মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ব্যাংকের মাথায় মামলার পাহাড়

আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪৮ এএম

ঋণ দেওয়ার পর যখন গ্রাহক কিস্তি পরিশোধ করেন না, তখন টাকা আদায়ে  নানাভাবে চেষ্টা-তদবিরের পর শেষ উপায় হিসেবে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে ব্যাংক। বছরের পর বছর এসব মামলার পেছনে সময় দিয়েও ব্যাংকগুলো টাকা আদায় করতে পারছে না। দেশের বিভিন্ন জেলায় অর্থঋণ আদালতে এসব মামলার পাহাড় জমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ৬৪টি জেলার অর্থঋণ আদালতে চলমান ৫৭ হাজার ৪১৬টি মামলায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ লাখ ১০ হাজার ৭২৬ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

অর্থঋণ আদালতে ব্যাংক মামলা করার পর বড় অঙ্কের অর্থের খেলাপি গ্রাহকরা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে অর্থঋণ আদালতে চলা মামলায় স্থগিতাদেশ নিয়ে নতুন করে ঋণ নেন অন্য ব্যাংক থেকে। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত উচ্চ আদালতে এ ধরনের ৫ হাজার ৩৭৬টি মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ৫২ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকা।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৪ গুণ।

অগ্রণী ব্যাংকের আমিন কোর্ট শাখা থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৯৪ সালে খেলাপি হয় ক্রোমভেজ ট্যানারি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ঋণের অর্থ আদায়ে ১৯৯৭ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে অগ্রণী ব্যাংক। দুই দশকের বেশি সময়ে মামলা চালিয়ে এবং বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনা আদায় করতে পারেনি ব্যাংক। জালিয়াতি করে ঋণ দেওয়ার পর হল-মার্ক গ্রুপের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে ২০১৪ সালে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছে সোনালী ব্যাংক। এসব মামলায় স্থগিতাদেশ চেয়ে উচ্চ আদালতে মামলা করেছে হল-মার্ক।

নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দায়িত্ব নেওয়ার দিন থেকেই খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে অর্থ আদায়ে করণীয় নির্ধারণ করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিদ্যমান কোন কোন আইনে সংশোধন আনতে হবে, সে বিষয়ে সুপারিশের জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ঋণের পরিমাণের সঙ্গে মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। বিশালসংখ্যক মামলা জেলার একজন বিচারকের পক্ষে নিষ্পত্তি করা কষ্টকর। কোথাও কোথাও আবার অর্থঋণ আদালতের বিচারকের পদ খালি আছে। সেখানে যে বিচারক অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকেন তার পক্ষে ওইসব মামলা পরিচালনা আরও দুষ্কর হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘হাই কোর্টেও রিট মামলার সংখ্যা এমনভাবে বেড়েছে যে, ব্যাংকিং সেক্টরের এসব মামলা সময়মতো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে বিচারকার্য সম্পন্ন করা সম্ভবপর হচ্ছে না। প্রতি জেলায় একাধিক আদালতের ব্যবস্থাসহ অর্থঋণ আদালতের বিচারকের সংখ্যা এবং হাইকোর্টে রিট মামলার বেঞ্চের সংখ্যা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, উচ্চ আদালতে থাকা রিট মামলা নিষ্পত্তির জন্য পৃথক এক বা একাধিক বেঞ্চ থাকা দরকার। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পৃথক বেঞ্চ গঠনের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরে চিঠি দিলেও তা গঠন করা হয়নি।

এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজিবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলার চেয়ে আদালত ও আদালতে বিচারকের সংখ্যা কম হওয়ায় মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আদালত ও বিচারক বাড়ালে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত