বিয়ে বাড়ি যাওয়ার পথে সদরঘাটে সলিলসমাধি তাদের

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৯, ০৯:০৯ পিএম

বিয়ে বাড়ির আনন্দ পরিণত হলো শোকের মাতমে। বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে নৌকায় করে বাড়ি যাওয়ার সময় লঞ্চের ধাক্কায় বুড়িগঙ্গা নদীতে একই পরিবারের ছয় মাস থেকে আট বছর বয়সী তিন শিশুসহ ৭ যাত্রী ডুবে গিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে শুক্রবার জামসেদা বেগম (২০) এর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন- শাহজালাল শাহজালাল চোকদারের স্ত্রী সাহিদা বেগম (৩২), দুই মেয়ে মিম (৮) ও মাহী (৬), বোন জামাই দেলোয়ার হোসেন (২৮) ও তাঁদের সাত মাস বয়সী সন্তান জুনায়েদ। উল্লেখ্য জামসেদা শাহজালালের চাচাতো বোন। এছাড়া শাহজালালকে আহত অবস্থায় নৌকাডুবির পরপরই উদ্ধার করা হয়েছে। লঞ্চের ধাক্কায় তার দুইপা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তারাবনিয়া ইউনিয়নের কিরণনগর জাফর আলী মালকান্দি গ্রামের কামাল চোকদারের মেয়ে খাদিজা আক্তারের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল শুক্রবার। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার রাতে বোন জামসেদা বেগম, তার স্বামী দেলোয়ার হোসেন প্রধা‌নিয়া, ছয় মাস বয়সি শিশু পুত্র জোনায়েদ ঢাকা থেকে শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সাথে ছিলেন চাচাতো ভাই শাহজালাল চোকদার, তার স্ত্রী শাহিদা বেগম, তাদের দুই সন্তান মিম ও মাহি। রাত পৌনে ১০টার দিকে সদরঘাটে কাছাকাছি পৌঁছালে সুরভি-৭ নামের একটি লঞ্চের ধাক্কায় নৌকাটি ডুবে যায়। তবে, নৌকার মাঝি সাঁতরে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

এদিকে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে খাদিজার বিয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক স্বজন তাদের সন্ধানে ঢাকায় বুড়িগঙ্গার তীরে ছুটে যান।

এছাড়া, শুক্রবার শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর মিল ব্যারাক ঘাট থেকে নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ জামসেদার লাশ উদ্ধার করা হয়। বাকিদের এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।

এদিকে, মালকান্দি গ্রামে বাড়ির উঠানে বসে বিলাপ করতে দেখা যায় জামসেদার মা ইয়ারুন নেছা ও বাবা কামাল চোকদারকে। তারা বারবার বলছিলেন, ‘আমার মারে আর নানু ভাইরে আইন্না দে। অগো কইছিলাম রাইতের লঞ্চে আহিসনা। একদিন আগে দিনে আয়। আমার সব শেষ হইয়া গেল’।

শাহজালাল চোকদারের বাবা মহসিন চোকদার বলেন, ‘অভাবের সংসার হওয়ায় শিশু বয়সেই ছেলেকে কাজে ঢাকায় পাঠাই। সেখানে দর্জি কাজ শিখেছিল। ভালোই আয় রোজগার করত। তার পাঠানো টাকায় আমরা চলতাম। বউ আর নাতনি দুইটার খোঁজ পাচ্ছি না। ছেলেটার দুইটা পা বিচ্ছিন্ন হইয়া গেছে। আল্লাহ কেন এত বড় বিপদ দিলা আমারে’।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির আহম্মেদ বলেন, নৌ দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ছয়জন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সরকারি সংস্থাগুলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করছে। ওই পরিবারগুলোর পাশে উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক থাকবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার সময় লঞ্চের পেছনে থাকা পাখার আঘাতে শাহজালালের দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়। পাশেই থাকা নৌ পুলিশের একটি টহলদল শাহজালালকে উদ্ধার করে প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়। সেখান থেকে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সদরঘাট নৌ থানার উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলাম জানান, রাত থেকে উদ্ধার অভিযান চলছে।

শাহজালালের শ্বশুর আব্দুর রশিদ জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসেন। তার জামাতা শাহজালাল কেরানীগঞ্জে পরিবার নিয়ে থাকতেন। সেখান থেকে তারা গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের বজেশ্বরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। শাহজালাল হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। মেয়ে–নাতনিসহ অন্যদের খোঁজে তিনি রাত থেকে অপেক্ষা করছেন। এখন পর্যন্ত কেউ উদ্ধার হয়নি। আব্দুর রশিদ আহাজারি করে বলছিলেন, ‘একজনের লাশও যদি পাইতাম, মনটায় শান্তি পাইতাম।’

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঢাকা জোন-৩–এর সহকারী পরিচালক মোস্তফা মহিউদ্দিন জানান, নৌকাটিতে সাতজন যাত্রী ও একজন মাঝি ছিলেন। লঞ্চের পেছন দিকের সঙ্গে নৌকাটির ধাক্কা লাগে বলে তিনি জানান।

সদরঘাট নৌ-থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। সেখান থেকে শাহজালালকে তারা উদ্ধার করে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে চেষ্টা করছেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি, নৌপুলিশ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সদস্যরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত