত্র দুটি। অ্যাক্ট অব কিলিং এবং দ্য লুক অব সাইলেন্সএই দুই তথ্যচিত্র ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। তথ্যচিত্র দুটি তৈরি ও প্রকাশের ক্ষেত্রেও দেশটির রাজনৈতিক মহল অংশীদার হয়েছিল। ভালো তথ্যচিত্র নির্মাণই শুধু এমন ভূমিকা রাখতে পারে।
যেখানে আঘাত লাগে সেখানে আঘাত করার উদ্দেশ্য নিয়েই এগোতে হবে। এজন্য অরুন্ধতী রায়, আকার প্যাটেল এবং সাফুরা জারগারদুই পর্বেও বিবিসির এ তথ্যচিত্রের নায়কদের মতোই আমাদের অবশ্যই সর্বব্যাপীভাবে অনুসন্ধিৎসু, সতেজ ও সাহসী হতে হবে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল বলে সাফুরা জারগারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। এজন্য তাকে গর্ভবতী অবস্থায় ৭৪ দিনের জন্য কারাগারে কাটাতে হয়। আর বিবিসি কি না এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যস্ত।
লেখকঃ সাংবাদিক এবং ‘দ্য অ্যানাটমি অব হেইট’র লেখক। ভারতের উত্তর প্রদেশে বসবাস ও কর্মরত। ‘দ্য এআইডিইএম’ থেকে অনুবাদ : রথো রাফি