চলতি বছরের মাঝামাঝি শুরু হওয়া রাজনৈতিক উত্তাপ নতুন বছরে দেশে বড় ধরনের সংঘাত-সংঘর্ষে মোড় নেবে, সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন দুশ্চিন্তা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, দেশের শান্তি বিঘ্নিত করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। সহিংসতা ও নাশকতার আশ্রয় নিয়ে বিএনপিকে মাঠে থাকতে দেওয়া হবে না। তাই সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনার কোনো কারণ নেই। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলার জন্য তারা নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখন দুটি কৌশল নিয়ে মাঠে নামবেন তারা। এসব কৌশলের একটি হলো বিএনপির কর্মসূচিকে সহিংসতা ও নাশকতার কর্মসূচি হিসেবে দেখানো হবে। বিএনপির কর্মসূচি ঘোষণা করার ভেতরের মানেই সহিংসতা ও নাশকতা তা প্রমাণ করতে তাদের কর্মসূচিতে সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা তুলে ধরে সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেবেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা। আরেকটি কৌশল হলো, বিএনপির রাজপথের কর্মসূচিগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে অনুমতির প্রয়োজন পড়ে সেটাকে কাজে লাগিয়ে কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরা।
এ দুটি কৌশলের বাইরে পুরনো কৌশলও কাজে লাগানো হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। তারা বলছেন, সে কৌশলটি হলো বছরের শেষদিকে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে যেসব পুরনো মামলা রয়েছে দ্রুত তার বিচার সম্পন্ন করা ও সেসব মামলায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির অতীত রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের টার্গেট কর্মসূচির নামে নাশকতা ও সহিংসতা সৃষ্টি করে সুফল আদায় করা।’ তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কর্মসূচিতে যেসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে কোনোটিতেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দায়ী করা যাবে না। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে প্রত্যেক ঘটনাই তাদের উসকানির ফল।
ফারুক খান বলেন, বিএনপির চেষ্টা দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করা, আওয়ামী লীগের চেষ্টা দেশের প্রত্যেক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও জানমাল রক্ষা করা।
গত আগস্ট মাসে বিএনপি লোডশেডিংসহ নানা ঘটনার প্রতিবাদে ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি দিয়ে আসছে। ওই মাসেই বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে, যা চলতি মাসেও দেখা গেছে। এসব সহিংসতায় বিএনপির পাঁচ কর্মী নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
বিএনপি বর্তমানে রাজধানীর ১৬টি স্থানে কর্মসূচি পালন করছে। আগের কর্মসূচিগুলোতে নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় চলমান এ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সম্প্রতি বিএনপির কর্মীদের লাঠির মাথায় জাতীয় পতাকা হাতে কর্মসূচিতে আসতে দেখা যাচ্ছে। রায়েরবাজারের সমাবেশ কর্মসূচি পালনের সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এর আর কোনো কর্মসূচিতে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
লাঠি হাতে বিএনপির কর্মীদের কর্মসূচিতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা আত্মরক্ষার জন্য এ উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলিশের বিরুদ্ধেও দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ আছে বিএনপির।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতারা এর সমালোচনা করে সহিংসতা ঘটানোর অভিযোগ তুলেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, কর্মসূচিতে লাঠি কিংবা দেশীয় অস্ত্র বহন করা যাবে না। আত্মরক্ষা বা নিরাপত্তা কোনো কিছুর জন্যই এটা করা যাবে না। এটা পুলিশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
এদিকে বিএনপি নতুন বিভাগীয় শহরে সমাবেশ এবং এসব সমাবেশ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে। ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি শেষ করার কথা। কিন্তু বিএনপির কথিত আত্মরক্ষার কৌশল এবং আওয়ামী লীগের পাল্টা কৌশল আগামী দিনগুলোতে রাজনীতির মাঠকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি মাঠে থাকলে আওয়ামী লীগ কি ঘরে থাকবে? আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীও মাঠে নেমে যাবে। কর্মসূচির নামে কোনো দল জনগণের শান্তি বিনষ্ট করবে আর তা প্রতিহত করতে আওয়ামী লীগ মাঠে থাকবে এটা প্রতিষ্ঠিত করবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।
সরকারি দলের ওই নীতিনির্ধারকরা আরও বলেন, বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হবে না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে, তা পুঁজি করে মাঠে নেমেছে বিএনপি এটা আমরা বুঝি। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনাকে সুযোগ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দলীয় সভাপতির সেই নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেও বিএনপি সেই নির্দেশনার অপব্যবহার করছে। ওই দলটি কর্মসূচি ঘোষণা করে আর সহিংসতা-নাশকতার প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লী ও সম্পাদকমন্ডলীর একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পায়ে পড়ে কারও ঝগড়া করার মানসিকতা থাকলে বিনা বাধায় ছেড়ে দেওয়া কি সম্ভব? কর্মসূচির নামে অশান্তি সৃষ্টি করা, সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া এসব ঘরে বসে দেখা বা সহ্য করা অসম্ভব। বিএনপির কর্মসূচি ঘিরে যত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে তার সবই উসকানির ফলে হয়েছে।
ওই নেতারা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মানে এ নয় যে, বিএনপি সহিংসতা-সংঘাত চালিয়ে যাবে, অন্যরা নীরবে সহ্য করে যাবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না তেমনটাও নয়।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সারা দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। জেলা-উপজেলা-থানা ও ওয়ার্ড, ইউনিয়ন পর্যন্ত সম্মেলন করা হচ্ছে। সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে আমরা আগে থেকেই মাঠে রয়েছি। সামনে জাতীয় নির্বাচন ফলে সভা-সমাবেশও আরও বেড়ে যাবে।’ তিনি বলেন, বিএনপি যত বেশি কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে সরব উপস্থিতি দেখাবে আওয়ামী লীগ তারও কয়েকগুণ বেশি কর্মসূচি দিয়ে রাজপথ দখলে রাখবে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সহিংসতা চালিয়ে যাবে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে না এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে পারে না। তারা নাশকতা-সহিংসতা সৃষ্টি করে সুবিধা নিতে চাইবে, সরকার ও আওয়ামী লীগ চুপচাপ দেখে যাবে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীকে মাঠে থেকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করার নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। পাশাপাশি কর্মসূচির নামে শান্তি বিনষ্ট করতে চাইলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশনাও আছে। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে বিএনপির নাশকতার প্রতিরোধ করতে গেলে কিছু সংঘাত-সংঘর্ষ ঘটবে, এটা দেশের মানুষ মেনেও নেবে। অনাকাক্সিক্ষত সেসব ঘটনা ঘটলেও সেদিকটার প্রতি আপাতত নজর দিতে চায় না ক্ষমতাসীনরা। তাতে মিডিয়া ও তথাকথিত সুশীল সমাজের কিছু সমালোচনার দায় নিতেও প্রস্তুত রয়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা লক্ষ রাখছি বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির আড়ালে সহিংসতা ও নাশকতা সৃষ্টি করতে না পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকবে ব্যাপারটা তেমন নয়। আমরা প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে আগ্রহী। তবে সহিংসতা ও নাশকতা করলে এর যথাযথ জবাব দেওয়া হবে।’
