রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আলোতে অন্ধকার এবং অন্ধকারে আলো

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫২ পিএম

একই বছরের ঘটনা, ১৮৫৭-এর। কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং কলকাতার অনতিদূরে, ব্যারাকপুরে, সিপাহি অভ্যুত্থান। প্রথমটি ঘটল জানুয়ারি মাসে, দ্বিতীয়টি মার্চে। দুই মাসের ব্যবধান। স্থানের দিক থেকেও দূরে নয় ব্যারাকপুর, কলকাতা থেকে। কাছেই।

কিন্তু স্বভাবে ও চরিত্রে ঘটনা দুটি খুবই দূরবর্তী, পরস্পর থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় কেমন প্রতিষ্ঠান, কী তার কাজ সে আমরা জানি। তাকে চিহ্নিত করা সহজ। কিন্তু সিপাহি অভ্যুত্থান? না, তার চরিত্র ততটা স্পষ্ট চিহ্নিত করতে গেলে দ্বিধার সৃষ্টি হয়। সিপাহিরা শিক্ষা-দীক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তাদের অধিকাংশই ছিল অশিক্ষিত কৃষকের সন্তান; উর্দি পরে সিপাহি হয়েছে। পশ্চাৎপদ ছিল তারা ধ্যান-ধারণায়। মোটেই আলোকিত নয়। ওদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু, উজ্জ্বল এবং আলোকিত। তার মুখ বিশ্বের দিকে, সিপাহিরা আত্মমুখী।

এ পর্যন্ত কথাগুলো বলা গেল এক নিঃশ্বাসে। তবে তার পরেই প্রশ্ন দেখা দেয়। আলো যাকে বলছি তার নিচে কি অন্ধকার ছিল না? অন্ধকার যাকে মনে হচ্ছে তার অন্তরালেও কি ছিল না আলো? ঘটনা দুটো বেশ জটিল ওই কারণেই।বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোর দিকগুলো তালিকাভুক্ত হতে বিলম্ব করে না, একের পর এক তারা এসে যায়। প্রথম কথা, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে শিক্ষার অতিউচ্চ প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় কথা, সে বিশ্বমুখী, বিশ্বের যেখানে যা পায় যতটা পায় দ্রুত সে সংগ্রহ করে, সৃষ্টি করে নতুন জ্ঞান, বিতরণ করে তা অকাতরে। তৃতীয়ত, পরাধীন ভারতে সে এসেছিল বুর্জোয়া বিকাশের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। চতুর্থত, সামন্তবাদ-কবলিত বঙ্গদেশে যে নবজাগরণ ঘটেছিল কলকাতাকে কেন্দ্র করে তার ঠিক কেন্দ্রে না হলেও আশপাশেই ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। সব মিলিয়ে যেন সকালের স্নিগ্ধ আলো।এর বিপরীতে সিপাহি অভ্যুত্থানকে মনে হবে যেন মধ্যরাতের দুঃস্বপ্ন। মূর্তি সে অন্ধকারের, মুখ তার সামন্তবাদের দিকে ঘোরানো, যাত্রা তার পশ্চাৎমুখী। রেনেসাঁসের পক্ষে নয়, বিপক্ষে সে।তবে একটু সতর্ক চোখে দেখার যা অপেক্ষা, দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়বে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপ্রশংসিত আলোর নিচে হতভাগ্য বাঙালির জন্য অন্ধকার ছিল কেমন ভয়ংকর। শুরুতেই লক্ষ করা যাবে যে, বিশ্ববিদ্যালয় এদেশে আলো বিতরণের জন্য আসেনি, এসেছে তাঁবেদার সৃষ্টির জন্য। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না, তার একমাত্র কাজ ছিল পরীক্ষা নেওয়া। এবং এখনো, কেবল কলকাতায় নয়, উভয় বাংলার সব ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রধান মাথাব্যথা শিক্ষা দান নয়, পরীক্ষা গ্রহণ করা। আর ওই যে তাঁবেদার শ্রেণি তৈরি করা সেই অভিপ্রায়টি পরাধীনতার যুগে যতটা পরিষ্কার ছিল এখন ততটা নয় বটে, তবে এখনো রাষ্ট্র চায় বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনচেতা মানুষ নয়, বরঞ্চ অনুগত নাগরিকই সৃষ্টি করুক।সিপাহি অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল একেবারেই উল্টো। সিপাহিরা তাঁবেদার হয়ে থাকবে এটাই ছিল তাদের চাকরির প্রথম শর্ত; কেনা গোলাম তারা; গোলামি করতে এসেছে। কিন্তু তারা তা করল না, করে বসল উল্টো কাজ, করল বিদ্রোহ। সিপাহিদের অভ্যুত্থানকে যতই পেছনমুখো বলে গাল পাড়ি না কেন তার অভিপ্রায়টা ছিল অত্যন্ত আধুনিক। সে চেয়েছে ইংরেজ শাসনের অবসান। চেয়েছে স্বাধীনতা। সিপাহিরা চাইল স্বাধীনতা, শিক্ষিত মানুষেরা চাইল পরাধীনতা। কোনটা ভালো কোনটা মন্দ বিচার করব কী করে? আলোর দরকার আছে; জ্ঞান চাই, বিকাশ চাই বুর্জোয়া ধরনের, ছিন্ন করা চাই সামন্তবাদের শীতল বন্ধন। সবই সত্য। কিন্তু এই আলো, এই বিকাশ, এই মুক্তি এরা যদি পরাধীনতাকে পোক্ত করে তাহলে তাদের কী করে বলি অবিমিশ্র আশীর্বাদ? বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে খাটো করবার কোনো অবকাশ নেই। সে আলো দিয়েছে, এমনকি বিদ্রোহ করতেও শিখিয়েছে, কিন্তু তার ভেতরে যে অন্ধকারটা ছিল তাকে যেন না ভুলি। সেই অন্ধকার সে বহন করেছে, এখনো যে মুক্ত হয়েছে তা নয়।

সিপাহি বিদ্রোহের ঠিক পরের বছর, ১৮৫৮-তে কোম্পানির শাসন শেষ হয়, শুরু হয় মহারানী ভিক্টোরিয়ার কর্তৃত্ব। সেই নতুন ব্যবস্থার একটা সামরিক ভিত ছিল, ছিল তার অত্যন্ত শক্ত একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো; সঙ্গে এবং ভেতরে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাও। এই শিক্ষার ক্ষতিকর দিকগুলোকে আমরা যেন অবজ্ঞা না করি। কেননা মোটেই তারা সামান্য নয়। প্রথম ব্যাপার তো এটাই যে, এ শিক্ষা আমাদের স্বাধীনচেতা হতে উদ্বুদ্ধ করেনি। বরঞ্চ নত করে দিয়েছে ভেতর থেকে। আমরা পরাধীন জাতি, ইংরেজরা অতিউচ্চ স্তরের মানুষ, দেখছ না কেমন উজ্জ্বল তারা গায়ে-গতরে, শিক্ষা-দীক্ষায়, তারা আমাদের অনন্তকাল শাসন করবেÑ এই কথাটা অজস্র ধারায় প্রবেশ করেছে আমাদের চেতনায়। আমরা নত হয়েছি, হীনম্মন্যতায়। সাধারণ শিক্ষার্থী কোন ছার, বড় বড় ঐতিহাসিকরা (বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) যা যা করছেন সেটা স্মরণ করলে এখনো হৃদকম্প উপস্থিত হয়, শিক্ষিত সমাজের হীনতার কথা স্মরণ করে। স্যার যদুনাথ সরকারকে ছোট ঐতিহাসিক বলবে কোন দুঃসাহসী? খুব বড় ঐতিহাসিক ছিলেন, ছিলেন শিক্ষক, উপাচার্য ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ইবহমধষÑএর দ্বিতীয় খ- তিনি সম্পাদনা করেন; এর শেষ প্রবন্ধটি তাঁরই লেখা। এতে তিনি ইংরেজের বঙ্গদেশ অধিকারের অঘটনঘটনপটিয়সী মুহূর্তটির কথা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, প্রায় দার্শনিক হেগেলের ভাষা ও ভঙ্গিতে, বঙ্গভূমি যেন নিজের অজ্ঞাতে যুগ-যুগান্তর ধরে এই পরিণতির লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছিল। তাঁর চমৎকার ইংরেজি বক্তব্যের বাংলা করলে এই রকম দাঁড়ায় : ইংরেজ আগমনের ফলে ‘একটি স্থবির প্রাচ্য সমাজের শুকনো হাড়গুলো যেন নতুন জীবন পেল, ঈশ্বর-প্রেরিত এক জাদুকরের ঐন্দ্রজালিক কাঠির স্পর্শ পেয়ে।’ দখলকারী নয়, জাদুকর; লুণ্ঠনকারী নয়, ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষÑ এই হলো ইংরেজের পরিচয়। অশিক্ষিত সিপাহিরা যাদের দস্যু বলে চিনে ফেলেছে, স্যার যদুনাথরা তাদের বলেছেন রেনেসাঁস সৃষ্টির জন্য প্রেরিত-পুরুষ।

ইংরেজের বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আসলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তার সমগ্র অভিপ্রায়টিই ছিল রাষ্ট্রনৈতিক রাষ্ট্রের স্বার্থে সজ্জিত ও বিন্যস্ত। সেই স্বার্থ যে উদ্ধার হয়নি সেটাই-বা কেমন করে বলি।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা আর যা করল সেটা হলো বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি। শিক্ষিত লোকেরা আলাদা হয়ে গেল অশিক্ষিত লোকদের কাছ থেকে। এর প্রধান কারণ যে শিক্ষা তাও নয়, প্রধান কারণ ভাষা। ইংরেজি-শিক্ষিতদের মধ্যে ইংরেজির জ্ঞান নিয়ে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে একটি দাম্ভিক অহমিকা গড়ে উঠল, যার ফলে তারা আর আপনজনদের আপন রইল না, পর হয়ে গেল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম করা হয়েছিল ১৭৯৩ সালে; কৃষকের জন্য অত্যন্ত নিষ্ঠুর, জোয়ালের মতো হিংস্র এই ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষিতরা অধিকাংশই রইল উদাসীন, কেউ কেউ হয়ে পড়ল এর সমর্থক।

জাতীয়তাবাদের শিক্ষাও বিশ্ববিদ্যালয়ই দিয়েছে। এর ফল শুভ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না; কেননা এর মধ্যে প্রবেশ করল সাম্প্রদায়িকতা। শিক্ষিত-অশিক্ষিতের যে-বিভাজন তার চেয়েও মারাত্মক হয়ে প্রকাশ পেল সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা। জাতীয়তাবাদ শেষ পর্যন্ত রূপ নিল সাম্প্রদায়িকতার। উল্টো দিকে, অর্থাৎ সিপাহি অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখি? দেখি আপাততের অন্ধকার ভেদ করে ঠিকরে পড়েছে আলো, সে আলো সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার।

আরও একটি শিক্ষার মহত্ত্ব অশিক্ষিত সিপাহিরা তুলে ধরে রেখে গেছে। সেটা হলো ঐক্যের। বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে অনৈক্য আনল প্রথমে শিক্ষিতে-অশিক্ষিতে, পরে হিন্দু-মুসলমানে, সিপাহিদের অভ্যুত্থান সেখানে ঘটাল সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা; সে হিন্দু-মুসলমানের ভেদাভেদ রাখল না, সকলকেই করে দিল নির্বিশেষে ভারতবর্ষীয়। ইংরেজের ভাগ করো ও শাসন করো নীতির অচেতন সমর্থক ছিল শিক্ষিতরা, অশিক্ষিতরা ছিল তার প্রতিবাদী। সিপাহি অভ্যুত্থানের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অগ্রসর হলে ভারতবর্ষ ভাগ হতো না, রক্তে রঞ্জিত হতো না এর ভূমি এবং আমরা স্বাধীন হয়েও পরাধীন থাকতাম নাÑ আজ যেমন রয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোতে আমরা পেলাম সঙ্কীর্ণ ও আবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা, সিপাহি অভ্যুত্থানের তথাকথিত অন্ধকারে শিক্ষা পেলাম উদার ও স্বাধীন হওয়ার। কৌতুকটা কি ইতিহাসের, নাকি ইতিহাস-নির্দিষ্ট মানুষের?

তবে এটা খুবই একপেশে হবে যদি আমরা সাবেক কালের কালোপাহাড়ি কিংবা আধুনিককালের নকশালবাড়ি কায়দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিই, কেননা সত্য তো ওটাও যে, ওই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতা কম আসেনি। দাসানুদাস যেমন সৃষ্টি হয়েছে, বিদ্রোহীও তেমনি সৃষ্টি হয়েছে বৈকি। যথার্থ জাতীয়তাবাদের দুটি উপাদানÑ সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা ও জাতীয় ঐক্য। এই দুই উপাদানের সৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান আছে, তবে সিপাহি অভ্যুত্থানের অবদান অধিক। তাই কি? সিপাহি অভ্যুত্থান তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছে কি? হ্যাঁ, পেরেছে, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির একটি ধারা দেশে আছে বৈকি। নানা বিভ্রান্তি, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও টিকে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাও ঘটেছে ব্রিটিশের হাতে এবং রাজনৈতিক কারণে। এ ছিল পূর্ববঙ্গবাসীদের জন্য একটি রাজনৈতিক ঘুষ। ১৯০৫-এ বঙ্গ বিভাগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজটি সম্ভব হয়নি, যে জন্য পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের নেতারা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, তাদের খুশি করার অভিপ্রায়ে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হলো। আয়োজনটা ছিল ছোট। তবে কেবল যে একটি সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট রাখা তা তো নয়, অভিপ্রায়টা ছিল অনুগত নাগরিক সৃষ্টিরও। সেটাই প্রধান।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তৃতাগুলো পড়লে শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রনায়কদের দৃষ্টিভঙ্গিটা বোঝা যায়। ১৯৪৮-এর সমাবর্তনের সময়ে বেশ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। সৃষ্টি করেছিলেন ভাইস-চ্যান্সেলার স্বয়ং, তাঁর বক্তৃতার মধ্য দিয়ে। মুদ্রিত বক্তৃতার অক্ষরগুলো ভেদ করে তাঁর উত্তেজনা ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করে, ছাপা অক্ষরেও। এর কারণ ‘জাতির পিতা’ জিন্নাহ সাহেব স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন ওই সমাবর্তনে, সম্ভবত ভাইস-চ্যান্সেলরের উৎসাহের কারণেই। আগস্ট মাসে ‘স্বাধীন’ হয়েছে দেশ, পরের বছর মার্চ মাসে অনুষ্ঠান হচ্ছে সমাবর্তনের। উপাচার্য ড. মাহমুদ হাসান ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, কিন্তু সেদিন কি সাহিত্য কি ইংরেজি ভাষা সব কিছুরই নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করেছেন তিনি, স্বাধীনভাবে ধ্বনি তুলেছেন, ইয়া কায়েদে আজম, ইয়া আমিরে পাকিস্তান বলে। তুলনায় জিন্নাহ সাহেব বরঞ্চ সংযত। কিন্তু সংযত ভাষায় ও ভঙ্গিতে তিনি যা বলেছেন সেই বক্তব্যে তেমন কোনো সংযম নেই, সেখানে রাষ্ট্রনায়কের বক্তব্যটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও চাঁচাছোলা।

তিনি বললেন, ছাত্ররা, তোমরা দেখবে কোনো রাজনৈতিক দল যেন তোমাদের ব্যবহার করতে না পারে। বলেই, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, তোমাদের কর্তব্য হলো মুসলিম লীগকে শক্তিশালী করা, মুসলিম লীগ পাকিস্তান এনেছে এবং সেই পাকিস্তানকে রক্ষা করবে, তোমাদের কাজ হবে তাকে সাহায্য করা। যেন মুসলিম লীগ একটি রাজনৈতিক দল নয়, যেন তার কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। উক্তির নিচে অনুক্ত থাকল আসল বক্তব্য : পাকিস্তানে রাজনীতি আমরা অর্থাৎ মুসলিম লীগাররাই শুধু করব, অন্য কারও সে অধিকার থাকবে না। তারপরেই চলে এলো তার বিস্ফোরক বক্তব্যটি, যেটি তিনি রেসকোর্সের জনসভায় এরই মধ্যে প্রকাশ করেছেন। সেটি হলো উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ছাত্রদের বললেন রাজনীতি না করতে। আবার বললেন মুসলিম লীগে যোগ দাও, তারপরে নিয়ে এলেন চূড়ান্ত রাজনৈতিক বক্তব্য একটিÑ উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

যাদের বোঝার তারা বুঝল যে, বাঙালিদের জন্য এই স্বর স্বাধীনতার নয়, পরাধীনতার। ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদ গিয়েছে, কিন্তু অবাঙালি পাকিস্তানিদের প্রায়-উপনিবেশবাদ চলে এসেছে। বাঙালি এক পরাধীনতা থেকে আরেক পরাধীনতায় নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে। জিন্নাহ আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ উক্তি করেছিলেন তাঁর ওই সমাবর্তন বক্তৃতাতে। তিনি দ্বিতীয় একটি পথনির্দেশ দিলেন ছাত্রদের। প্রথম নির্দেশের (ওই যে তোমরা রাজনীতি করো না, শুধু মুসলিম লীগ করো এই পরামর্শ) পাশে এটি তাঁর  দ্বিতীয় নির্দেশ।

স্বাধীনতা এসেছে কিন্তু রাষ্ট্র চাইছে রাষ্ট্রের নাগরিকেরা সিপাহি অভ্যুত্থানের ওই যে চেতনা, মুক্তির চেতনা, ওদিকে ধুয়েমুছে ফেলুক। অথচ স্বাধীনতা যে এসেছে সেটা গোলাম ও স্বার্থপরদের কারণে নয়, এসেছে অভ্যুত্থানের চেতনায় যারা উদ্দীপ্ত তাদের নিরন্তর সাধনায়; রাষ্ট্রবিরোধী গণআন্দোলন, বিপ্লবী যুবকদের তৎপরতা, নৌবাহিনীর বিদ্রোহ ইত্যাদির পথ ধরে।

তবু থাকে। বিদ্রোহ থাকে, থাকে সিপাহি অভ্যুত্থানের ওই চেতনা। জিন্নাহ সাহেব যখন বলছিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষাÑ তখন সঙ্গে সঙ্গে এই স্বতঃস্ফূর্তরূপে প্রতিবাদ উঠেছে, ‘না, না’ বলে ধ্বনি তুলেছে ছাত্ররা। সবাই নয়, একাংশ। তবে সেই একাংশ পরে বড় অংশে পরিণত হয়েছে; ছোট্ট ওই ‘না’ অত্যন্ত বৃহৎ হয়ে উঠেছে; রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধÑ এভাবে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়ে ভেঙে ফেলেছে পাকিস্তান নামক অত্যাচারী রাষ্ট্র যন্ত্রটিকে, স্বাধীন হয়েছে দেশ।

বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করেনি, সমর্থন দেয়নি, বিরোধিতাই করেছে, তার আলোর নিচের অন্ধকার গ্রাস করে নিতে চেয়েছে মুক্তির আকাক্সক্ষাকে। পারেনি। জয় হয়েছে সেই চেতনারই যাকে একদা দেখেছি আমরা সিপাহিদের সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে। বলার কি অপেক্ষা রাখে যে, রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন ও অগ্রগতি যা ঘটার তা মুক্তির আকাক্সক্ষা-পরিচালিত বিদ্রোহের কারণেই ঘটেছে। আর রাষ্ট্রই তো প্রধান নিয়ন্ত্রক মানুষের সামাজিক জীবনের।

তবে ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিতরাও ছিল। আন্দোলন তো বরঞ্চ তারাই সূচনা করেছে, পরে তা বড় ও প্রবল হয়েছে জনগণকে সঙ্গে পেয়ে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান, একাত্তরের যুদ্ধ সকলেরই ইতিহাস এটি। বুদ্ধিজীবী মিশেছেন জনগণের সঙ্গে, মিশেছেন বলেই তাঁরা একে অসম্পূর্ণ, অন্যকে বাদ দিয়ে।

বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে জনগণের ঐক্য দরকার, সামনের দিকে যাওয়ার জন্য। এ ঐক্য রাষ্ট্র চায় না, বিশ্ববিদ্যালয়ও চায় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস তো বরঞ্চ উল্টো কাজের কাজী, সে কাজ বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদ সৃষ্টির অভিপ্রায় দ্বারা বিশিষ্ট। অন্ধকারের নিচে যে আলো আছে তার সম্ভাবনা বিকশিত হবে না আলোকিত জনের আনুকূল্য না পেলে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

লেখক

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত