মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় ‘ডলার প্রতারক’ চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বেশ কয়েক বছর ধরে চিহ্নিত এই চক্রটি প্রতারণা করে এলেও কার্যত কোনো প্রতিকার নেই। প্রতারণার শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা মামলা করেন। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারও করে। কিন্তু জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবারও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে মতিঝিল এলাকার কোনো কোনো মুদ্রাবিনিময় প্রতিষ্ঠান।
এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে আবুল কালাম, মুন্না, মাকসুদ, সেলিম। এদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মতিঝিল থানায় ৫ থেকে ৬টি ডলার প্রতারণার মামলা হয়েছে। মতিঝিল থানা-পুলিশ বলছে প্রতারক চক্রের সদস্যদের বেশ কয়েকবার আটক করে কোর্টে চালান করা হলেও তারা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়।
রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় এমন ডলার প্রতারক চক্র। চক্রের ৫ থেকে ১০টি গ্রুপ রয়েছে। সুট-টাই পরে বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে প্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ায় তারা। নিজেদের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কর্মী বলে পরিচয় দেয় তারা।
পুলিশ, ভুক্তভোগী ও বিভিন্ন মামলা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৭ জুন আমির হোসেন নামে নোয়াখালীর এক ব্যবসায়ী টাকা ডলার করতে মতিঝিলের দিলকুশায় আসেন। এরপর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখার সামনে গেলে তার কাছ থেকে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় একটি চক্র। আমির হোসেন মতিঝিল থানায় মামলা করলে ওই দিনই পুলিশ অভিযান চালিয়ে চক্রের সদস্য আবুল কালাম, মাকসুদ, সেলিম, মুন্না, আবদুল জব্বারকে গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান করে। তবে পরের দিনই তারা আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়।
২০১৬ সালে এই চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হন রাজু আহমেদ নামে এক মুদি দোকানি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি পায়ের অসুখে ভুগছিলেন।পরে মনস্থির করেন বিদেশ যাবেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। নিজের গোছানো ও পরিচিতজনদের সহায়তায় ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকাও জোগাড় করেন। কিন্তু সেই টাকা ডলার করতে মতিঝিল দিলকুশা এলাকায় একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের সামনে গেলে প্রতারণার শিকার হন। প্রতারকরা তাকে এই টাকার বিপরীতে ১৬২৫ ইউএস ডলার দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু টাকা নেওয়া হলে মুহূর্তেই হারিয়ে যায় চক্রটি। রাজু আহমেদও মতিঝিল থানায় মামলা করেন। এরপর নিজ হাতে এক প্রতারককে ধরিয়েও দিয়েছিলেন, কিন্তু মামলার ছয় আসামি জামিনে মুক্ত হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, এই ডলার প্রতারকদের পৃষ্ঠপোষক বিভিন্ন মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠান (মানি এক্সচেঞ্জে)। তাদের ছত্রচ্ছায়ায় প্রকাশ্যে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। অভিযোগ এলে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে, তবে কোনোভাবেই তাদের থামানো যাচ্ছে না।
একাধিক ডলার প্রতারণার মামলার তদন্তকারী মতিঝিল থানার এসআই মামুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মাঝেমধ্যেই ডলার প্রতারণার অভিযোগ পাই। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে অভিযুক্তদের আটকও করি। কিন্তু তারা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার প্রতারণা করে। এই প্রতারকদের পেছনে রয়েছে সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে প্রতিষ্ঠান। তাদের ছত্রছায়ায় এ প্রতারণা করে যাচ্ছে একটি চক্র।’
নাম প্রকাশ না করে মতিঝিল থানার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডলার প্রতারক চক্রকে আটক করে আদালতে চালান দিয়ে কোনো লাভ হয় না। আদালতের ইটও আসামির পক্ষে থাকে। তারা জামিন নিয়ে চলে আসে। এমনকি বাদীপক্ষকে ম্যানেজ করে মামলাও নিষ্পত্তি করে ফেলে।’
মতিঝিলের ডলার প্রতারক চক্র নিয়ে অনুসন্ধানকারী একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মতিঝিলে টাকার বিনিময়ে ডলার নিতে আসা সহজ-সরল মানুষকে টার্গেট করে এই চক্রটি। স্থানীয়ভাবে চক্রটি অদৃশ্য ডলার প্রতারক চক্র বা ডলার টানা চক্র নামেও পরিচিত।’
তিনি আরও জানান, ‘ডলার প্রতারক চক্রের অন্যতম আবুল কালাম। তিনি এই প্রতারণার মাধ্যমে কোটিপতি হয়েছেন। ঢাকায় তার একাধিক বাড়িও রয়েছে। সে স্থানীয় পুলিশ ও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা চালিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও সে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার প্রকাশ্যে এই প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।’
মামলার অপর এক তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার এসআই আল আমিন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মতিঝিলে ডলার প্রতারক চক্রের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে সহজ-সরল মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে ঠকাচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের হাত অনেক লম্বা। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করলে এই প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব হবে।’
ভুক্তভোগী রাজু আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিনেদুপুরে সবার সামনে এই চক্রটি মানুষকে এভাবে ধোঁকা দিচ্ছে, অথচ তার কোনো বিচার হচ্ছে না। বছরের পর বছর যাচ্ছে আমি আমার টাকা ফেরত পাচ্ছি না।’
এ বিষয়ে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের সহকারী কমিশনার মিশু বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডলার প্রতারণার অভিযোগের ভিত্তিতে বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়েছি। কয়েকজনকে আটকও করেছি। তবে এই সিন্ডিকেটটি জামিনে মুক্ত হয়ে আবার প্রতারণায় লিপ্ত হয়। অভিযোগ পেলে আমরা আবারও অভিযান পরিচালনা করব।’
