বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইয়ে ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত ড্র নিয়ে ফিরেছে বাংলাদেশ। ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে লাল-সবুজের দলের গোলটি এসেছে সাদ উদ্দিনের পা থেকে। চারদিকে দেশের ফুটবলের সঙ্গে সিলেটী তরুণকে নিয়ে আলাদা উন্মাদনা। কলকাতা থেকে ফেরার একদিন পর দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হলেন দেশের ফুটবলের নতুন সেনসেশন। সাক্ষাৎকারে ২১ বছর বয়সী তরুণ খুলে দিলেন মনের দুয়ার। আজ পড়ুন প্রথম পর্ব
প্রশ্ন: ভারতের বিপক্ষে গোলটি কি সাদ উদ্দিনের জীবন বদলে দিল? চারদিকে সাদকে নিয়ে আলাদা উন্মাদনা...
সাদ উদ্দিন: সত্যি বলতে এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। আমি এর জন্য সবাইকে কৃতিত্ব দেব। সফলতা আসলে কখনো সহজে আসে না। সবাই চেষ্টা করেছে। টিমে যারা ছিল, সবাই খুব ভালো খেলেছে। মাঠের এগারোজন শুধু না, স্কোয়াডের সবাই, টিম ম্যানেজমেন্ট...। সবাই পরিশ্রম করছে বলেই আমাদের এই সফলতা এসেছে। আর গোলের বিষয়টা যদি বলেন- ওই ম্যাচে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল কিছু একটা করব। সেটা করতে পেরেছি বলে অনেক আনন্দিত।
প্রশ্ন: বিখ্যাত সল্ট লেক স্টেডিয়ামের ভরা গ্যালারি ছিল ভারতের পক্ষে। অমন একটা পরিবেশে এভাবে পারফর্ম করা কতটা সহজ ছিল?
সাদ উদ্দিন: আসলে খেলার আগে ওখানকার দর্শকেরা চাপ হবে বলে আলোচনা হচ্ছিল। আমরা কিন্তু মোটেও চাপ অনুভব করিনি। শুধু আমি না, আমাদের দলের কেউই চাপে ছিল না। কোচও বলে দিয়েছিলেন অনেক ক্রাউড থাকবে, তোমরা কেউ নার্ভাস হবে না। সত্যি বলতে ওই পরিবেশে আমরা ম্যাচটা আরো উপভোগ করেছি।
প্রশ্ন: শুরুতেই বাংলাদেশ আক্রমণে গেছে। পেনাল্টিও তো পেতে পারত। তবে পরের দিকে বেশ কিছু গোল মিস হচ্ছিল। ভারতও আক্রমণ বাড়াতে থাকে। কিছুটা চাপ কি তখন অনুভব হয়নি তখন?
সাদ উদ্দিন: প্রথমার্ধেও আমরা ভালো সুযোগ পেয়েছিলাম। জীবন ভাই (নাবিব নেওয়াজ জীবন) একটা মিস করল...। আসলে তখন একটু চাপের মুখে ছিলাম আমরা। প্রথমার্ধের শেষ দিকে গিয়ে আমি গোলটা করি। তখন আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধেও সুযোগ পাচ্ছিলাম আমরা, কিন্তু মিস হয়েছে। আসলে এমন বিগ ম্যাচে সুযোগ কম আসবে। যে সুযোগগুলো আসবে, সেগুলোই কাজে লাগাতে হবে। আমরা যদি সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারতাম, তবে ৩-৪ গোলেও পেয়ে যেতে পারতাম। দুর্ভাগ্য যে আমরা শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে ফেলেছি। এমন ম্যাচে যেই সুযোগ পাবে তা কাজে লাগাতে হবে।
প্রশ্ন: তারপরও দারুণ লড়াই করে এই ড্রয়েই সবার মন জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ...।
সাদ উদ্দিন: আসলে ম্যাচ পর থেকেই চার দিক থেকেই অভিনন্দন পাচ্ছি। শুধু আমার কথা বলব না, টিমের সব খেলোয়াড়ই। সবাই উইশ করছে। সত্যি কথা এখন সবার প্রত্যাশাটা বেড়ে গেছে। আর আমাদের ২৩ জন খেলোয়াড়ের দায়িত্বটাও অনেক বেড়ে গেছে। দেশের মানুষ অনেক খুশি। আমরা খেলোয়াড়রাও দেশের মানুষকে ভালো কিছু দিতে চাই। আমাদের পরবর্তী ম্যাচ ওমানের বিপক্ষে (১৪ নভেম্বর)। এখন আমরা সেই ম্যাচ নিয়ে তৈরি হতে চাই।
প্রশ্ন: ভারতের অনেক বিখ্যাত পত্রিকা আপনাকে নিয়ে বিশেষ নিউজ করেছে। এই ভালো লাগাটা কেমন?
সাদ উদ্দিন: ম্যাচের পরই ভারতের অনেক মিডিয়া আমার সঙ্গে কথা বলেছে। অনেক পজিটিভ কথা বলেছে তারা, অনেক নিউজও করেছে। সেগুলোর লিংকও আমাকে পাঠিয়েছে। এটা সত্যিই একটা মোমেন্ট।
প্রশ্ন: কিন্তু খেলার আগে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে অন্য ধনের নিউজও তো হয়েছে....
সাদ উদ্দিন: হ্যাঁ, আমি নিজে দেখিনি। তবে খেলার আগে আমিও শুনেছি এমন। বিশেষ করে ওদের কোনো এক সাবেক খেলোয়াড় বলেছেন, বাংলাদেশকে হেসেখেলে হারাবে ভারত। এটা আমাদের খেলোয়াড়রা অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে জেদ হিসেবে নিয়েছে। আমি নিজে জেদ হিসেবে নিয়েছি। কারণ এটা অনেক অপমানের বিষয়। জেদ ছিল মাঠে প্রমাণ করার। সেটা আমরা পেরেছি।
প্রশ্ন: কিন্তু শেষ মুহূর্তে গোল হজম করাটা কি এখন পোড়াচ্ছে না?
সাদ উদ্দিন: এটা সত্যিই অনেক খারাপ লাগার ব্যাপার। এমন সময় আমরা গোলটা হজম করলাম...। ওরা শেষ দিকে অনেক চাপ তৈরি করেছে আমাদের ওপর। যে কোনো মুহূর্তে গোল খেয়ে যেতে পারতাম আমরা। দুর্ভাগ্য বলব, আর হয়তো একটু অসতর্কতাও ছিল।
প্রশ্ন: জাতীয় দলের ফরোয়ার্ড লাইন নিয়ে অনেক দিন ধরেই হাহাকার আছে সবার মধ্যে। আপনি সেই হাহাকার ঘুচাবেন, এই বিশ্বাস রাখেন?
সাদ উদ্দিন: ফরোয়ার্ড লাইনে সমস্যা শুধু এখন না, আগেও ছিল। আসলে এটা কিন্তু সত্যি যে ফরোয়ার্ড লাইনে আমাদের খেলোয়াড়রা খুব বেশি সুযোগ পায় না। বেশির ভাগই উইংয়ে খেলে। এটার প্রভাব কিন্তু জাতীয় দলে পড়ছে। এটা ওভারকাম করতে সময় লাগবে। ধীরে ধীরে এটা ঠিক হয়ে যাবে আশা করি। আর আমি সব সময় আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে যাব।
প্রশ্ন: মাঝে বেশ কিছুটা খারাপ সময় গেছে দেশের ফুটবলে। সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র কিছুটা বদলেছে। যেখানে দলের তরুণ ফুটবলাররা অনেক বড় চালিকাশক্তি। এই তারুণ্যদীপ্ত বাংলাদেশ কত দূর যাবে?
সাদ উদ্দিন: এই দলে আমাদের ৮০ ভাগ খেলোয়াড়ই নতুন। এরা কিন্তু আরো ৮-১০ বছর জাতীয় দলে খেলতে পারবে। যদি সবাই ঠিকমতো নিজেদের ধরে রাখে। আমাদের সবার আসলে অনেক কিছু দেওয়ার আছে দেশকে। আমি মনে করি এই দলটা যদি থাকে আরো ৮-১০ বছর, তবে দেশের ফুটবলকে অনেক কিছু দিতে পারব। কারণ সবাই খুব জেদি। সবাই দেশের জন্য কিছু করতে চায়।
প্রশ্ন: ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচটাকেই কি আপনি নিজের সেরা ম্যাচ বলবেন?
সাদ উদ্দিন: আসলে বেশ কিছু ম্যাচই আছে। আবাহনীর হয়ে এএফসি কাপে আমার ভালো কিছু মোমেন্ট আছে। আমার টার্নিং পয়েন্ট ছিল ২০১৫ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। সেখানে সেমিফাইনালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি আমার ছিল। ফাইনালে শেষ পেনাল্টি আমার নেওয়া। যেটাই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে দেয়। আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাই। আবাহনীর হয়ে এএফসি কাপে বেঙ্গালুরু এসসির বিপক্ষে গোল আছে আমার। তাই ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচটাকে অনেক বড় অর্জন বলব। তবে সামনে সেরা আরো আসবে ইনশা আল্লাহ। তাই সবচেয়ে সেরা বলব না এখনই (হাসি)।
