সাফ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের জন্য আজকের সেমিফাইনাল ম্যাচটি অনেকটাই অলিখিত ফাইনালে রূপ নিয়েছে। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী নেপাল, যাদের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ইতিহাস বাংলাদেশের পক্ষে থাকলেও বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরছে। নানা প্রতিকূলতা, ছন্দহীন পারফরম্যান্স এবং দলের ভেতরের শোকের আবহের মধ্যেও ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে আজ মাঠে নামছেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। গোয়ার পন্ডিত জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হবে ম্যাচটি। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টি স্পোর্টস সরাসরি সম্প্রচার করবে।
বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল গত দুই আসরে নেপালকে হারিয়েই সাফের শিরোপা জিতেছিল। বিশেষ করে ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে দাপুটে জয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাবিনা খাতুনদের উত্তরসূরিরা। সেই স্মৃতি বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও এবারের আসরে দলকে দেখা যাচ্ছে কিছুটা অচেনা রূপে। হ্যাটট্রিক শিরোপার লক্ষ্য নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও মাঠের পারফরম্যান্সে সেই ধারাবাহিকতার ছাপ রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। গ্রুপপর্বে মালদ্বীপকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করলেও ভারতের কাছে ৩-০ গোলে হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিতে হয়েছে। সাত বছর পর ভারতের কাছে পরাজয় বাংলাদেশের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। শুধু ফলই নয়, ম্যাচজুড়ে দলের খেলা ছিল ছন্দহীন ও পরিকল্পনাহীন। আক্রমণভাগে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট, আর মাঝমাঠেও দেখা গেছে সৃজনশীলতার ঘাটতি।
দলের অন্যতম ভরসা আফঈদা খন্দকার, মারিয়া মান্দা ও ঋতুপর্ণা চাকমারা নিজেদের সেরা ছন্দে নেই। বিশেষ করে আক্রমণ গঠনে এবং সুযোগ তৈরিতে তাদের কাছ থেকে যে ধারাবাহিকতা প্রত্যাশিত ছিল, তা এখনো দেখা যায়নি। ফলে কোচিং স্টাফের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনে দলকে আবারও সংগঠিত করা।
এর মধ্যেই বাংলাদেশ শিবিরে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দলের মিডফিল্ডার শিউলি আজিমের মা বাসনা আজিম ভোরে মারা গেছেন। এ সংবাদ পুরো দলকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। সতীর্থরা শিউলির পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং কঠিন এ সময়ে তাকে মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দলের ভেতরে এখন আবেগ ও দায়িত্ববোধ দুইয়ের মিশেল দেখা যাচ্ছে। তবে মায়ের শেষকৃত্যে থাকা হলো না শিউলি আজিমের। কারণ ফ্লাইট জটিলতায় গোয়া থেকে ঢাকা হয়ে ময়মনসিংহে যাওয়া অনেক সময়ের ব্যাপার। তাই মায়ের শেষকৃত্যে থাকতে পারছেন না শিউলি। শুধু তাই নয়, শোকের আবহের মধ্যেই বিকেলে হোটেল লাগোয়া বিচে দলের সঙ্গে হালকা ওয়ার্মআপ করেছেন তিনি।
এদিকে নেপালও গত দুই ফাইনালে হারের প্রতিশোধ নিতে খেলবে। স্বাভাবিকভাবেই তারা বাংলাদেশকে সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে না। অতীতের দুই ফাইনালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ হিসেবেও এ ম্যাচকে দেখছে নেপাল। হিমালয়ের দেশটির কোচ নবীন নিউপানির কথা ‘আমরা প্রস্তুত। গতবারের কিছু ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি এবং এবার ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামব। দল হিসেবে আমরা ইতিবাচক আছি এবং নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।’
বাংলাদেশ নিয়ে তার বক্তব্য ‘বাংলাদেশ খুবই শক্তিশালী দল। সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোতে তারা ভালো করেছে। তাদের বিপক্ষে খেলাটা কঠিন হবে। তবে আমরা নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে চাই।’ লড়াই কঠিন হবে বলেই মানছেন নিউপানি, ‘আমরা ভালো খেলছি এবং আত্মবিশ্বাসী। তবে মাঠের খেলাই শেষ কথা বলবে। বাংলাদেশও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ এবং তারা আমাদের কঠিন লড়াইয়ের মুখে ফেলতে পারে।’ গোর্খালীদের সূত্রে জানা গেছে, মাঝমাঠকে শক্তিশালী করতে মঙ্গলবার ভোরে নেপাল থেকে গোয়ায় উড়িয়ে আনা হয়েছে প্রীতি রাইকে।
সব মিলিয়ে আজকের সেমিফাইনাল ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে। ইতিহাস, প্রতিশোধ, শোক এবং শিরোপার স্বপ্ন সব কিছু মিলিয়ে ম্যাচটি হয়ে উঠেছে সাফ নারী ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। এখন দেখার বিষয়, প্রতিকূলতাকে জয় করে বাংলাদেশ আবারও ফাইনালের মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারে কি না।
মুখোমুখি হওয়ার আগে দুদলের পরিসংখ্যান জেনে নিন। ২০১০ থেকে ’২৪ পর্যন্ত ১৩টি ম্যাচ খেলেছে দুই দল। এর মধ্যে ছয়টিতে নেপাল ও পাঁচটিতে জিতেছে বাংলাদেশ। দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। নেপাল গোল করেছে ১৮টি। অন্যদিকে বাংলাদেশ করেছে ৯টি। তবে এর মধ্যে লাল-সবুজের মেয়েদের বড় সাফল্য ২০২২ সালে সাফের ফাইনালে ৩-১ গোলে এবং ২০২৪ সালের ফাইনালে হিমালয়কন্যাদের ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দুই শিরোপা জয়।
