ভোলা জেলার সদর থানার বাসিন্দা সাগর আবদুল্লাহ (২২)। এটি তার ছদ্মনাম। সাত বছর বয়সে হারিয়েছে বাবাকে। বিধবা মা ও এক বছর বয়সী ছোটভাইয়ের ভাগ্য ফেরাতে ১৫ বছর আগে দাদার হাত ধরে রাজধানীর একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল। নির্মম নিয়তির শিকার সেই তরুণ গত রবিবার দাদার হাত ধরে আবার ঢাকায় এলো। ভর্তি হলো তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে।
সাগরের মা মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, তার ছেলে ঢাকায় গিয়ে হাফেজ না হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। কাউকে না জানিয়ে প্রেম করে বিয়ে করেছে, তারপর বউ হারিয়েছে। যৌতুকের মামলায় জেল খেটেছে। এরপর বাড়িতে এসে মাদকের টাকার জন্য স্বজনদের মেরেছে, নিজের ছোটভাইকে মেরেছে, বাসার আসবাবপত্র তছনছ করেছে। শেষে আমার হাতও ভেযে দিয়েছে। তাই ওর দাদা আবার ওকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন।
দাদা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাস দুয়েক আগে একবার এখানে (তেজগাঁও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র) ভর্তি করিয়েছিলাম। তারপর সেখান থেকে বাড়িতে নেওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তাই আবারও তাকে এখানে নিয়ে এসেছি। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর পুনঃভর্তি করিয়েছি।’ কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভর্তির ফরমে তিনি লিখেছেন, ‘আমি মো. সিরাজুল ইসলাম, আমার রোগী মো. ... আরও ২৮ দিন বর্ধিত করিলাম। এজন্য রোগী আত্মহত্যা করিলে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ দায়ী থাকিবে না।’
এ শর্তের ব্যাপারে সিরাজুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওখানে নানা ধরনের রোগী থাকে। কখন, কে, কী করে বসে তার ঠিক নেই। তাই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ সরকারি নিয়ম মেনে এমন কথা লিখতে বলেছিল, তাই লিখেছি।’
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাময় কেন্দ্রের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাদকসেবী পুরুষ ওয়ার্ডে নানা ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কয়েক বছর আগে একসঙ্গে ১৭ জন মাদকাসক্ত শিশু পালিয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন মাদকাসক্তের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছিল। মাদকাসক্তরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে আহতও হয়ে থাকে। তাদের দেখভালের জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এমন ঘটনা মাঝে-মধ্যেই ঘটে থাকে। তাই কোনো ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে দায় এড়ানোর জন্যই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ মাদকাসক্ত কোনো রোগীকে ভর্তির সময় অভিভাবকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে থাকে। অন্যথায় কোনো রোগী ভর্তি করা হয় না। এভাবেই এখানে চিকিৎসাধীন সব রোগীকে ভর্তি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, ১২৭ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে ৮০ জন মাদকাসক্ত রোগী ভর্তি আছেন।
তাদের মধ্যে ৬৮ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী মাদকসেবীর পাশাপাশি ১০-১২ জন শিশু মাদকাসক্ত রয়েছে।
রোগী ভর্তির প্রসঙ্গে কেন্দ্রের প্রধান সহকারী মো. তসলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকে আসক্ত যেকোনো ব্যক্তি এই কেন্দ্রে ভর্তি হতে পারেন। তার জন্য বাইরে থেকে একটি ইসিজি ও এক্সরে রিপোর্ট নিয়ে আসতে হবে। তারপর এখানে চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার পর চিকিৎসক যদি মনে করেন ভর্তি হতে হবে তাহলে ভর্তি করা হয়।’
ভর্তির সময় মাদকাসক্তের অভিভাবকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে বিষয়ে চিকিৎসকরাই ভালো বলতে পারবেন। আমি জানি না।’
এ প্রসঙ্গে তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালটেন্ট ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওরা (রোগী) কোনো দুর্ঘটনা ঘটালে তার দায়ভার তো ওদেরই নিতে হবে।
ওরা যে কত ভয়ঙ্কর! ওরা কী যে করতে পারে সে বিষয়ে তো আপনাকে বলেছিই।’ মাদকসেবীদের সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নজরদারির মধ্যেও তারা যেকোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই নিয়মকানুন মানতেই হবে।’
