রাজনীতির অ্যাডজাস্টমেন্ট কত দূর

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৩, ১১:৫২ পিএম

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক ময়দানে ব্যাপক উত্তেজনা চলছে। শাসক দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই এবং বিরোধীদের সরকার উৎখাতে উন্মত্ত প্রণোদনা। মাঝপক্ষ জনগণ ক্লিষ্ট তাদের প্রাত্যহিক যন্ত্রণা ও হিসাবের যাতনায়। তবুও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সময় বহমান। কারও জন্য থেমে থাকার জন্য না। আমাদের অর্থনৈতিক উৎকর্ষতা যতটুকুই থাক রাজনৈতিক উৎকর্ষতার ম্যুরাল সে অর্থে নেই। যদিও স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টি আপেক্ষিক। এক এক জনের কাছে এক এক রকম। তবু ‘স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব শৃঙ্খল বলো কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়’। কবি বা কবিতায় নয়, বাস্তব জীবনে মানুষ তাই মনে করে। সেটা সরকার বা বিরোধী দল কিংবা জনগণ সবার জন্যই একই।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বর্তমানে জনগণের মধ্যে এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন। আগামী নির্বাচন কি হবে? শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে হবে নাকি নির্দলীয় সরকারের অধীনে হবে? বিএনপি কি নির্বাচনে আসবে? নির্বাচন কি সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ হবে? সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ না হলে কী হবে? নির্দলীয় সরকার হলে কে এর প্রধান? তারা কতদিন ক্ষমতায় থাকবে? আমেরিকা কি সরকারের বিরুদ্ধে? বিদেশি চাপ এত বেশি কেন, সরকার কি জোর করে ভোট করবে এ ধরনের অনেক জিজ্ঞাসা আছে মানুষের মনে। এসব জিজ্ঞাসায় থাকা অযৌক্তিক নয়। গত বছর থেকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বিদেশি তৎপরতা দেখে জনগণের মধ্যে এসব জিজ্ঞাসার জন্ম হয়েছে। বোধকরি এসব জিজ্ঞাসার মধ্যে আছেন রাজনীতিকরাও। যেটা হয়তো তারা প্রকাশ করতে পারছেন না। আগামী নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে এসব জিজ্ঞাসা আরও জোরালো হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এসব জিজ্ঞাসার কারণ কী। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের কেন এসব প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতি নিয়ে বিরোধিতা অমূলক। এ কারণে বলছি, নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, সরকার গঠন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য স্বীকৃত বিষয়। এগুলো প্রতিদিনের দেনদরবারের বিষয় নয়। কিন্তু আমাদের দেশে দেনদরবারই বেশি হচ্ছে। দীর্ঘসময় সামরিক শাসনের কব্জা থেকে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় উন্নীত করা হয়েছে, যদি বলি তবে সবপক্ষ এসব বিষয় জেনে মেনে বলেছে গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছে। তবে বিরোধিতা কেন? এসব মতবিরোধ দূর করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে পারস্পরিক আলোচনার বিকল্প নেই। 

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের শাসনের অবসানের পর বলা হলো, গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্দলীয় সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিযুক্ত হলো। সেখান থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা দল রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়ে রাষ্ট্রশাসনের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দলের কাছে তারা কি গণতন্ত্রিক সরকার ছিল? না, তখনো বিরোধী দল থেকে সরকারকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আবার নির্বাচন হলো, ’৯১-এর বিরোধী দল ক্ষমতায় এলো। কিন্তু তারাও সরকারকে ‘স্বৈরাচারী’ সরকার হিসেবে চিহ্নিত করল। তাহলে কী দাঁড়াল? আমার সাধের গণতন্ত্র কোথায়? আর তারাই দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শাসন করছে। যারা নিজেরাই যখন বিরোধী দলে থাকছে তারা সরকারকে স্বৈরশাসক বলছে। তাই ’৯০-এর আন্দোলনের পর গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছে যদি বলা হয়, আদতে তা হয়নি। বোধকরি রাজনৈতিক দলগুলোও সেটাই বিশ্বাস করে। জনগণ করবেটা কী?

একটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিটি নির্বাচনের আগে দুই দলের রেষারেষি চলছে গত ৩৩ বছর ধরে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গণতন্ত্র এমন একটি বিষয় যেখানে কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ থেকেই যায়।’ যদি তাই হয় তবে কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের চেষ্টা তিনি বা তার দল করছে না কেন? শাসক দল হিসেবে তাদের ভূমিকাই তো বেশি। ওবায়দুল কাদের আরও বলেছেন, ‘বিএনপির দাবি সংবিধানসম্মত না। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো মৃত একটি ইস্যুকে সামনে এনেছে। তাদের এক দফা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ, সংসদ বিলুপ্তি, নির্বাচন কমিশন বাতিল করতে হবে। এসব দাবির মুখে কীভাবে কম্প্রোমাইজ হবে। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার জায়গা নেই। বিএনপি সমঝোতা আপসের কোনো পথ খোলা রাখেনি। সংবিধান লঙ্ঘন করে তো আমরা সমঝোতা করব না।’ তিনি যথার্থ বলেছেন কিনা তা তিনি বলতে পারবেন। কারণ আমরা গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা করেছিলাম, অসাংবিধানিক পথে। সেটা নিশ্চই কাদের সাহেব ভুলে যাননি। সে পথের সমর্থক আজকের সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই। তবে সেই অসাংবিধানিক পথ যদি সঠিক হয়ে থাকে, তবে এখন বিএনপির দাবি কেন অসাংবিধানিক হবে। মেনে নিলাম বিএনপি অসাংবিধানিক দাবি করছে, সেখানে প্রশ্ন এ পরিস্থিতি তৈরি বা এসব দাবি উত্থাপনের সুযোগটা কিন্তু বর্তমান সরকারই করে দিয়েছে। সুতরাং গণতন্ত্রে যদি কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ থেকেই থাকে, এবারও অসাংবিধানিক পন্থাটি অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যবস্থা হোক। হোক বা না হোক অন্তত আলোচনাটা হোক। যেটা হতে পারেনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাতিল করার সময়। হয়তো তখন আলোচনাটি হয়ে থাকলে আজ এই অসাংবিধানিক বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হতো না।

আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে থাকার পরও তো আমাদের ১/১১ সরকারব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। সেটাও তো বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলের কারণেই হয়েছে। ওই সময় যে সমস্যাগুলো তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে উত্থাপিত হয়েছিল ওই সংকটগুলো আবারও হতে পারে। কারণ আমাদের রাজনীতিকরা সব সেক্টরেই নিজেদের অবস্থান জোরালো রাখার চেষ্টা করেন। ক্ষমতায় থাকাকালে পুনরায় ক্ষমতায় আসার জন্য রাস্তা তৈরি করে রাখেন। মূলত সে কারণেই বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় বিতর্কের জন্ম হয়েছিল। জাল ভোট বা  কারচুপির ভোটের জন্য নয়। সুতরাং নতুন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বা নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা যা-ই আসুক না কেন অতীতের ধারা চলতে থাকলে সেটাও বিতর্কিত হতে পারে। সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ কারণে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দুই দলকে আবার নতুন করে আলোচনায় বসা ছাড়া বিকল্প নেই।

যদিও আমাদের দেশে সংকট সমাধানে আলোচনার ফলাফল সুখকর নয়। কারণ রাজনৈতিক সংকট নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনাই ফলপ্রসূ হয়নি। সেটা সামরিক সরকারের সময়ও হয়নি। গণতান্ত্রিকব্যবস্থার মধ্যে থেকেও হয়নি। রাজনীতিকরা বরাবরই ‘বিচার মানি তালগাছ আমার’ নীতিতে বিশ্বাসী। তবে এবার আশার কথা হলো, ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক যখন বলেছেন ‘গণতন্ত্র এমন একটি বিষয় যেখানে কম্প্রোমাইজ ও অ্যাডজাস্টমেন্টের সুযোগ থেকেই যায়’। এটাকেই আমরা পুঁজি করতে পারি। আলোচনা করে তারা অ্যাডজাস্টমেন্ট করে জনগণকে সম্প্রীতির সুবাতাস উপহার দিতে পারেন। যেহেতু এই দুই দলই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রণেতা। এ কারণে দায়িত্বটা তাদেরই বেশি। গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে ১৯৯১ ও ’৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। ফলে এ কথা বলাই যায় রাজনীতিকদের সদিচ্ছা থাকলে একটা নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্যতার কাতারে তারা নিতেই পারেন।

বর্তমানে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিদেশিদের তৎপরতা আমাদের লজ্জিত করে। কারণ বিষয়টি আমাদের একান্ত নিজস্ব। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কীভাবে নির্বাচন করব, কোন পন্থায় নতুন সরকার বেছে নেব সেটা একান্তই আমাদের। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বিশ^ যখন মহাশূন্যে বসতির ভাবনায় আছে, সেখানে আমাদের রাজনীতিকরা ক্ষমতায় থাকা না থাকা নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে তো সুশাসনের নিশ্চয়তা। আমাদের রাজনীতিকরা সেটা নিশ্চিত করতে পারলে কোনো বৈরিতা থাকার কথা নয়। আর গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত যদি হয় ভোট, তবে রাজনীতিকদের জনগণের ওপর আস্থা রাখতে হবে। জনগণকে নিজেদের আস্থার জায়গায় নিতে হবে।   

অথচ রাজনৈতিক রোষে পড়ে জনগণ ক্লিষ্ট। যদিও সব সরকারেরই জনগণকে সুখে রাখার দাবি আছে। কিন্তু জনগণ কোথায় আছে? সামাজিক নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার যাতনা সব সময়ই ছিল এবং আছে। বর্তমানে বাজার অব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষ ব্যাপক যাতনা সইছেন। মূল্যস্ফীতির জাঁতাকলে মানুষের ত্রাহি দশা। কিন্তু সরকার তো ব্যস্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে। জনগণের দুর্দশা শোনার সময় কোথায়। কিন্তু প্রশাসনও কি ব্যস্ত? যদি তা না হয় তবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায় কী করে। সরকারের এই রাজনৈতিক ব্যস্ততা থাকত না যদি সঠিক ও গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা থাকত। তাই সবার আগে অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হবে দুই দলকেই। বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জন্য।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত