আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২২, ০১:৩৫ এএম

১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকের কথা। একটি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আমি বিশেষভাবে আহত হয়েছিলাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছিলাম দীর্ঘকালীন চিকিৎসায়। সেই দুর্ঘটনায় বাবা গিয়াসুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মৃত্যু হয় এবং আঘাতপ্রাপ্ত হন ভাই ফারুক চৌধুরীও। রাজনৈতিক অস্থিরতার সেই দিনগুলোতে যখন দেশব্যাপী চলছিল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, তখন স্থির হলো আমার হাসপাতাল থেকে গৃহে প্রত্যাবর্তনই শ্রেয় হবে।

যশোর ক্যান্টনমেন্টে ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত আমার ভগ্নিপতি লে. কর্নেল সৈয়দ আবদুল হাই, বোন নাসিম ও তাদের তিন নাবালক পুত্র আশফাক, আদেল ও আবেদ ওই কঠিন সময়ে পরিবারের সঙ্গে কয়েকটি দিনক্ষেপণের জন্য এসেছিল। তারাও ফিরে গেল। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী সাইক্লোন-বন্যায় বিপর্যন্ত দক্ষিণ বাংলার উপদ্রুত অঞ্চলে রিলিফ ও পুনর্নির্মাণ কাজে কর্নেল হাইয়ের ইউনিট বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ছিল। ওই সময়ে ভোলায় অবস্থানরত কর্নেল হাইয়ের সুযোগ হয় তোফায়েল আহমেদসহ অন্যান্য নেতাকর্মীর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা এবং পরিস্থিতির সম্যক উপলব্ধি করা।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের পরে ক্রমেই বুঝা যাচ্ছিল যে, নির্বাচনের ফলাফল এবং তার মাধ্যমে জনগণের সুস্পষ্ট রায়কে পাকিস্তান আর্মি গ্রহণ করতে পারছে না। যদিও তারা বাহ্যত কোনো প্রতিকূলতা প্রাথমিকভাবে দেখায়নি। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবেও একাধিকবার শীর্ষতম মহলেও ঘোষণা করতে শোনা গেছে। কিন্তু মার্চ ১-এ সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ঘোষণা সব সংশয়ের নিরসন করল।

এর পূর্বে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তবে তখন তাকে রুটিন কার্যক্রমই ধরা হয়েছিল। পাকিস্তান আর্মি মেডিকেল কোর প্রধান লে. জেনারেল আইয়ুব পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলেন। যশোরে ১০৭ ব্রিগেডের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো ২৫ বেলুচ রেজিমেন্টকে। সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খান নিজেই এলেন যশোরে আর্মির অবস্থান পরিদর্শনে। পরে বুঝা গেল এসব তৎপরতার তাৎপর্য।

বঙ্গবন্ধুর মার্চ ৭-এর অবিস্মরণীয় ভাষণ আর্মির সব বাঙালির মধ্যে এক সংগ্রামী ঐক্যবোধের সৃষ্টি করল। শুরু হলো এক তুলনাহীন অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। বোর্ডিং স্কুলে অধ্যয়নরত আশফাক তার মাতুলালয় ধানমন্ডির ‘সুরমা হাউস’ ফিরে এলো, যেখানে আমরাও অবস্থান করছিলাম। যশোর থেকে সস্ত্রীক কর্নেল হাই তার অন্য দুজন নাবালক পুত্র আদেল ও আরেফকে নিয়ে চলে এলেন ‘সুরমা’তে বাবার অকাল মৃতুতে শোকাহত পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে।

অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ১৩ মার্চ সপরিবারে রোড দিয়েই নিজেদের গাড়ি নিয়ে কর্নেল হাই প্রত্যাবর্তন করলেন যশোরে। সারাটি পথ তাদের গাড়িতে ওড়ানো ছিল সবুজ ক্ষেত্রের পটভূমে চক্রাকার লাল সূর্যের ওপর আঁকা সোনালি বাংলাদেশের মানচিত্রসহ স্বাধীনতার পতাকা। আর ছিল এক ব্ল্যাক-ফ্ল্যাগ অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন সূচক। এই পতাকাশোভিত কোনো গাড়িকে তো ক্যান্টনমেন্টে ঢুকতে দেবে না! যশোরে ক্যান্টনমেন্টের প্রবেশপথেই প্রতিরোধকারী মিলিটারি পুলিশ আর্মি ইন্টেলিজেন্স এবং স্টেশন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার এ আর দুররানীকে তা জানিয়ে দিল।

তখন কিছুটা আভাস পাওয়া গেলেও পুরোপুরি জানা ছিল না যে কর্নেল হাইয়ের কার্যাবলি ইতোমধ্যেই আর্মি ইন্টেলিজেন্স মনিটরিংয়ের কড়া নজরে ছিল। ঢাকাতে তখন আমাদের ধানমন্ডির বাড়ি সুরমা রাজনৈতিক আলোচনার একটি কেন্দ্রস্থল হিসেবেই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাশ্ববর্তী বাড়িই ছিল ডা. টি. হোসেনের (স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের প্রথম স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য সচিব) নিরাময় কেন্দ্র। বাড়িতে তখন নিয়মিতই আসতেন (তখন) কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানী এমপি। তিনি সদ্য প্রয়াত বাবাকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃতুল্যই জ্ঞান করতেন। ছিল গভীর পারিবারিক যোগাযোগ। আসতেন কর্নেল রব (পরে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ আর্মির উপ-প্রধান)। সেখানে তাদের সঙ্গে এবং কখনওবা এমপি আব্দুস সামাদ আজাদ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এদের সঙ্গেও অবস্থানরত কর্নেল হাই বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার ও বৈষম্য দূরীকরণের সম্ভাব্য পন্থাগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন। এসব আলোচনা বিশেষ করে বঙ্গবীর ওসমানীর সঙ্গে তার যোগাযোগ আর্মি কর্তৃপক্ষের কড়া মনিটরিং ও নজরদারিতে ছিল।

পরের দিনগুলোতে অনিশ্চয়তা এবং উত্তেজনা ক্রমবর্ধমান ছিল। ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানের অনুকূলে কোনো সেøাগান হলেই বাঙালি সৈনিকরা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তুলতেন। ১ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট তখন নিকটবর্তী চৌগাছায় নিয়মিত ‘এক্সারসাইজ’-এ ছিল। তাই এসব স্লোগান আসত প্রধানত ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের বাঙালিদের কাছ থেকেই। একাধিকবার ব্রিগেডিয়ার দুররানী কর্নেল হাইকে নির্দেশ দিয়েছেন এ-জাতীয় কার্যকলাপ থেকে সৈনিকদের নিবৃত্ত রাখতে। কর্নেল হাইয়ের বক্তব্য থাকত একপক্ষ যদি তাদের মতামত প্রকাশে সোচ্চার হয়, স্বাভাবতই তো অন্যপক্ষ তাদের মতপ্রকাশে উদগ্রীব হবে। যখন বিভীষিকাময় ২৫ মার্চে ঢাকায় আর্মির ধ্বংসযজ্ঞের খবর ধীরে ধীরে পৌঁছাল (ফোন যোগাযোগ তখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন)। তখন পরিস্থিতি বিস্ফোরণমুখী হয়ে দাঁড়াল। এ ইস্টবেঙ্গলকে তাদের ‘এক্সারসাইজ’ ক্ষান্ত করে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হলো। রেজিমেন্টের কমান্ডে ছিলেন প্রধানতম বাঙালি অফিসার লে. কর্নেল রেজাউল জলিল। তারা নির্দেশ মতোই ২৯ মার্চ যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে এলেন। অসহযোগ আন্দোলন কিংবা এ-জাতীয় কোনো কর্মকান্ডে বা আলোচনায় এগিয়ে আসতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করলেন।

৩০ মার্চ আর্মিতে বাঙালিদের নিরস্ত্রীকরণের নির্দেশ বাস্তবায়নে যে কী ঘটনার সৃষ্টি হয়েছিল তা বহু গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনায়ই বিবৃত হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ আর্মি মেডিকেল সার্ভিস প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধে আর্মি মেডিকেল কোর’ আশফাক হাই রচিত ঘটনাভিত্তিক প্রামাণ্য পুস্তিকা ‘৩০ শে মার্চ ১৯৭১ যশোর ক্যান্টনমেন্ট (ইংরেজিতে)’, ‘রক্তঝরা একাত্তর’ মেজর হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, বীরোচিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস’ প্রভৃতি। ৩০ শে মার্চ ভোরবেলা কর্নেল হাই একটি জরুরি টেলিফোন পেয়ে তড়িঘড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিসে গেলেন। সাধারণত তার স্ত্রী নাসিমই তাকে ড্রাইভ করে অফিস পৌঁছাতেন। সেদিন আকস্মিকভাবে বেরিয়ে যেতে যেতে তিনি নাসিমকে বললেন ‘যেকোনো ধরনের অবস্থার জন্য প্রস্তুত থেকো।’ আর একটি ছোট নোটবুক দেখিয়ে বললেন ‘আমার কিছু লেখা এখানে আছে নোটগুলো পড়ো।’ পরবর্তীতে বুঝা গেল এগুলো ছিল তার সম্ভাব্য বিদায়-বার্তা।

কিছুকাল পরেই ক্যান্টনমেন্ট সচকিত করে শুরু হলো পাকিস্তান আর্মির ২৫ বেলুচের শেল-নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণ। ভোরবেলাই ব্রিগেডিয়ার দুররানী এক আর্মি কন্টিনজেন্ট নিয়ে আকস্মিকভাবেই ১ ইস্টবেঙ্গলে গেলেন। হতচকিত কর্নেল জলিলকে বললেন ‘দুঃখিত, কিন্তু নির্দেশক্রমে আপনাকে কমান্ড পজিশন থেকে এই মুহূর্তে অপসারিত করা হলো। অস্ত্রাগারের চাবি দিয়ে আপনি নির্দেশিত স্থানে গিয়ে সপরিবারে অবস্থান করুন।’

এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই হঠাৎই কর্নেল হাইয়ের বাংলোতে সৈনিক সমভিব্যাহারে ব্রিগেডিয়ার দুররানীর আগমন। তিনি নাসিমের উপস্থিতিতেই কর্নেল হাইকে ফোন করলেন ‘একটি সাদা কাপড় বা ফ্ল্যাগ উঁচিয়ে অফিসের বাইরে আসুন। আপনার জীবনের নিরাপত্তা থাকবে।’

এদিকে অস্ত্রাগারের তালা ভেঙে ইস্টবেঙ্গলের বাঙালি সৈনিকরা গোলা-বারুদ যথাসম্ভব বের করে নিয়ে তারাও গুলিবর্ষণ শুরু করেছে তাদের কমান্ডার কর্নেল জলিলকে ছাড়াই। ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সে যাদের অবস্থান ছিল সন্নিকটেই, সব বাঙালিই যোগ দিলেন বিদ্রোহী ১ ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে। ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের কমান্ডার এবং বাঙালি অফিসাররা সাদা ফ্ল্যাগ বা কাপড় না দেখিয়ে স্ব স্ব স্থানেই অবস্থান করলেন। উভয়পক্ষে গোলাগুলি অব্যাহত থাকল। ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে দুই শতাধিক বাঙালি সৈনিক গুলি করতে করতে পশ্চাৎপসরণ করে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে চলে গেল। ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের রসদ খুবই সীমিত। জনবল আরও কম। ২২ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের দুটো কন্টিনজেন্ট ৭ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স কার্যালয়কে ঘেরাও করে ফেলল। কর্নের হাইয়ের অফিসের পেছনের দরজা ভেঙে জনৈক ক্যাপ্টেন মোমতাজের নেতৃত্বে সশস্ত্র কয়েকজন সৈনিক অফিসে প্রবশে করল। ঢুকেই তারা কর্নেল হাইয়ের পরিচিতি নির্ণয় করল এবং তারা ব্রাশফায়ার করল। প্রথমে কর্নেল হাইয়ের দিকে এবং তৎপরবর্তী মুহূর্তে তার পাশে দ-ায়মান সহকারী ক্যাপ্টেন শেখকে পূর্বেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ‘আমরা কর্নেল হাইকে আর জীবিত দেখতে চাই না।’ অন্য কাউকে আর হত্যা না করে আক্রমণকারী সৈন্যদল ফিরে গেল। সেদিন এবং এর পরের দিন যশোর ক্যান্টনমেন্টে ঘটিত এই ঘটনাবলির কথা ঢাকায় আমরা কিছুই শুনিনি। অনির্দিষ্টভাবে সামান্য জেনেছিলাম যে যশোর ক্যান্টনমেন্টে কিছু একটা বিদ্রোহ হয়েছে।

আমি খুলনার (বৃহত্তর) এবং আমার বন্ধু ও সহকর্মী খোন্দকার আসাদুজ্জামান (বৃহত্তর) রাজশাহীর ডেপুটি কমিশনার ছিলাম। মাঠপর্যায়ে থেকে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে এসে আসাদকে অর্থ বিভাগে এবং আমাকে শিল্প-বাণিজ্য বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে নিযুক্তি দেওয়া হলো। আমি হাসপাতাল থেকে মুক্তি নিয়ে খুলনায় গিয়ে ১ মার্চ দায়িত্বভার ত্যাগ করি। পরে বিভিন্ন কারণে নদীপথে লঞ্চ নিয়ে সপরিবারে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করি।

খুলনাতে নিযুক্ত অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার সৈয়দ শহীদ হোসেন সিএমপি (পাকিস্তানি) কার্যভার গ্রহণ করেন। তিনি কর্নেল হাই এবং আমার সম্পর্কের কথা অবগত ছিলেন। তিনি দায়িত্বসম্পন্ন জনদরদী অফিসার। তাকে ৩০ শে মার্চ খুলনা থেকে যশোর ক্যান্টনমেন্টে আর্মি-নিরাপত্তায় নিয়ে আসা হয়। তিনি তার লিখিত (ইংরেজিতে) ‘যা ছিল একদা পূর্ব পাকিস্তান’ (২০১০ সাল) বইটিতে লিখেছেন সেদিন সন্ধ্যেবেলা একজন আর্মি অফিসার সেদিনকার ক্যান্টনমেন্ট সংঘটিত ঘটনাবলির কথা বলছিলেন। আমি তার কাছে শুনে বিষাদগ্রস্ত হলাম যে ওরা কিংবা সম্ভবত সে নিজেই একজন উন্নতমানের বাঙালি ডাক্তার একজন আর্মি কর্নেলকে হত্যা করেছে। এই অবিবেচনাপ্রসূত দুঃখজনক হত্যাকা-ে আমি আমার কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করি। বলি যে, তিনি একজন অতীব দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন সুবিবেচক বিবেকবান মানবদদরদী ছিলেন, সকলের মঙ্গলই ছিল যার কাম্য।  আমার কথা শুনে ওই অফিসার পিস্তল উঁচিয়ে আমার দিকে তেড়ে এলো, কেননা ওর ধারণায় আমি একজন দেশদ্রোহীর পক্ষ সমর্থন করছিলাম। তখন পাকিস্তান আর্মির সবার মনে ধারণা ছিল যে বাঙালি মাত্রই বিশ^াসঘাতক। ৩১ শে মার্চ রাতে কারফিউ আচ্ছাদিত সারা ঢাকায় এক ভীতিপ্রদ নীরবতা। রাত ১০টার দিকে মেশিনগান সন্নিবেশিত গাড়ির পাহারায় একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে ধানমন্ডির ‘সুরমা’র গেটে থামল। অনুসরণকারী আর্মির গাড়ি থেকে কয়েকজন সশস্ত্র সৈনিক নেমে সারা বাড়িটাই চতুর্দিকে ঘেরাও করল। আমরা বাড়ির ভেতর থেকে সন্তর্পণে জানালার পর্দা কিছুটা সরিয়ে দেখলাম অ্যাম্বুলেন্স থেকে একটি কফিন নামিয়ে ভেতরে বারান্দার পাশে রাখা হলো। বারান্দায় ভারী বুটের শব্দ এবং দরজাতে করাঘাত। আমাদের সবাইকে ভেতরে থাকতে বলে আম্মা নিজেই দরজা খুলে বাইরে তাকালেন। অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন, এক নিশ্চুপ নাসিম তার তিন শিশুপুত্রকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উৎকণ্ঠিত আম্মার প্রশ্ন হাই কোথায়? বাক্যহীনা নাসিম অঙ্গুলি উঁচিয়ে মাটিতে রক্ষিত কফিনের দিকে নির্দেশনা দিল। একজন অফিসার জলদগম্ভীর স্বরে বললেন ‘কোনো উত্তেজনা-প্রতিবাদ নয়। সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করুন। কোনো বাহ্যিক আহাজারি নয়। আর এ বাড়ির কম্পাউন্ডেই দাফন সারতে হবে।’

আমাদের উর্দুভাষি সাহসী ও বিশ^স্ত ড্রাইভার পাশ্ববর্তী মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ তেলাওয়াতের জন্য একজন মৌলভীকে নিরাপত্তার আশাস দিয়ে বাসায় নিয়ে এলো। পরের দিন সকালে অনেক অনুরোধ উপরোধের পরে কেন্দ্রীয় অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর উপস্থিত অফিসার আজিমপুর নিয়ে গিয়ে নিজেদের খরচ ও ব্যবস্থাপনায় লাশ দাফনের অনুমতি দিলেন। সশস্ত্র আর্মির একটি দল পরিবেষ্টিত অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আমরা গেলাম আজিমপুর। এর আগেই বাড়ির এবং প্রতিবেশীর গৃহকর্মীদের পাঠিয়ে মাত্র দু’মাস আগে শায়িত বাবার কবরের পাশেই নতুন কবর প্রস্তুত করা হয়েছিল। সেখানেই আমরা বিনম্র উচ্চারণে পবিত্র কোরআন পাঠের সঙ্গে প্রাণহীন কর্নেল হাইকে চিরনিদ্রায় শায়িত করলাম। কফিন খুলে শেষবারের মতো দেখে নিলাম শহীদ সৈয়দ কর্নেল হাইয়ের শায়িত অবয়ব। উপস্থিত কমসংখ্যক লোকজনই নীরব প্রার্থনায় শ্রদ্ধা ও প্রীতিতে মাটি ও বালু ছড়িয়ে ছিটিয়ে কবরকে আবৃত করল।

হৃদয়ের মর্মস্থলে আমরা অনুভব করলাম আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেছে।

লেখক : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত