দক্ষ মানুষই বড় অবকাঠামো

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৩:৫৭ এএম

একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ খনিজ, গ্যাস, নদী কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়; সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিক্ষিত, দক্ষ ও মানবিক মানুষ। যেসব দেশ জ্ঞান, গবেষণা ও শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছে, তারাই বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্ব দিয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিনল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ার উন্নয়নের গল্প মূলত শিক্ষা বিনিয়োগের গল্প। যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান কিংবা সম্পদহীন সিঙ্গাপুরের উত্থানের পেছনে রয়েছে, মেধাকে সম্পদে রূপান্তরের দূরদর্শী পরিকল্পনা।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত রাষ্ট্রে উত্তরণের স্বপ্ন দেখছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের নানা গল্প আমাদের আশাবাদী করে। প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ কি তৈরি করতে পারছি? আগামীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, বায়োটেকনোলজি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিশ্বে প্রতিযোগিতা করার মতো, শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি কি আমাদের আছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে, শিক্ষা বাজেটের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে সামনে আসে। কারণ শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, শিক্ষা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ; এমন একটি বিনিয়োগ যার সুফল একটি জাতি কয়েক প্রজন্ম ধরে ভোগ করে।  বাংলাদেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারী শিক্ষা বিস্তারে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যার বিচারে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের বৃহৎ শিক্ষা ব্যবস্থাগুলোর একটি। কিন্তু পরিমাণগত অগ্রগতির পাশাপাশি গুণগত উন্নয়ন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার মান, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক দূর এগোতে হবে।

গত এক দশকে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের অঙ্ক ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সেখান থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৫ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য প্রায় ৪৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য প্রায় ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। সংখ্যাগতভাবে এটি ইতিবাচক হলেও দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ এখনো অপর্যাপ্ত মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘিরে ইতিমধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, স্মার্ট বাংলাদেশ, গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে আরও বড় বিনিয়োগের দাবি উঠেছে। শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে অধিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জিডিপির তুলনায় শিক্ষা ব্যয়ের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ৪ শতাংশের কাছাকাছি ব্যয় করে আসছে। নেপালও অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি বরাদ্দ প্রদান করে। ভুটান তার জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে শিক্ষাকে স্থান দিয়েছে।  উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কসহ ইউরোপের অনেক দেশ জিডিপির ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত শিক্ষায় বিনিয়োগ করে। দক্ষিণ কোরিয়া গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রযুক্তি নেতৃত্ব অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যদি আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে অর্থের প্রয়োজন হয়। বিদ্যালয় নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ সম্প্রসারণ, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তি সংযোজন, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, ল্যাবরেটরি স্থাপন, গ্রন্থাগার সমৃদ্ধকরণ, ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ সবকিছুই পর্যাপ্ত অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে এখনো অনেক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানাগার নেই। অনেক কলেজে আধুনিক গবেষণাগার নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো নেই। গ্রন্থাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় বই ও জার্নালের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষায় অধিক বরাদ্দ ছাড়া এসব সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। কোনো শিক্ষাব্যবস্থার মান কখনো তার শিক্ষকদের মানের চেয়ে উন্নত হতে পারে না। বাংলাদেশে এখনো বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট রয়েছে। গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং পেশাগত উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন। একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না; তিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাই শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ শিক্ষক উন্নয়নে ব্যয় হওয়া উচিত।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক রিটার্ন সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও অনেক এলাকায় এখনো শ্রেণিকক্ষ সংকট, শিক্ষক ঘাটতি এবং শিক্ষাসামগ্রীর অভাব রয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওর অঞ্চল, পার্বত্য এলাকা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখনো নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার। এই  বৈষম্য দূর করতে হলে শিক্ষা বাজেট বাড়াতে হবে। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো গবেষণার তুলনায় পরীক্ষানির্ভর শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিশ^মানের বিশ^বিদ্যালয়গুলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি, জ্ঞান ও নতুন উদ্ভাবন সৃষ্টি করে। হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ কিংবা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের মূল ভিত্তি গবেষণা।  বাংলাদেশে গবেষণা খাতে ব্যয় জিডিপির এক শতাংশেরও অনেক নিচে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তহবিল অত্যন্ত সীমিত। ফলে মেধাবী গবেষকরা বিদেশমুখী হচ্ছেন। মেধাপাচার বাড়ছে, উদ্ভাবনের পরিবেশ দুর্বল হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা আজ বেকারত্ব নিরসনের অন্যতম উপায়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর লক্ষাধিক শিক্ষিত তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু তাদের বড় অংশ প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে দক্ষতা ছাড়া শুধু সনদ দিয়ে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রোবোটিক্স, অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি এবং আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় দক্ষ জনশক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট মানবসম্পদ এবং স্মার্ট শিক্ষাব্যবস্থা। প্রতিটি বিদ্যালয়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট, ডিজিটাল ল্যাব, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং, রোবোটিক্স এবং ডেটা লিটারেসিকে শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। এই রূপান্তরের জন্যও প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট। আবার শুধু বাজেট থাকলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন চাই। বড় সমস্যা হলো, বরাদ্দকৃত অর্থের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া।  অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছরের শেষে তড়িঘড়ি করে ব্যয় করা হয়। অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। ব্যয় বৃদ্ধি পায়। কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না। শিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা, প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন, স্বাধীন অডিট, জবাবদিহি বৃদ্ধি, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ, ফলাফলভিত্তিক বাজেট ব্যবস্থাপনা চালু করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। একজন দক্ষ প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক কিংবা উদ্যোক্তা রাষ্ট্রের জন্য হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্পের চেয়েও বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারেন। শিক্ষা মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, উদ্ভাবন সৃষ্টি করে, উদ্যোক্তা তৈরি করে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করে। তাই শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

আগামী বাজেটে কিছু সুপারিশ : ১. শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা, ২. জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া, ৩. গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য পৃথক জাতীয় গবেষণা তহবিল গঠন, ৪. কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ দ্বিগুণ করা, ৫. প্রতিটি বিদ্যালয়ে ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা, ৬. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ বৃদ্ধি,৭. পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ এবং ৮. বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সেতু ও মহাসড়ক দেশের ভৌত দূরত্ব কমায়, কিন্তু শিক্ষা কমায় অজ্ঞতার অন্ধকার। অবকাঠামো অর্থনীতিকে গতিশীল করে, কিন্তু শিক্ষা জাতিকে আলোকিত করে। তাই শিক্ষা খাতে ব্যয়কে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশ যখন উন্নত রাষ্ট্রের পথে যাত্রা করছে, তখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি শিক্ষা বাজেটে অধিক বরাদ্দ, গবেষণায় বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বরাদ্দকৃত অর্থের শতভাগ কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ একটি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো শিক্ষা। শিক্ষিত জাতিই পারে সমৃদ্ধ, মানবিক ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।

লেখক : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত