শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শস্ত্রপাণির অস্ত্র সংবরণ

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৯, ০৩:২৪ এএম

আমাদের বাল্যে ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধোত্তরকালে জেনেছি বামপন্থার কথা। নকশালদের নাম শুনতে পেতাম। ’৭৩ সালেই কোনো একটা শিশু সংগঠন খেলাঘর কিংবা কচি-কাঁচার আসরÑ পাড়ার শিশু-কিশোরদের নিয়ে শহীদ মিনারে গেল। মাইক্রোবাসে যেতে যেতে সেøাগান উঠল : ‘ভিয়েতনামে শিশুহত্যা বন্ধ কর, বন্ধ কর; মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক, নিপাত যাক।’ উত্থান ঘটেছে তখন জাসদের : সে এক রোমান্টিক বিপ্লবিতার কাল। নিদারুণ মৃত্যু হয়েছে সিরাজ শিকদারের : ’৭৫-এর পর বিচিত্রায় তার ও তার দল সর্বহারা পার্টি সম্পর্কে প্রতিবেদন হলো, হায়াত হোসেন গল্প লিখলেন ‘নাফ নদীর তীরে’।

গল্পের বই পড়ার সূত্রে ক্রমশ জানছি স্বদেশি আন্দোলনের বিপ্লবীদের কথা। আরেকটু পরে, দশম শ্রেণিতে পড়বার সময় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ পড়ে মার্কসীয় ভাবধারায় স্বদীক্ষিত হয়ে উঠেছি। বামপন্থা বিষয়ক নানা বইপত্র পড়ছি। এই সময় হো চি মিনের একটি জীবনীগ্রন্থ কিনলাম। তার লেখকের নাম মহসিন শস্ত্রপাণি।

এই মহসিন শস্ত্রপাণির আরও লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটল ‘বিচিত্রা’র মাধ্যমে। যদিও বাম রাজনীতির সঙ্গে তার পরোক্ষ সংযোগ ছিল, একসময় তা প্রত্যক্ষভাবেই ছিল, কিন্তু আমরা তাকে চিনি লেখক হিসেবেই। আলমগীর কবীরের চলচ্চিত্র ‘রূপালী সৈকতে’ সম্পর্কে একটা আলোচনা লিখলেন তিনি। ছবির রাজনৈতিক পটভূমি ও নায়ক চরিত্র নিয়ে বেশ চাঁছাছোলাভাবে সমালোচনা ছিল এটায়। বিচিত্রায় গল্পও ছাপা হয়েছিল তার, যতদূর মনে পড়ে। আর বিচিত্রার প্রতিবেদন থেকেই জেনেছিলাম, ‘উন্মেষ’ নামক একটি সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠনের তিনি কর্তাব্যক্তি।

আশির দশকের শুরু থেকেই বিভিন্ন বাম ঘরানার সংগঠনের অনুষ্ঠানে যেতাম। উন্মেষ-এর অনুষ্ঠানে গিয়ে তার আলোচনা শুনলাম। শ্মশ্রু-গুম্ফশোভিত মুখমণ্ডল তার, ফতুয়া পরা, প্রমিত উচ্চারণ আকর্ষণীয় অবয়ব।

উন্মেষ সংগঠনটি সাপ্তাহিক সাহিত্যসভার আয়োজন করত। কবি পল্টু বাসার তখন ঢাকায় থাকতেন তার বড় ভাই খায়রুল বাসারের বাসায়, সবুজবাগে। আমরাও সবুজবাগে থাকতাম। পল্টু বাসার আমাকে জানালেন উন্মেষ-এর সভার কথা, তিনি সেখানে এরই মধ্যে যাতায়াত করছেন। সম্ভবত বিরাশি সালে পল্টু বাসারের সঙ্গে এক শনিবার (তখন রবিবার ছুটির দিন থাকত) চলে গেলাম ওয়ারীর নবাব স্ট্রিটে। সেখানে হরপ্পা নামে একটি প্রেস ছিল মহসিন ভাইয়ের, তার দপ্তরেই সাহিত্য আসর বসত।

এই সভায় গিয়ে অনেকের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। উন্মেষবর্তী প্রধান চার কবি : সমুদ্র গুপ্ত, মতিন বৈরাগী, মুনীর সিরাজ ও কাজী মনজুর। সবার সঙ্গেই দেখা হলো প্রথম দিনেই। এদের কবিতা আগেই পড়েছি বিচিত্রায়। বামপন্থি সমাজসচেতন কবি হিসেবে তাদের নাম উল্লেখ করা প্রবন্ধও পড়েছি। আরও অনেক বয়সে তরুণ-প্রবীণ অনেক লেখক-কবি-ভাবুক ও অ্যাক্টিভিস্টের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এখানে।

প্রায় সপ্তাহেই যেতাম উন্মেষের সভায়। লেখা পাঠ হতো, চা-পর্ব হতো, তারপর পঠিত লেখার ওপর আলোচনা থাকত। সবাই আলোচনা করতেন। মহসিন ভাই বড় একটা ভূমিকা রাখতেন আলোচনায়। তার কথা বলবার ভঙ্গি ছিল বেশ বৈঠকি, রসিয়ে রসিয়ে জমিয়ে আলাপ করতেন তিনি। তিনি নিজে গল্পকার ছিলেন, ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন, মাঝে মাঝে কবিতাও লিখতেন।

উন্মেষের সভা ছিল বেশ একটু আন্তরিকতাময়, আদর্শিক একটা পাটাতন থাকবার কারণেই হয়তো-বা। একবার ঠিক হলো সভাকে আরেকটু কার্যকর করার জন্য প্রতি সপ্তাহে কোনো একটি আলোচ্য বিষয় থাকবে, একজন থাকবেন মুখ্য আলোচক বা প্রাবন্ধিক। প্রথমে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটির ওপর আলোচনা নির্দিষ্ট করা হলো, মহসিন ভাই আমাকে দায়িত্ব দিলেন প্রবন্ধটি লেখবার। আমি উৎসাহিত হয়ে লিখেছিলাম আমার প্রথম উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ। এটি পরে ‘একবিংশ’র প্রথম সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল, এবং অল্পবিস্তর নজর কেড়েছিল। হুমায়ুন আজাদও লেখাটার প্রশংসা করেছিলেন খানিক।

মহসিন ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপ্তি বেড়েছিল। দপ্তর থেকে তার গৃহে সম্প্রসারিত হয়েছিল সেটি। ভাবী অনেকবার খাইয়েছেন। তার পুত্র পাভেল ও দুই কন্যা দ্যুতি ও সেবতী আত্মীয়ের মতোই দেখত। মহসিন ভাইয়ের কাজিন অমিত হাবীব (সাংবাদিক) আমারই সমবয়সী। তার সঙ্গে সভাতেই পরিচয় ও সেটি ঘনিষ্ঠ হয়েছিল।

একসময় আর উন্মেষ-এর অনুষ্ঠানে যাওয়া হচ্ছিল না। পরে এই না-টাই স্থায়ী হয়ে গেল। মহসিন ভাইয়ের সঙ্গে অনেক কাল পরে হঠাৎ কোথাও-বা দেখা হতো। আরও অনেক কাল পরে শেষবার দেখা হলো সম্ভবত ২০১১ সালে বইমেলার সময়, মহসিন ভাই আর মতিন বৈরাগীর সঙ্গে একসঙ্গে। ফোন নম্বর রাখলাম। উনি বাসায় যেতে বললেন। যাব বললাম। ঠিকানাও রাখলাম।

আরও পরে একদিন তার কন্যা সেবতীর সঙ্গে দেখা হলো। বলল, মহসিন ভাই এর মধ্যে খুব অসুস্থ হয়েছিলেন। এখন মোটামুটি ভালো থাকলেও বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন।

একদিন তাকে দেখতে যাব, আড্ডা দিয়ে আসব, ভেবেছিলাম। মতিন বৈরাগীর সঙ্গে কথা হলো, একদিন আমরা একসাথে আড্ডায় বসব মহসিন ভাইকে নিয়ে। আমারও যাওয়া হয়নি এবং মতিন বৈরাগী ভাইয়েরও আয়োজন করা হয়নি। এরই মধ্যে গতকাল মাঝরাতে পার্থিবতা ঘোচালেন মহসিন শস্ত্রপাণি। বিপ্লবিতার কালের চিহ্নগুলো লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

দীর্ঘজীবী হোন কমরেড, ভাই আমার।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত