সব বন্দরে স্ক্যানার বসছে

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ১২:০৭ এএম

জনগণের ওপর নতুন কোনো কর না বসিয়ে কিংবা বাড়তি ভ্যাটের হার না চাপিয়েও দ্বিগুণেরও বেশি রাজস্ব আয় করছে বিশ্বের ১১তম অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া। শুধু বন্দরে স্ক্যানার বসিয়ে তার সাহায্যে আমদানি-রপ্তানি হওয়া পণ্য শনাক্ত করে সঠিক হারে রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে তা সম্ভব করতে পেরেছে দেশটি। অর্থমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দিনই মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার রাজস্ব আয় বাড়ার এই তথ্য তুলে ধরে দেশের সব বন্দরে স্ক্যানার বসানোর নির্দেশ দেন আ হ ম মুস্তফা কামাল।

ওই নির্দেশনার পর এনবিআর চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য দুটি স্ক্যানার কেনার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মাসুদ সাদিক। সম্প্রতি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দেশের সকল সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোর অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো নিষ্পত্তির লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি আরও বলেন, ‘দু’টি স্ক্যানার ক্রয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পিপিপির আওতায় সকল বন্দরে স্ক্যানার স্থাপনের লক্ষ্যে ডিপিপি প্রণয়ন করা হচ্ছে।’ স্ক্যানার হলো এমন একটি যন্ত্র, যার ভেতর দিয়ে কোনো কন্টেইনার বা পণ্যের ব্যাগ প্রবেশ করালে তার ভেতরে কোন ধরনের পণ্য রয়েছে তা কম্পিউটারে দেখা যায়। বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্য স্ক্যানিং করে খালাস করা হলে কোনো আমদানিকারক এক পণ্য এনে অন্য পণ্য ঘোষণা দিয়ে বিদেশে অর্থপাচার করতে পারবেন না। আবার বেশি দামের পণ্য এনে কম দামি পণ্য হিসেবে বা উচ্চ শুল্ককরের পণ্য আমদানি করে বিনা শুল্ক বা কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ছাড় করাতে পারবেন না। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি অর্থপাচারও কমবে। যেসব পণ্য রপ্তানির বিপরীতে সরকার থেকে নগদ সহায়তা পাওয়া যায়, অনেক রপ্তানিকারক ওই সব পণ্য রপ্তানি না করে কন্টেইনারের ভেতর মাটি, বালু ভরে বিদেশে পাঠিয়ে বা খালি কন্টেইনার পাঠিয়ে নগদ সহায়তার অর্থ তুলে নিচ্ছেন। স্ক্যানার বসালে এসব অপরাধ কমবে। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য চারটি স্ক্যানার কেনা হয়েছিল। তার মধ্যে একটি সচল রয়েছে। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল দেশের সব বন্দরে স্ক্যানার বসাতে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, শুধু চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানার বসালে হবে না। তখন অপরাধীরা চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি না করে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি করবে। তাই সব বন্দরেই স্ক্যানার বসাতে হবে। অর্থপাচার প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশের সব বন্দরে স্ক্যানার বসানোর প্রস্তাব করেছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ‘মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত ওয়ার্কিং কমিটি’র বৈঠকে দুদক প্রতিনিধি বলেন, ওভার ইনভয়েসিং (আমদানি করা পণ্যের দাম বেশি দেখানো) এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার হচ্ছে বেশি। ওভার ইনভয়েসিং বন্ধে বন্দরে আমদানিকারক ঘোষিত পণ্য যাচাই করার ওপর জোর দেন তিনি। তখন সেখানে উপস্থিত এনবিআর কর্মকর্তারাও জানান যে, সকল বন্দরে স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিন বছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অর্থপাচার সংক্রান্ত ৩৩টি প্রতিবেদন দিয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে ১০টি মামলা দায়ের করেছে দুদক। এ পর্যন্ত অর্থপাচার সংক্রান্ত ১০০টি অনুসন্ধান ও ১৯টি তদন্ত চলমান রয়েছে। অর্থপাচারের ৩৩টি মামলায় সাজার আদেশ দিয়েছে আদালত। এর বাইরে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর অর্থপাচার বিষয়ে ১৭টি মামলা করেছে। এর মধ্যে তিনটির তদন্ত শেষ হয়েছে, চলমান রয়েছে বাকিগুলোর তদন্ত।  মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, মামলা দীর্ঘদিন তদন্তাধীন থাকলে বিদেশে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক দীর্ঘদিন সম্পদ জব্দ রাখা এবং অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে জটিলতার সৃষ্টি হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত