গুঞ্জন সত্যি করে অবশেষে জার্মানি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফবি) তাদের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বেছে নিয়েছে ইয়ুর্গেন ক্লপকে। দীর্ঘ দুই বছরের বিরতি ভেঙে কোচিং ডাগআউটে ফিরছেন জনপ্রিয় এই জার্মান ট্যাকটিশিয়ান, আর চুক্তির মেয়াদ রাখা হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
রেড বুল গ্রুপের গ্লোবাল হেড অব সকার হিসেবে সফল দায়িত্ব পালন শেষে চার বছরের এই চুক্তির আওতায় ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত জার্মানির জাতীয় দলকে পথ দেখাবেন তিনি।
লিভারপুল ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের মতো ক্লাব ফুটবলে ইতিহাস গড়া ক্লপের জন্য জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়া এটিই প্রথম অভিজ্ঞতা। নতুন এই চ্যালেঞ্জ কাঁধে নেওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ক্লপ বলেন, ‘জাতীয় দল যেভাবে আমাদের দেশের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে, তা অন্য কিছু দিয়ে সম্ভব নয়। এই বিশেষ বিষয়টিই আমার কাছে এই কাজটিকে এত বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।’
রেড বুল অধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি আরও যোগ করেন, ‘গত দেড় বছরে রেড বুল পরিবারে যা কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং শিখেছি, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি এই চুক্তিটি সহজ করার জন্য তাদের উদার মানসিকতাকেও ধন্যবাদ জানাই। এখন জার্মান ফুটবলের এই অনন্য দায়িত্ব পালনের জন্য আমি মুখিয়ে আছি। ধৈর্য ও বিনয়ের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে একটি দল গড়ে তুলতে চাই, যে দল মাঠে একে অপরের জন্য লড়বে, ফুটবল উপভোগ করবে এবং যার পেছনে আমাদের দেশের মানুষ সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে।’
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই নিজের কড়া মেজাজ ও স্পষ্টভাষী রূপ দেখিয়েছেন এই জার্মান কোচ। পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষায় কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি সহ্য করবেন না জানিয়ে তিনি সরাসরি পদত্যাগের হুংকার দিয়ে বলেন, ‘যদি আপনারা খারাপ আচরণ করেন এবং আমার পরিবারকে শান্তিতে থাকতে না দেন, তবে আমি চলে যাব, আমি কেবল মুখ ফিরিয়ে নেব। আমি জানি এমন কিছু দেশ আছে যেখানে জাতীয় দলের কোচদের আরও খারাপভাবে মূল্যায়ন করা হয়। আমি এই কাজটিকে ভালোবাসি, তবে প্রয়োজনে সবসময়ই আমি দায়িত্ব ছাড়তে প্রস্তুত।’
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে ক্লপ বলেন, ‘জাতীয় দলের পর ইয়ুর্গেন ক্লপের আর কোনো 'ক্যারিয়ার' থাকবে না। এটিই আমার কোচিং ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত এবং সর্বোচ্চ বিন্দু। আমি আমার সবকিছু উজাড় করে দেব।’
দলের এই বড় পরিবর্তনের পেছনের ভাবনার কথা ও ক্লপকেই ড্রিম চয়েস জানিয়ে ডিএফবি সভাপতি বার্নড নিউয়েনডর্ফ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গভীর আলোচনা হয়েছে। শুরু থেকেই তিনিই ছিলেন আমাদের আদর্শ পছন্দ বা ‘ড্রিম সলিউশন’। ডিএফবির প্রতিটি কোণ থেকে সর্বসম্মতভাবে বলা হয়েছিল যে, আমাদের একমাত্র তার সঙ্গেই কথা বলা উচিত। ইয়ুর্গেনের সঙ্গে আলোচনা আমাদের সেই বিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে যে, সঠিক সময়ে তিনিই হলেন সঠিক মানুষ।’
২০১৪ সালে ব্রাজিলে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকেই বৈশ্বিক আসরে হতাশার সময় পার করছে জার্মানি। ২০১৮ ও ২০২২ সালের টানা দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর চলতি বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল জার্মান ডাগআউটে জুলিয়ান নাগলসম্যান অধ্যায়ের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই এই দীর্ঘ খরা কাটিয়ে দলকে ফের বিশ্ব ফুটবলের অভিজাত সারিতে নিয়ে আসাই এখন ক্লপের প্রধান লক্ষ্য।
কোচিং স্টাফ হিসেবে ক্লপের সঙ্গে থাকছেন তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকর্মী পেটার ক্রাভিয়েটজ, পেপ লিইন্ডার্স এবং জার্মানির সাবেক তারকা ফুটবলার সভেন বেন্ডার। শুধু কোচ বদলই নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনেও হাত দিয়েছে ডিএফবি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সাবেক রক্ষণভাগের স্তম্ভ পার মারতেসাকারকে নতুন ম্যানেজিং ডিরেক্টর অব স্পোর্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন এই পরিমণ্ডলে ক্লপ ও মারতেসাকারের হাত ধরে জার্মান ফুটবল জার্মানিকে আবারও সোনালী দিনে ফিরিয়ে নিতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।
সমালোচকদের একহাত নেইমারের, 'নিজের চরকায় তেল দাও'