সরকারবিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত গণশুনানি শেষ হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা ৮ ঘণ্টা চলা এ শুনানি শেষে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে প্রহসন হিসেবে অভিহিত করেছেন ড. কামাল হোসেন। একই সঙ্গে তিনি কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, বক্তব্য রাখা অধিকাংশ প্রার্থী আন্তরিকভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছেন। তাই তার মুক্তি অত্যন্ত যুক্তিসংগত। খালেদা জিয়ার মুক্তি অবিলম্বে হওয়া উচিত। এই অনুষ্ঠান থেকে দাবিটা সরকার ও জনগণের কাছে যাওয়া দরকার। তাকে মুক্তি না দেওয়াটা দুঃখজনক। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর এ ধরনের দাবি আমাদের করতে হচ্ছে। গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে।
গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ৪২ প্রার্থীর কথা শোনার পর আমরা বলতে পারি, একে নির্বাচন বলা যায় না, একে বলা যেতে পারে সরকার একটা প্রহসন করেছে। দেশের নাগরিককে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন, সংবিধান অমান্য করেছে, গণতন্ত্রের মূলনীতির প্রতি অবমাননা করেছে।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে দিনব্যাপী গণশুনানি শেষে সমাপনী বক্তব্যে প্রার্থীদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে গিয়ে এ কথা বলেন।
এ সময় সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম এই সদস্য প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা মারা গেলে উত্তরসূরিরা আপনাদের নিয়ে লজ্জা পাবে। আপনারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন, কী দেখছেন। আপনারা সংবিধান অমান্য করছেন’।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে আনতে পারি সেটা করতে হবে। যেন স্বৈরাচারকে সরাতে পারি। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’।
গণশুনানির বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
মঞ্চে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, ড. নুরুল আমিন বেপারী, অ্যাডভোকেট ড. মহসিন রশীদ, সাবেক বিচারপতি আ ক ম আনিসুর রহমান খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।
মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল ‘একাদশ জাতীয় সংসদের তথাকথিত নির্বাচনের ওপর গণশুনানি’।
এর আগে সকাল ১০টায় সূচনা বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে কারচুপি ও অনিয়ম হয়েছে তার বিচারের ক্ষমতা সরকারের নেই। তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গণশুনানি করছে। আমরা বিচারক নই। কোনো বিচার করার ক্ষমতা ও কর্তব্য আমাদের নেই। গণশুনানি হচ্ছে, প্রার্থীরা জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন। বিচার যেটা হচ্ছে সেটা ট্রাইব্যুনালে হবে। ইতিমধ্যে প্রার্থীরা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।
ড. কামাল বলেন, গণআদালত যেটা বলা হয়, সেটার বিচার করবে জনগণ। আমরা এসেছি অনুষ্ঠানটা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য। প্রার্থীরা যে বক্তব্য রাখবেন সেগুলো পরে বই আকারে প্রকাশ করা হবে। সবার বক্তব্য রেকর্ড করা হবে।
তিনি বলেন, গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। ভোটাধিকার রক্ষা করার জন্য আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে লেখা আছে, জনগণ ক্ষমতার মালিক। তারা ভোটের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে চেয়েছিলেন।
এরপর মির্জা ফখরুল বলেন, ৩০ ডিসেম্বর দেশে একটি প্রহসনের নির্বাচন করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায়, যা ইচ্ছা তা করছে সরকার। তাকে কোনো কিছুর জন্য জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। সরকারের উদাসীনতার কারণেই চকবাজারের পাশাপাশি একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে।
এর আগে সকাল ১০টায় কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে গণশুনানি শুরু হয়। দুপুরে এক ঘণ্টা বিরতির আগে ২৩ প্রার্থী নিজ নিজ আসনে নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। বিরতি পর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত একটানা শুনানি চলে। শুনানির শুরুতে পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব পড়ে শোনান ফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপর নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং উপস্থিত সবাই নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাতে অংশ নেন।
