সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাছে ভাতে বাঙালির পাতে বিষ

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৪০ পিএম

মৎস্য সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতি বছর বিদেশে মাছ রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে। বাঙালি জাতি ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দেশের নদ-নদী-জলাশয়গুলোতে অবাধে কীটনাশক ও বিষ ট্যাবলেট ব্যবহার করে মাছ ধরছে। এতে একদিকে প্রাকৃতিক উৎসে দেশি মাছের নানা প্রজাতি হুমকির মধ্যে পড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পাতে উঠছে এভাবে বিষ দিয়ে ধরা এসব বিষাক্ত মাছ।

সরকার সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা টেকসই উন্নয়নের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু দেশে পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংসের চলমান নানা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা। প্রাকৃতিক উৎসে মাছের নানা প্রজাতি ধ্বংস তেমনই এক মারাত্মক শঙ্কার বিষয়। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে খাল-বিল ইজারা নিয়ে অনেক ব্যবসায়ীরা মাছ চাষ করেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়মানুযায়ী, ইজারাকৃত খাল-বিলের পানি না শুকিয়ে মাছ ধরতে হবে। কিন্তু মাছ চাষিরা এ আইনকে উপেক্ষা করে পুরো পানি শুকিয়ে মাছ ধরে। কেউ কেউ আবার পুকুর বা খাল-বিলে এক ধরনের গ্যাস ট্যাবলেট (যা আদতে বিষ) প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ ধরছে। জলাশয়ে এই বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলছে। এর ফলে মাছের সঙ্গে সঙ্গে  অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। আর সে কারণে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, অন্যদিকে বিষপ্রয়োগে শিকার করা মাছ খেয়ে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণী স্বাস্থ্যগতভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

নদী-জলাশয়ে মাছ মারতে ও পুকুরের মাছ সব একসঙ্গে ধরতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত কীটনাশক ও গ্যাস ট্যাবলেট ‘অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড’ এবং ‘ডেনিটল ১০ ইসি’। মূলত চায়ের লাল মাকড় ও বেগুনের মাকড় দমনের জন্য ‘ডেনিটল ১০ ইসি’ অনুমোদিত কীটনাশক। আর গ্যাস ট্যাবলেট নামে পরিচিত ‘অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড’ গুদামজাতকৃত পণ্যের পোকা দমনে ফিউমিগেন্ট হিসেবে অনুমোদিত। কিন্তু এখন এই দুই বিষের সিংহভাগই ব্যবহৃত হচ্ছে মাছ মারতে। ডেনিটল ও অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড পুকুরের পানিতে প্রয়োগ করা মাত্রই পানি এত বিষাক্ত হয় যে, এই বিষাক্ত পানি পান করার সঙ্গে সঙ্গে মাছ মরে গিয়ে পানির ওপরে ভেসে ওঠে এবং তা জাল দিয়ে ধরে বাজারজাত করা হয়। গ্রামের পুকুর ও দিঘিগুলোতে দিনের বেলায় কীটনাশক প্রয়োগ করে অসাধু মাছ ব্যবসায়ীরা মাছ ধরে থাকে। কীটনাশক দিয়ে মাছ ধরার কারণে পুকুর, দিঘিসহ অন্যান্য জলাশয়ের অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। এভাবে যদি দিনের পর দিন বিষপ্রয়োগ করে মাছ ধরা হয় তাহলে অনেক প্রজাতির দেশি মাছের জাতই হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভূমি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় চাইলে দেশব্যাপী এই মারাত্মক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলার গ্রাম-গঞ্জের অনেক পুকুর, নদ-নদী, খাল-বিলসহ অনেক জলাশয়েই এমন বিষ ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ ধরা হয়। বিশেষ করে নদী এলাকা বা যেসব এলাকায় খাল-বিল আছে সেসব এলাকায় এ প্রয়োগ বেশি দেখা যায়। আর যেসব এলাকায় খাল-বিল নেই সে সব এলাকা যে খুব ভালো অবস্থায় আছে তাও নয়। তারাও পুকুরে এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করে থাকে। নদীতে মাছ ধরার জন্য এসব কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ধরার জন্য অনেক সময় ধাওয়া করলে তারা পালিয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার করেও তাদের থামানো যাচ্ছে না। রাতের আঁধারে এসব কাজ দুর্বৃত্তরা করেই যাচ্ছে। ভোর পর্যন্ত চলে তাদের এ মাছ শিকার।

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল, ইটনা, নিকলি, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, নাটোরের সিংড়া, বরিশালের মুলাদীসহ বিভিন্ন এলাকায় এভাবে বিষপ্রয়োগে মাছ ধরার হার সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়াও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এর প্রয়োগ করা হয়। এভাবে বিষপ্রয়োগে মাছ ধরার ফলে এসব অঞ্চলের জলজ পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ছে। নানা জাতের দেশি মাছের প্রজাতি ধ্বংস হচ্ছে এবং সঙ্গে  সঙ্গে  নানা জলজ উপকারী প্রাণীও ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি এভাবে ধরা মাছ খাওয়ার ফলে মানুষের শরীরেও বিষ প্রবেশ করছে। ফলে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বিষপ্রয়োগে ধরা এসব মাছ অবাধে বরফ ও ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করে যাচ্ছে। দেশের মানুষ না জেনেই সে সব মাছ খেতে বাধ্য হচ্ছে।

প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে চীন ও ভারত যথাক্রমে এক ও দুই নম্বরে আছে। দুই বছর আগে প্রাকৃতিক উৎসের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। এবার বড় ধরনের অগ্রগতির পেছনে মূল অবদান ইলিশের। দ্য স্টেট অব ফিশ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৮ শীর্ষক ওই প্রতিবেদন মতে, চাষের ও প্রাকৃতিক উৎসের মাছ মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। চার বছর ধরে বাংলাদেশ এই অবস্থানটি ধরে রেখেছে। আর শুধু চাষের মাছ হিসেবে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। নদী-হাওর-বাঁওড়-বিল ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আহরণ করা মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের উন্নতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি। সেই ইলিশের উৎপাদন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত পদ্মাও বিষপ্রয়োগ থেকে বাদ পড়েনি।

বিষপ্রয়োগে মাছ ধরা যদি বন্ধ করা না যায় তাহলে আমরা আমাদের অবস্থান ও সুনাম ধরে রাখা সম্ভব হবে না। এ বিষপ্রয়োগের ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা হলো মাছের সঙ্গে  সঙ্গে  মাছের ডিম পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মৎস্য সম্পদের জন্য এটা অশনি সংকেত। সাধারণ দেশপ্রেমিক মানুষ মনে করে দেশের স্বার্থে, আগামী প্রজন্মের স্বার্থে এ বিষপ্রয়োগে মাছ ধরার প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। নইলে আমাদের নদ-নদী-জলাশয়ে প্রাণবৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হবে এবং আগামী প্রজন্মও আর প্রাকৃতিক উৎসের নানা জাতের দেশিমাছ পাবে না।

লেখক: কুমিল্লায় বসবাসরত সাংবাদিক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত