শ্রীলঙ্কায় কোকেন ও হেরোইন পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যদের শনাক্ত করতে নেমে আন্তর্জাতিক রুটে এ মাদক পাচারে সক্রিয় ১০ জন বাংলাদেশির তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মাদকের একাধিক চালান এক দেশ থেকে এনে অন্য দেশে পাচারের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার বিষয়েও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন তারা। এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের জন্য আগামী সপ্তাহেই চার সদস্যের একটি তদন্ত দল শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে।
সিআইডি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত ৩১ ডিসেম্বর কলম্বোতে ২৭০ কেজি হেরোইন, পাঁচ কেজি কোকেনসহ ধরা পড়ে নারীসহ তিন বাংলাদেশি। এরপর তদন্তে নেমে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্তত ১০ জন বাংলাদেশির নাম-পরিচয় জানা গেছে। তাদের মধ্যে শ্রীলঙ্কার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার বগুড়ার জামাল উদ্দিন, জয়পুরহাটের রাফিউল ইসলাম ও সূর্যমুখী ছাড়াও রয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে গ্রেপ্তার চয়েজ রহমান। চয়েজকে জিজ্ঞাসাবাদে ভারত-হিলি-জয়পুরহাট-ঢাকা-কলম্বো রুটে সক্রিয় আরও সাত-আটজনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের একজন বাহক (ক্যারিয়ার) সূর্যমুখীর সহযোগী তানিয়া; যিনি এখন দেশেই অবস্থান করছেন।
সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, চয়েজ, সুমন ও আরিফ নামে তিন পাচারকারীর নেতৃত্বে ১০ জনের একটি সিন্ডিকেট কলম্বোতে বিপুল পরিমাণ হেরোইন ও কোকেন পাচার করেছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, জয়পুরহাট ও হিলি সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আসে মাদকের এই চালান। এরপর ব্যাগে ভরে ঢাকা হয়ে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড ঘুরে এ চালান পৌঁছায় কলম্বোয়। গত ৩১ ডিসেম্বর কলম্বোতে তিন বাংলাদেশির কাছ থেকে মাদকের চালান উদ্ধারের পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সিআইডি পাচারের রুট ও সিন্ডিকেট সদস্যদের শনাক্ত করতে অভিযানে নামে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩ জানুয়ারি চয়েজকে আটক করে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। গতকাল মঙ্গলবার ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত এক দিনের রিমাণ্ড মঞ্জুর করে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব ফারহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কায় পাচার হওয়া মাদকের তদন্ত করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এখন অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেখানে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।’ এদিকে, চয়েজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল রাজধানীর উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে তার সহযোগী আরিফের বোনের বাসায় তল্লাশি চালিয়েছে সিআইডি। সেখানে তল্লাশি পরিচালনাকারী সিআইডির একজন কর্মকর্তা জানান, আরিফ অত্যন্ত ধূর্ত। শ্রীলঙ্কায় মাদকের চালান আটকের খবর শুনেই সে মালয়েশিয়া পালিয়ে গেছে। এ অভিযানের আগেই তার চেকবই ও ডকুমেন্টস সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওই বাসা থেকে আরিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করে পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় তল্লাশি শেষে বাসার যাবতীয় আসবাবপত্র বাড়ির মালিকের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) নজরুল ইসলাম শিকদার দেশ রূপান্তরকে জানান, শ্রীলঙ্কায় ৩ বাংলাদেশির কাছ থেকে হেরোইন ও কোকেন উদ্ধারের ঘটনায় বগুড়া ও জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে কলম্বোয় গ্রেপ্তার বাংলাদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আগামী সপ্তাহেই তারা সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, কলম্বোতে হেরোইন-কোকেনের চালানসহ ৩ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সেখানকার সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরই মধ্যে এ বিষয়ে এক সভায় পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সিআইডি ও বিজিবির পক্ষ থেকে তদন্তের জন্য চার বা পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে আগামী সপ্তাহে কলম্বো পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
×
