শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক সবাই উৎকণ্ঠিত, কী আছে নতুন কারিকুলামে? বই বলতে কিছুই নাকি নেই, কীভাবে ডিমভাজি করতে হয় তা নাকি শেখানো হবে শ্রেণিকক্ষে? আমাদের সন্তানরা কি তবে ডিম ভাজনেওয়ালা-ই হবে? এমন অনেক উদ্বেগভরা প্রশ্ন অভিভাবকদের মনে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই। দুশ্চিন্তা দূর করতে নতুন কারিকুলাম নিয়ে লিখেছেন সুবর্ণা গোস্বামী
কল্পনা করুন একটা ক্লাসরুম। যেখানে সব ছাত্রছাত্রী রোবটের মতো বসে আছে। শিক্ষক বোর্ডে আর্কিমিডিসের সূত্র বোঝাচ্ছেন। সামনে কজন শুনতে পেলেও ৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পেছনে যারা আছে তারা বিশেষ একটা শুনতে পারছে না। ফলে অনেকেই নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।
অন্য একটা ক্লাসরুমে তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কয়েকটা দলে ভাগ করে দিলেন। সবাইকে কাগজের নৌকা বানাতে বললেন। তারপর ক্লাসরুমের কোনায় রাখা বালতির ভেতর নৌকাটা ভাসাতে বললেন। তারপর একটা ভারী কিছু নৌকার ওপরে রেখে দেখতে বললেন। নৌকা স্বাভাবিকভাবেই ভারী কিছু দেওয়াতে ডুবে গেল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ঘটনার কারণ খুঁজে আনতে বললেন।
শিক্ষার্থী বিভিন্ন বই খুঁজে ঘটনার ময়নাতদন্ত করে ফেলল।
এবার বলুন কোন ক্লাসটিকে আপনি সফল বলবেন?
আমি শিক্ষার পুরনো এবং নতুন কারিকুলামের তুলনামূলক একটা ছবি পাশাপাশি দেখাতে চেয়েছি। প্রশ্নের উত্তরটা আশা করছি খুঁজবেন।
সেদিন ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের বেঞ্চের আঁকিবুঁকিতে চোখ গেল। লেখা আছে, শিক্ষা জাতির মৃত্যুদ-। এটা কোনো মজা নয়, আসলে আমাদের সৃজনশীল পদ্ধতির প্রজন্ম কিন্তু এভাবেই ভাবছে।
নামে সৃজনশীল বলা হলেও তাদের কাঁধে একগাদা বই চাপিয়ে কিছু তথ্য আমরা মুখস্থ করাচ্ছি। তাদের কেউ খাচ্ছে, কেউ বমি করছে আবার কেউ জাবর কাটছে।
থ্রি ইডিয়টস দেখে আমির খানের হাওয়া লেগে আপনারা তো বলেই ফেললেন শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। কিন্তু যখন পরিবর্তন এলো তখন বললেন, এ কেমন কথা! বাচ্চা কুপি জ্বালিয়ে দুলে দুলে পড়া মুখস্থ না করে কাগজের ফুল বানাচ্ছে এ তো হতে দেওয়া যায় না। গরুর কাজ হবে ঘাস খাওয়া সে ঘাস কাটতে যাবে কেন?
আমিও একজন অভিভাবক। আমার সন্তান নতুন কারিকুলামে পড়ছে। শুরুতে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, কী শিখবে! কিন্তু ধীরে ধীরে যখন দেখলাম সে বিতর্ক করছে, জানার প্রবল ইচ্ছা নিয়ে আমাকে বা আশপাশের সবাইকে প্রশ্ন করছে, রান্না শেখার আগ্রহ দেখাচ্ছে, সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকছে, ক্রাফটিং করছে এবং পাশাপাশি কোনো বিষয়ের গভীরে গিয়ে তার কারণ খুঁজছে আর সেটা আমার কোনো প্রকার চাপ ছাড়াই তখন মনে হয়েছে আমি এটাই চেয়েছিলাম।
মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও অভিভাবকদের আশঙ্কার শেষ নেই। আমরা আসলে সেটাই ভয় পাই, যা জানি না। আমি শিক্ষক হিসেবে যেটুকু জানতে পেরেছি সহজ কথায় তার দু-চারটি কথা জানাতে চাই।
নতুন শিক্ষাক্রমে বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের যোগ্যতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে। যেমন ইতিহাস ও সামাজিকবিজ্ঞান বিষয়ে আয়োজন করতে বলা হয়েছে সংস্কৃতি মেলা। সেখানে শিক্ষার্থীরা মেলার উপকরণ যখন সংগ্রহ করছে নিজের হাতে তখন সেগুলোর নাম কি তার মুখস্থ করা জরুরি? তারা শিখছে কীভাবে একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হয়, কাকে নিমন্ত্রণ করবে, কীভাবে করবে, অনুষ্ঠান সাজাতে কী কী লাগবে সবকিছু তারা নিজেরা করছে। পুরো একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ট্রেনিং। হয়তো কেউ বেশি কাজ করছে, কেউ কম কিন্তু টিমওয়ার্ক তো শিখছে। আমাদের পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে এই সবল-দুর্বলের টিমওয়ার্ক কি জরুরি নয়?
বাংলায় ওদের আবৃত্তি, গান করতে বলা হচ্ছে, কোনো বিষয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে বলা হচ্ছে নিজের মতো করে। তারা লিখছেও। আপনি বলুন এই বয়সে আপনি মুখস্থ না করে একটা বাক্যও লিখতে পারতেন?
অন্য বিষয়গুলো যে ব্যতিক্রম নয়, সেটা বলাই বাহুল্য।
এবার আসি খরচের হিসাবে।
ষষ্ঠ শ্রেণির একজন ছাত্র বা ছাত্রীর ভালো ফলাফলের জন্য বাবা-মা প্রাইভেট টিউটরের কাছে ছুটতে থাকেন।
এক হাজার করে প্রতি বিষয় হলেও দু-তিন হাজার কমপক্ষে চলেই যায়। যাতায়াত ভাড়া এসব বাদই দিলাম। এই কারিকুলামে পোস্টার, রঙ এসব কিনতে খরচ হচ্ছে বটে, প্রাইভেট টিউটরের খরচ কিন্তু লাগছে না। তারপরও আমার দাবি, এসব স্কুল থেকে দেওয়া হোক, কারণ সবার অর্থনৈতিক অবস্থা সমান নয়।
এরপর কথা হলো ফলাফলে শিক্ষকের পক্ষপাতিত্ব থাকবে কিনা।
একবার এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বেশ মজা করেই বললেন, আমি দুই ঘণ্টা নিয়ে রোগী দেখতে পারি আবার দুই মিনিটেও।
শিক্ষক যদি তার কাজে ফাঁকি দেন বা পক্ষপাতিত্ব করেন তা খুঁজে বের করা অসম্ভব এটা মনে রাখবেন।
এই পদ্ধতির সফলতা মূলত শিক্ষকের দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে। যেটা পুরনো কারিকুলামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখন যেমন পক্ষপাতিত্ব করে শিক্ষক নম্বর বাড়িয়ে কমিয়ে দিতে পারেন সেটা নতুন কারিকুলামেও সম্ভব। আসলে এই শিক্ষানীতি বিবেকবান মানুষের জন্য। সবাইকে চোর-বাটপার ভাবলে আপনার সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে শিক্ষা নিতে জেলে পাঠান, কাজে লাগবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা, এই কারিকুলামে ফলাফলে নম্বর এবং রোল নম্বর থাকছে না।
এর ফলে অভিভাবকরা ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে তার সন্তানের তুলনা করতে পারছেন না বলে হয়তো কিছু উদ্বিগ্ন। কিন্তু এর ফলে (নম্বর ও রোল নম্বর না থাকা) শিক্ষার্থী নিজে কিন্তু থাকছে চাপমুক্ত। কারণ সমাজ ও পরিবেশ সৃষ্ট অহেতুক চাপটা আর থাকছে না। আশা করি এখন কোনো ছেলে বা মেয়ে খারাপ রেজাল্ট করে পড়শিকে মুখ দেখাতে পারছে না বলে আত্মহত্যা করবে না। আশা করছি, সে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাবে পছন্দের কাজটি করতে পারার আনন্দে। স্কুল হোক আনন্দময়। স্কুল কোনো প্রতিযোগিতার জায়গা নয়। নতুনকে গ্রহণ করতে শেখা উচিত। বদ্ধ জলাশয়ে পচন শুরু হয় আর আবদ্ধ মস্তিষ্ক এক অচলায়তন, এর থেকে কোনো ফসল আসে না।
লেখক : প্রভাষক, গ্লোরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ