আলথুসার : রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝতে চাওয়ার জটিলতায় নাগরিক|205478|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০
আলথুসার : রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝতে চাওয়ার জটিলতায় নাগরিক
এহ্সান মাহমুদ

আলথুসার : রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝতে চাওয়ার জটিলতায় নাগরিক

মার্ক্সবাদী দার্শনিক লুই আলথুসার ১৯১৮ সালে আলজেরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। যিনি ‘দমন পীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র’ তত্ত্বের জনক। পড়াশোনা করেন ফ্রান্সের প্যারিসে। পেশাগত জীবনে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। প্রায় ৩৫ বছর তিনি শিক্ষকতা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বেশ কিছুদিন জার্মানদের ক্যাম্পে বন্দি ছিলেন। সে সময় তিনি কমিউনিস্টদের সাহচর্যে আসেন এবং বেশ প্রভাবিত হন। পরবর্তী সময়ে আলথুসার ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। তবুও তিনি স্বভাবসুলভ সমালোচক ছিলেন পার্টির। তাই অল্প সময়েই তিনি দলের মধ্যে ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে পরিচিতি পান। মার্ক্সবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে আক্রমণ করেছিলেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। জীবনের একটি পর্যায়ে গিয়ে আলথুসার মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ মনে করেন দীর্ঘদিন জার্মান বন্দি শিবিরে আটক ও নির্যাতনের ফলে এমনটা হয়েছিল। ১৯৮০ সালে তার বিরুদ্ধে নিজের স্ত্রীকে বালিশচাপা দিয়ে খুন করার অভিযোগ ওঠে। তবে আলথুসার দাবি করেছিলেন তার স্ত্রীর ইচ্ছাতেই অসুস্থতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তিনি এমনটা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত খুনের দায়ে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। তবে ‘উন্মাদনার’ কারণে বিচারের অযোগ্য বিবেচিত হয়ে তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে দিনাতিপাত করতে হয়। ১৯৯০ সালে তিনি মারা যান। 

এই দার্শনিক লুই আলথুসারের নাম অনুসারে ‘আলথুসার’ শিরোনামে উপন্যাসটি লিখেছেন মাসরুর আরেফিন। উপন্যাসের শুরু লন্ডনের বেকনট্রি স্টেশনে। যেখানে গল্পকথক লেখক একজন ব্যাংকার, লেখকের শ্যালিকা ফারজানা এবং তার স্বামী জোসেফের ট্রেনযাত্রা দিয়ে শুরু হয় উপন্যাসটি। তাদের গন্তব্য অক্সফোর্ড সার্কাস স্টেশন হয়ে লন্ডনের হারলি স্ট্রিটের একটি বাড়ি। যেখানে আলথুসার একসময় বসবাস করতেন। 

দার্শনিক আলথুসার বলেছেন, রাষ্ট্র দুই ভাবে তার নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করে‘রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাস (নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র)’ এবং ‘আইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস (আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র)’ দিয়ে। অন্যদিকে আলথুসার উপন্যাসের লেখক মাসরুর আরেফিন রাষ্ট্রের টিকে থাকার পদ্ধতি এবং তার উৎসগুলো চিহ্নিত করতে গিয়ে ক্ষমতার কাঠামো, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক বেশ কিছু চরিত্রের মধ্য দিয়ে এঁকেছেন।  

আলথুসার উপন্যাসের নায়ক লুই আলথুসারের লন্ডনের বাড়ি দেখতে  গিয়ে পথিমধ্যে হাজির হন অক্সফোর্ড স্ট্রিটে। সময়টা ২০১৯ সালের এপ্রিল। তখন সেখানে চলছে পরিবেশবাদী দল ‘এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন’-এর আন্দোলন। তাদের প্রতীকী ‘পিংক বোট’ শহরের রাস্তায়। আন্দোলনকারীরা বলছেন, এই নিপীড়নবাদী পৃথিবী বদলাতে হবে। নইলে আগামী বারো বছরেই ধ্বংস হবে এই পৃথিবী। সেখানে গিয়ে উপন্যাসের নায়ক গাছের ছবি তোলার কারণে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হন। পরে ব্যাপক জিজ্ঞাসার মুখে ছাড়া পেলেও নজরদারির মধ্যেই থাকতে হয় তাকে। পুলিশকে বলা কথা তাদের বিশ্বাস হয় না। তারা লন্ডনের রাস্তায় একজন এশিয়ান-মুসলিমের কথায় আস্থা আনতে পারেন না। তখন দৃশ্যপটে হাজির হয় দুই আফগান ও এক আইরিশ অধ্যাপক এবং এক ‘রেবেলিয়ন কর্মী’ ছাত্রী। লেখক তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে চেষ্টা করেন লন্ডনের আন্দোলনকারীরা ঠিক কাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। আর কেনই বা আন্দোলন করছেন? উপন্যাসের এই নায়ক বুঝতে চেষ্টা করেন, এই আন্দোলনকারীরা কী চাইছেনপৃথিবীর ভালো নাকি ক্ষমতা?

আমরা যখন দেখি ‘আলথুসার’ উপন্যাসের নায়ক যাকে আমরা গল্পকথক হিসেবে পাই তিনি মিশেল ফুকোর ‘পারহেসিয়া’ ধারণাটি নিয়েও চিন্তা করেন‘‘গ্রিক শব্দ ‘পারহেসিয়া’ বলতে বোঝায়কোনো বক্তা যখন সত্যের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক কী তা বিবৃত করেন এবং সত্যকথনকে দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করে তার নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেন.... মিথ্যা বলা বা নীরব থাকার বদলে সত্য বলাকে, তার জীবন ও জীবনের নিরাপত্তার বদলে মৃত্যুর ঝুঁকিকে...নিজের স্বার্থ ও নৈতিক উদাসীনতার বদলে তার নৈতিক কর্তব্যকে’’।

এভাবে উপন্যাসের নায়ক যিনি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, ‘পারহেসিয়া’ থেকে সিদ্ধান্ত নেন তিনিও ‘এক্সটিংকশন রেবেলিয়ন’-এর সদস্য হবেন। পাশাপাশি ব্যাংকের চাকরিটি ছেড়ে দেবেন এবং তার জন্মভূমি বরিশালের এবং তার প্রিয় কবি জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি নদীকে তিনি বাঁচাবেন। এভাবে আন্দোলনের কর্মী হওয়ার স্বপ্ন বুনতে থাকেন নায়ক। উপন্যাসের এই অংশে লেখক কবি জীবনানন্দ দাশকে খুঁজতে থাকেন ধানসিঁড়ি নদীর তীরে। উপন্যাসের এখানে এসে লেখকের বর্ণনায় উঠে আসে কলকাতার রাস্তায় কবি জীবনানন্দ’র ট্রাম দুর্ঘটনার করুণ চিত্র। এখানে ধানসিঁড়ি খুঁজতে গিয়ে কলকাতায় কবির ট্রাম দুর্ঘটনার আবেগমথিত বর্ণনাটি শেষ পর্যন্ত আরোপিত বলেই মনে হয়।

উপন্যাসের এক পর্যায়ে আমরা দেখতে পাই নিজের জন্মভূমির প্রতি দায় থেকে লেখক দেশে ফেরেন। তখন নিজের স্ত্রীকে তার ব্যাংকিং চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটা বোঝাতে ব্যর্থ হন। এই সময়ে নায়কের স্ত্রী বুঝতে পারেন তার স্বামীর প্রিয় বিষয় আলথুসার। যেই আলথুসার তার স্ত্রীকে বালিশচাপা দিয়েছিলেন, সেই ভয়ে লেখকের স্ত্রী একসময় বাবার বাড়ি চলে যান। 

‘আলথুসার’ উপন্যাসটিতে বর্তমান আধুনিক বিশ্বের একজন নাগরিকের একধরনের জীবনভ্রমণের চিত্রও পাওয়া যায়। যেখানে দেখা মিলবে করপোরেট সংস্কৃতি, চাকরিজীবী ও চাকরিদাতার। এই করপোরেট ও পুঁজিবাদী মানসিকতার বর্ণনা মাসরুর আরেফিনের দক্ষতায় উঠে এসেছে নিপুণ এবং বিশ্বস্ত হয়ে। যখন আমরা পড়ি ‘‘তো, এই তুমি করছ তাহলে লন্ডনে এসে? নিজের বাবা-মাকে বিহারের ধানবাদে কি ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে ফেলে রেখে এই তোমার লন্ডনের চাকরি, বসের পরিবার নিয়ে হাইড পার্কে প্রিন্সেস ডায়ানা মেমোরিয়াল ফাউন্টেন দেখতে আসা? ভালোই জীবনে উন্নতি হবে তোমার খোকা, তুমি চালিয়ে যাও এবং অবশ্যই বসের জুতোর মাপটা জীবনভর মনে রেখো।” তখন পাঠক হিসেবে লেখক মাসরুর আরেফিনের প্রতি আস্থা জোরালো হয়।

আবার ‘ধানসিঁড়ি বাঁচাও’ আন্দোলন নিয়ে কাজ শুরু হলে স্থানীয় এক সংসদ সদস্য বিরূপ হলেন। তিনি নায়ককে শাসালেন। সরকারি এক সচিবের সঙ্গে মিটিং করতে গেলে তিনি লেখককে দোষারোপ করতে থাকলেন এই বলে  যে, সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছে, পরিবেশের নামে লেখক আসলে উন্নয়নের বিরোধিতা করছেন। পরিবেশ নিয়ে দেশের কোনো সমস্যা আছে বা হতে পারে তা তিনি মানতে চাইছেন না। নায়ক যেই সত্যটি ধরে নিয়ে এগোতে চান, দেখা গেল সেটিই তাকে একা করে ফেলেছে আর সবার থেকে। উপন্যাসের নায়ক থাকেন নিজের ‘পারহেসিয়া’ নিয়ে।

উপন্যাস : আলথুসার, লেখক : মাসরুর আরেফিন, প্রচ্ছদ : সেলিম আহমেদ, প্রকাশক : প্রথমা, মূল্য : ৬৫০ টাকা

বই সমালোচক

সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক